তালাকে রজয়ি ও তালাকে বায়েন কি

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2643
Questioner: Masum
Question Asked: 13 Jul 2026, 01:10 PM
Reviewed & Published: 13 Jul 2026, 01:15 PM
Views: 68
Tokens: 3,701
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

তায়াকে রজয়ি ও তালাকে বায়েন কি? বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি

Answer

তালাকে রাজয়ী ও তালাকে বায়েন: বিস্তারিত ব্যাখ্যা

নিম্নে তালাকের প্রকারভেদ ও এদের পার্থক্য কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে তুলে ধরা হলো:


তালাকে রাজয়ী (رجعی طلاق)

সংজ্ঞা:
যে তালাক দেওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় একত্রিত হতে পারে নতুন বিবাহ বা নতুন মোহর ছাড়া, তাকে তালাকে রাজয়ী বলা হয়। এটি সাধারণত প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক যা 'ইদ্দতের (৩ মাসিক বা ৩ মাস) মধ্যে প্রত্যাহার করা যায়।

কুরআন ও হাদীসের দলিল:

  • আল্লাহ বলেন:

    وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ
    "আর যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দাও, অতঃপর তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তাদেরকে সদয়ভাবে রেখে দাও..." (সূরা বাকারা: ২৩১)

  • হাদীস:

    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তালাক দুই প্রকার: রাজয়ী ও বায়েন। রাজয়ী তালাকে ইদ্দতের ভেতর পুরুষটিই তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকারী।" (সুনানু আবী দাউদ, হাদীস: ২১৯৫)

বৈশিষ্ট্য:

  1. ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায় – স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে (কেবল বললেই হবে, নতুন কোনো অনুষ্ঠান লাগবে না)।
  2. ইদ্দত শেষ হলে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না – তখন স্ত্রী বায়েন হয়ে যায়।
  3. তালাকের সংখ্যা গণনা হয় – এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হিসেবে গণিত হয়।
  4. স্ত্রী বা স্বামী কোনো পক্ষের সম্মতি লাগে না – স্বামী একতরফাভাবে ফিরিয়ে নিতে পারে।

হানাফী ফিকহের রেফারেন্স:

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "রাজয়ী তালাক হলো ইদ্দতের মধ্যে স্বামীর পুনরায় স্ত্রীকে গ্রহণ করার অধিকার সহ।" (আল-হিদায়া, ২/২৪৭)
  • ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন: "রাজয়ী তালাকে ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রী ফিরিয়ে নেওয়া যাবে, তবে সহবাস করা জায়েজ নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৪৫)

শর্ত:

  • তালাকটি প্রথম বা দ্বিতীয় হতে হবে।
  • তালাকের পর সহবাস না করা (নতুবা তা ফিরিয়ে নেওয়া বলে গণ্য হবে)।
  • ইদ্দতের ভেতর স্বামী স্পষ্টভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

তালাকে বায়েন (بائن طلاق)

সংজ্ঞা:
যে তালাক দেওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এবং নতুন বিবাহ ও নতুন মোহর ছাড়া পুনরায় একত্রিত হওয়া যায় না, তাকে তালাকে বায়েন বলা হয়। এটি সাধারণত তৃতীয় তালাক বা কোনো নির্দিষ্ট শর্তে দেওয়া তালাক।

কুরআন ও হাদীসের দলিল:

  • আল্লাহ বলেন:

    فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
    "অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয় (তৃতীয়বার), তবে তার জন্য সে (স্ত্রী) হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে (মুহাল্লিল) অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ করে।" (সূরা বাকারা: ২৩০)

  • হাদীস:

    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তিন তালাক বায়েন হয়, স্ত্রী আর স্বামীর জন্য হালাল থাকে না, যতক্ষণ না অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ হয়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৬১)

বৈশিষ্ট্য:

  1. ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না – তালাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
  2. ইদ্দত শেষ হওয়ার অপেক্ষা নেই – তাৎক্ষণিকভাবে স্ত্রী বায়েন (বিচ্ছিন্ন) হয়।
  3. তালাকের সংখ্যা গণনা শেষ – তৃতীয় তালাক হলে আর পুনর্বিবাহের সুযোগ নেই (মুহাল্লিল ব্যতীত)।
  4. নতুন বিবাহ ছাড়া পুনরায় একত্রিত হওয়া অসম্ভব – যদি এটি তৃতীয় তালাক হয়, তবে অন্য স্বামী (মুহাল্লিল) বিবাহ করে পুনরায় তালাক দেওয়ার পরই স্বামী-স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করতে পারে।

হানাফী ফিকহের রেফারেন্স:

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "বায়েন তালাক হলো যেখানে ইদ্দতের ভেতর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার নেই, এবং স্ত্রী অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারে।" (আল-মাবসুত, ৫/১২৪)
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী তে উল্লেখ আছে: "তিন তালাক একসঙ্গে দিলে বা এক তালাক দিলে 'তালাকে বায়েন' হয়, যদি বলে 'তুমি বায়েন' বা 'তালাক বায়েন'।" (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১/৪৫৩)

প্রকারভেদ:

  1. তালাকে বায়েন বিন মুঘাল্লাযা (بائن بین مغلظہ) – তৃতীয় তালাক যা মুহাল্লিল ছাড়া হালাল হয় না।
  2. তালাকে বায়েন দূনে মুঘাল্লাযা (بائن دون مغلظہ) – প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক যদি স্ত্রী মোহর ফিরিয়ে দেয় (খোলা) বা বিচারকের মাধ্যমে দেওয়া হয়।

তুলনামূলক আলোচনা

| বিষয় | তালাকে রাজয়ী | তালাকে বায়েন | |----------|-----------------|-----------------| | ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া | ✅ সম্ভব (কেবল মুখে বললেই) | ❌ সম্ভব নয় | | ইদ্দত শেষে ফিরিয়ে নেওয়া | ❌ ইদ্দত শেষে বায়েন হয়ে যায় | ❌ ইদ্দত শেষেও সম্ভব নয় | | তালাকের সংখ্যা | প্রথম বা দ্বিতীয় | তৃতীয় বা শর্তযুক্ত তালাক | | পুনরায় বিবাহ | ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট | নতুন বিবাহ ও মোহর লাগবে (তৃতীয় তালাকে মুহাল্লিলও লাগবে) | | উদাহরণ | "আমি তোমাকে এক তালাক দিলাম" (প্রথম বা দ্বিতীয়বার) | "আমি তোমাকে তিন তালাক দিলাম" বা "তুমি বায়েন" |


বিশেষ দ্রষ্টব্য (হানাফী ফিকহ মতে)

  1. এক তালাক বায়েন (موجبہ بائن): যদি স্বামী বলে "তালাকে বায়েন" বা "তুমি বায়েন", তবে এটি এক তালাকে বায়েন গণ্য হয় (ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না, তবে ইদ্দত শেষে নতুন বিবাহ করতে পারবে)। কিন্তু যদি কেবল "তালাক" বলে, তবে তা রাজয়ী হবে (প্রথম বা দ্বিতীয়বার হলে)।
  2. তিন তালাক (ثلاثہ): তিন তালাক একসঙ্গে বা পৃথকভাবে দিলে তা তালাকে বায়েন বিন মুঘাল্লাযা হয়। স্ত্রী অন্য স্বামী (মুহাল্লিল) ব্যতীত আর হালাল হবে না।
  3. খোলা (خلع) বা বিচারকের মাধ্যমে তালাক: এটি তালাকে বায়েন গণ্য হয়, প্রথমবার হলেও ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

উপসংহার

  • তালাকে রাজয়ী: সহজে পুনর্মিলনের সুযোগ আছে, ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায়।
  • তালাকে বায়েন: স্থায়ী বিচ্ছেদ, ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। শুধুমাত্র নতুন বিবাহ ও মোহর (এবং তৃতীয় তালাকে মুহাল্লিল) লাগে।

সতর্কতা: তালাক একটি গুরুতর বিষয়। ইসলাম এটাকে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল কাজ বলেছে। তাই তালাক দেওয়ার আগে অবশ্যই ফিকাহবিদ বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।

আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আরও বিস্তারিত জানতে "ফাতাওয়ায়ে উসমানী", "রদ্দুল মুহতার", "আল-হিদায়া" অথবা স্থানীয় মুফতির শরণাপন্ন হতে পারেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.