একটি ব্যবসায়িক চুক্তি যেখানে এজেন্ট চায়না থেকে পণ্য কিনে, পরে বিনিয়োগকারীর থেকে বাকিতে কিনে নেয়।

Business and Job · Hanafi

Question No: 2637
Questioner: Mehedy Hasan
Question Asked: 13 Jul 2026, 10:25 AM
Reviewed & Published: 13 Jul 2026, 10:42 AM
Views: 80
Tokens: 11,494
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ, মুহতারাম।
আমি একটি ব্যবসায়িক চুক্তির কথা ভাবছি। এই ব্যবসাটি ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী হালাল ও সঠিক হবে কি না, সে বিষয়ে আপনার কাছ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ফতোয়া বা দিকনির্দেশনা চাচ্ছি। ব্যবসার পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. এজেন্সী ও পণ্য ক্রয় (Wakalah):
আমার কাছে পর্যাপ্ত পুঁজি নেই। আমি মেহেদী নামের একজন বিনিয়োগকারীর সাথে চুক্তি করতে চাচ্ছি। তিনি আমাকে টাকা দেবেন এবং আমি তাঁর প্রতিনিধি বা এজেন্ট (Wakil) হিসেবে আমার নিজের খরচে চায়না গিয়ে/ অথবা বাংলাদেশে বসেই চায়না থেকে পণ্য তাঁর নামে নগদ টাকায় কিনব। মালের রিয়েল মেমো ও দাম আমি তাঁকে বুঝিয়ে দেব।
২. ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি (Promise to Purchase):
চায়নাতে থাকা অবস্থায় বা মাল কেনার সময় আমাদের মধ্যে চূড়ান্ত কেনাবেচা হবে না। আমি শুধু তাঁকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি (Promise/ওয়াদা) দেব যে— "মালটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর, আমি আপনার থেকে প্রতিটি মালে ৫০ বা ৭০ টাকা অথবা ৫% বা ১০% লাভ দিয়ে সব পণ্য বাকিতে কিনে নেব।"

৩. মালিকানা ও ঝুঁকি (Ownership & Risk):
চায়না থেকে বাংলাদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত মালের মূল মালিক থাকবেন মেহেদী। পথিমধ্যে যদি মাল নষ্ট বা হারিয়ে যায়, তবে মালের মালিক হিসেবে সেই আর্থিক ক্ষতি ও ঝুঁকি মেহেদীই বহন করবেন। আমার কোনো অবহেলা ছাড়া মালের ক্ষতি হলে আমি দায়ী থাকব না।

৪. চূড়ান্ত বিক্রয় চুক্তি (Final Sale):
মালটি নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর এবং মেহেদির নিয়ন্ত্রণে আসার পর, আমরা নতুন করে চূড়ান্ত কেনাবেচার চুক্তি করব। তখন তিনি মালের আসল দামের সাথে পূর্বনির্ধারিত লাভ (৫০ বা ৭০ টাকা) অথবা ৫% বা ১০% যোগ করে একটি ফিক্সড মূল্যে মালটি আমার কাছে বাকিতে বিক্রি করবেন।

৫. মূল্য পরিশোধ (Deferred Payment):
আমি মালটি বুঝে নিয়ে বাজারে বিক্রি করব এবং ধীরে ধীরে কিস্তিতে বা সুবিধাজনক সময়ে মেহেদীকে চুক্তিতে নির্ধারিত ফিক্সড টাকা পরিশোধ করব। যদি কোনো কারণে আমার টাকা দিতে দেরি হয়, তবে মালের দাম এক পয়সাও বাড়ানো হবে না (অর্থাৎ কোনো লেট ফি বা জরিমানা নেওয়া হবে না)

মুহতারামের কাছে আমার সুনির্দিষ্ট প্রশ্নসমূহ:
ক) এই প্রক্রিয়ায় আমার জন্য মেহেদির এজেন্ট হওয়া এবং পরে তাঁর থেকেই মালটি বাকিতে ও লাভে কেনা কি শরীয়তসম্মত হবে?

খ) পণ্য বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে আমরা যে লাভের পরিমাণ (৫০/৭০ টাকা) অথবা ৫% বা ১০% মুখে আলোচনা করে রাখছি, তা কি 'ওয়াদা' বা প্রতিশ্রুতি হিসেবে জায়েজ হবে?

গ) এই চুক্তিতে সুদের (রিবাল জাহিলিয়্যাহ) কোনো উপাদান বা অন্য কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না?

ঘ)এই এরকম ব্যবসার ধরনকে ইসলামে কি মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়?

দয়া করে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এর সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وآله وصحبه أجمعين

উত্তর:
আপনার বর্ণিত ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াটি মূলত মুরাবাহা লিল আমির বিশ শিরা (إجازة الوعد بالشراء مع المرابحة) বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে মুরাবাহা নামে পরিচিত একটি ইসলামী বাণিজ্যিক মডেল। ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী এটি বৈধ ও হালাল, তবে শর্ত সাপেক্ষে। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে তুলে ধরা হলো:


ক) এজেন্ট হওয়া ও পরে বাকিতে কেনা:

আপনি যদি মেহেদী সাহেবের ওকীল (প্রতিনিধি) হয়ে চায়না থেকে পণ্য ক্রয় করেন এবং তারপর সেই পণ্য মেহেদী সাহেবের মালিকানায় আসার পর স্বতন্ত্র ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে বাকিতে (কিস্তিতে) কিনে নেন, তবে তা জায়েজ হবে। তবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো অবশ্যই পালন করতে হবে:

  1. ওকালত (প্রতিনিধিত্ব) ও ক্রয়-বিক্রয় পৃথক হতে হবে:
    আপনি যখন ওকীল হিসেবে পণ্য কিনবেন, তখন সেই পণ্যের মালিকানা মেহেদী সাহেবের হবে। পণ্য বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর আপনাকে অবশ্যই নতুন একটি চুক্তি (ইজাব-কবুল) করতে হবে। ওকালতের সময়ই ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিক্রয় চুক্তি পণ্য হস্তগত হওয়ার পর হতে হবে।
    (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০৫; আল-হিদায়া, ৩/১৮২)

  2. পণ্যের মালিকানা ও ঝুঁকি:
    চায়না থেকে বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত পণ্যের মালিক ও ঝুঁকি মেহেদী সাহেবের থাকবে। এটি সঠিক ও জরুরি।
    (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৬)

  3. ওকীল নিজেই ক্রেতা হতে পারেন:
    হানাফী মতে, ওকীল যদি মালিকের অনুমতি নিয়ে নিজেই সেই পণ্য ক্রয় করে, তবে তা জায়েজ। এখানে যেহেতু মেহেদী সাহেব আপনাকে বিক্রি করতে রাজি আছেন, তাই কোনো সমস্যা নেই।
    (বাদায়েউস সানায়ে, ৬/২২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩৫)

সারসংক্ষেপ: আপনার এজেন্ট হওয়া এবং পরবর্তীতে সেই পণ্য বাকিতে কেনা বৈধ, যদি ওকালত ও বিক্রয় চুক্তি পৃথক হয় এবং পণ্যের প্রকৃত মালিকানা ও ঝুঁকি মেহেদী সাহেবের থাকে।


খ) লাভের পরিমাণ ‘ওয়াদা’ হিসেবে জায়েজ কি?

আপনি এবং মেহেদী সাহেব পণ্য আসার আগে ৫০/৭০ টাকা বা ৫%/১০% লাভ নিয়ে আলোচনা করে রাখছেন। এটি একটি ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি)। ইসলামী শরী‘আহতে ওয়াদা পালন করা নৈতিকভাবে আবশ্যক (ওয়াজিব), তবে তা আদালতে বাধ্যতামূলক নয়, যতক্ষণ না তা কোন চুক্তির অংশ হয়।

হানাফী ফিকহের কিতাবে বলা হয়েছে:

"الوعد بالبيع لا يلزم بالعقد، ولكن يستحب الوفاء به"
"বিক্রয়ের ওয়াদা চুক্তির মতো বাধ্যতামূলক নয়, তবে তা পূর্ণ করা মুস্তাহাব।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০৯; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৩/২১৪)

তবে আপনার ক্ষেত্রে ওয়াদাটি শুধুমাত্র একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে গণ্য হবে। চূড়ান্ত বিক্রয়ের সময় যদি মেহেদী সাহেব নির্ধারিত লাভের বেশি বা কম দামে বিক্রি করতে চান, তবে তা সম্ভব নয়—কারণ ওয়াদা ভঙ্গ করা গুনাহ।
শর্ত: ওয়াদা করার সময় কোনো প্রকার চূড়ান্ত চুক্তি হবে না, এবং ওয়াদা ভঙ্গের জন্য কোনো জরিমানা (পেনাল্টি) ধার্য করা যাবে না।
অতএব, লাভের পরিমাণ আগে ঠিক করে রাখা জায়েজ


গ) সুদ বা অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি?

আপনার বর্ণিত চুক্তিতে সুদ (রিবা) নেই, কারণ:

  1. পণ্যের মূল্য নির্ধারিত (ফিক্সড) এবং সময়ের সাথে বাড়ছে না (কোনো লেট ফি নেই)।
  2. পণ্য প্রকৃতপক্ষে ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে, ঋণ নয়।
  3. ঝুঁকি মেহেদী সাহেব বহন করছেন, যা সুদের চুক্তিতে থাকে না।

ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:

"المرابحة جائزة إذا كان البيع بثمن معلوم وربح معلوم"
"মুরাবাহা বৈধ, যদি মূল্য ও লাভ নির্ধারিত হয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০১)

তবে সাবধানতা: যদি কোনোভাবে পণ্যের প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় না হয়ে শুধু টাকার লেনদেন হয় (যেমন, মেহেদী সাহেব টাকা দেন এবং আপনি পরে টাকা ফেরত দেন লাভসহ), তাহলে তা সুদ হবে। আপনার বর্ণনায় পণ্যের প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় রয়েছে, তাই সুদ নেই।

অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা:

  • পণ্যের গুণগত মান ও পরিমাণ সঠিকভাবে জানাতে হবে (গারার/প্রতারণা থেকে বাঁচতে)।
  • চূড়ান্ত চুক্তির সময় পণ্য হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
    (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৩২; বাইহাকী, ৬/৩০)

ঘ) ব্যবসার ধরন ইসলামে কী নামে পরিচিত?

আপনার বর্ণিত মডেলটি মুরাবাহা লিল আমির বিশ শিরা (مرابحة للآمر بالشراء) বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে মুরাবাহা নামে পরিচিত। এটি ইসলামী ব্যাংকিং ও বাণিজ্যে বহুল ব্যবহৃত একটি বৈধ পদ্ধতি। এতে একজন বিনিয়োগকারী (মেহেদী) পণ্য ক্রয় করেন এবং ক্রেতা (আপনি) পূর্বনির্ধারিত লাভে বাকিতে ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেন।

হানাফী ফিকহে এটিকে "بيع الأمانة" (আমানতের ভিত্তিতে বিক্রয়) এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়েছে।
(আল-মুহীত আল-বুরহানী, ৬/২৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/১৮৯)

মনে রাখবেন:

  • ওয়াদা ভঙ্গ করবেন না।
  • পণ্যের প্রকৃত মূল্য (ক্রয়মূল্য) স্পষ্টভাবে জানাবেন।
  • কোনো পণ্য হস্তগত না হলে তা বিক্রি করবেন না।

উপসংহার: আপনার প্রস্তাবিত ব্যবসাটি হালাল ও বৈধ, যদি উপরোক্ত শর্তগুলো (বিশেষ করে ওকালত ও বিক্রয়ের পৃথকীকরণ, পণ্যের মালিকানা ও ঝুঁকি বিনিয়োগকারীর, এবং কোনো সুদ বা জরিমানা না রাখা) কঠোরভাবে পালন করা হয়।

والله أعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.