ইসলামে বিয়ে ক্ষেত্রে কুফু মিলানো
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে কুফু (সমতা/সদৃশ) মিলানোর বিধান
ভূমিকা
ইসলামী পরিভাষায় কুফু (كفء) অর্থ সমতা বা সামঞ্জস্য। বিয়ের ক্ষেত্রে কুফু বলতে বর-কনের মধ্যে দ্বীনদারি, বংশ, পেশা, স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে সমতা থাকাকে বোঝায়। ইসলামে কুফু মিলানো গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি বিয়ের শর্ত নয়, বরং পছন্দনীয় বিষয়।
কুফু মিলানোর বিধান
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহ ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, কুফু বিবেচনা করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং বিবাহের স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কুফু না মিলালেও বিবাহ শুদ্ধ হয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মতে, কুফু নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে বিবেচনা করতে হবে:
১. ধার্মিকতা (দ্বীনদারি)
- বরকে সুন্নত পালনকারী, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ব্যক্তি হতে হবে
- ফাসিক (গুনাহগার) ব্যক্তি কোনো ধার্মিক নারীর জন্য কুফু নয়
২. বংশ (নসব)
- কুরাইশ বংশের নারীর জন্য কুরাইশ বংশের পুরুষ কুফু
- আরব নারীর জন্য আরব পুরুষ কুফু
- অ-আরবদের মধ্যে নিজ নিজ বংশের সমতা বিবেচনা করা হয়
৩. পেশা (হিরফা)
- উচ্চ পেশার (যেমন: আলেম, ব্যবসায়ী) নারীর জন্য নিম্ন পেশার (যেমন: রংমিস্ত্রি, ময়লা পরিষ্কারক) পুরুষ কুফু নয়
- তবে বর্তমান যুগে পেশার ভিত্তিতে কুফু বিবেচনার বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে
৪. স্বাধীনতা (হুররিয়াত)
- স্বাধীন নারীর জন্য ক্রীতদাস পুরুষ কুফু নয় (ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে)
কুরআন ও হাদিসের দলিল
কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে:
"আর তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিয়ে করিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদেরও।" (সূরা আন-নূর: ৩২)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন:
"যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার ধর্ম ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তখন তাকে বিয়ে দাও।" (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেছেন:
"মহিলাদের চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশ, তার সৌন্দর্য এবং তার ধর্ম। তুমি ধার্মিক নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলাময় হোক।" (বুখারি ও মুসলিম)
কুফু না মিলালে কী হয়?
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মতে, কুফু না থাকলে অভিভাবকের (ওয়ালির) আপত্তির ভিত্তিতে বিবাহ ভঙ্গ করার অধিকার থাকে। তবে স্ত্রী যদি সন্তুষ্ট থাকে এবং নিজে সম্মতি দিয়ে থাকে, তাহলে বিবাহ শুদ্ধ।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে, কুফু শুধুমাত্র দ্বীনদারির ক্ষেত্রে বিবেচ্য।
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, কুফু মিলানো উত্তম এবং এতে দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়। তবে কুফু না মিলালে বিবাহ বাতিল হয় না।
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) উল্লেখ করেছেন যে, বংশ ও পেশার চেয়ে দ্বীনদারি ও চরিত্রই মূল বিবেচ্য বিষয়। বর্তমান যুগে বংশ বা পেশার ভিত্তিতে কুফু নির্ধারণ করা কঠিন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কুফু মিলানোর ব্যবহারিক নিয়ম
১. দ্বীনদারি - নামাজি, রোজাদার, হালাল রিজিক উপার্জনকারী ২. চরিত্র - সচ্চরিত্র, সৎ স্বভাব ৩. শিক্ষা - শিক্ষাগত যোগ্যতার সমতা ৪. পারিবারিক অবস্থান - সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার সমতা ৫. বয়স - বয়সের সামঞ্জস্য
উপসংহার
কুফু মিলানো ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ এবং উত্তম, তবে এটি বিবাহের শর্ত নয়। বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো: উভয় পক্ষের সম্মতি, দুইজন সাক্ষী এবং মোহর নির্ধারণ। কুফু মিলালে দাম্পত্য জীবন সুখময় হয় এবং পারিবারিক কলহ কমে। তবে কুফু না মিলালেও বিবাহ বাতিল হয় না, যদি উভয় পক্ষ সন্তুষ্ট থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলভিত্তিক গ্রন্থসমূহ:
- আল-হিদায়াহ (১ম খণ্ড, নিকাহ অধ্যায়)
- রদ্দুল মুহতার (৩য় খণ্ড, নিকাহ অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানি (২য় খণ্ড)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২য় খণ্ড)
- বেহেশতি জেওর (বিবাহ অধ্যায়)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (১ম খণ্ড, নিকাহ অধ্যায়)