স্বামী যদি তার স্ত্রীকে মেসেজ পাঠায়, যদি সিলেট যাও তাহলে তালাক, স্ত্রী মেসেজ সীন করে, তবে ততটা ভাবেনি, তারপর সিলেট গেলে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রশ্ন:
একজন বিবাহিতা বোন তার স্বামীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন। স্বামী তাকে সিলেট যেতে নিষেধ করেছিলেন। স্ত্রী কয়েকবার ম্যাসেজে অনুমতি চান, কিন্তু স্বামী কল রিসিভ করেননি। কোনো উত্তর না পেয়ে স্ত্রী বের হয়ে যান। গাড়িতে থাকাকালীন স্বামীর ম্যাসেজ আসে: "যদি তুমি সিলেট যাও তাহলে তালাক"। স্ত্রী ম্যাসেজটি দেখেন কিন্তু এর অর্থ বুঝতে পারেননি এবং চিন্তা করেননি। গন্তব্যে পৌঁছে দেখেন স্বামী ম্যাসেজটি আনসেন্ড করে দিয়েছেন। এখন এর ফতোয়া কী?
উত্তর:
উল্লেখিত ঘটনায় স্বামী কর্তৃক শর্তযুক্ত তালাক (conditional divorce) দেওয়া হয়েছে। হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে বলে: "যদি তুমি অমুক জায়গায় যাও, তাহলে তালাক", এবং স্ত্রী সেই জায়গায় যায়, তাহলে শর্ত পূরণ হওয়ার সাথে সাথেই তালাক কার্যকর হয়ে যায়। এক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত বা স্ত্রীর বোঝার বিষয়টি তালাক হওয়ার জন্য শর্ত নয়। বরং শর্ত পূর্ণ হওয়ার বাস্তব ঘটনা ঘটলেই তালাক সংঘটিত হয়।
রেফারেন্স:
১. রদ্দুল মুহতার (৫ খণ্ড, ২৭৪ পৃষ্ঠা):
"মহিলা যদি শর্ত পূরণ করে, তাহলে তালাক পতিত হবে, যদিও স্বামী তা না চায় বা স্ত্রী তা না বুঝে থাকে।"
২. ফতোয়া আলমগীরী (১ খণ্ড, ৩৬৫ পৃষ্ঠা):
"যদি স্বামী বলে: 'যদি তুমি এই বাড়িতে যাও, তাহলে তালাক', এবং স্ত্রী সেই বাড়িতে যায়, তাহলে তালাক পতিত হবে।"
৩. আল-হেদায়া (২ খণ্ড, ২৩০ পৃষ্ঠা):
"শর্তযুক্ত তালাক স্বামীর নিয়ত নিরপেক্ষভাবে কার্যকর হয়; শর্ত পূরণ হলেই তালাক হয়।"
বর্তমান প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা:
-
স্বামী স্পষ্ট ভাষায় ম্যাসেজে লিখেছেন: "যদি তুমি সিলেট যাও, তাহলে তালাক।"
-
স্ত্রী ম্যাসেজটি পড়েছেন, অর্থাৎ তথ্যটি তার কাছে পৌঁছেছে।
-
তিনি সিলেট যাওয়ার কাজটি সম্পন্ন করেছেন। তাই শর্ত পূর্ণ হয়েছে।
-
স্ত্রীর বুঝতে না পারা বা তা গুরুত্ব না দেওয়া তালাকের কার্যকারিতা রোধ করে না। কারণ ফিকহের নিয়ম হল:
"তালাক এমন একটি বিষয় যেখানে জ্ঞান বা বোঝার প্রয়োজন নেই, বরং শর্ত পূর্ণ হলেই তা কার্যকর হয়।" (ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/৩৬৬) -
স্বামী ম্যাসেজ আনসেন্ড করেছে: এটি ম্যাসেজটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা মাত্র। কিন্তু শর্ত পূর্ণ হওয়ার আগে যদি আনসেন্ড করা হতো, তবে তালাক না-ও হতে পারত। কিন্তু এখানে ম্যাসেজটি স্ত্রী পড়েছেন এবং শর্ত পূর্ণ হওয়ার পরে আনসেন্ড করা হয়েছে। তাই আনসেন্ড করার কোনো প্রভাব নেই। বরং শর্ত পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তেই তালাক কার্যকর হয়েছে।
সুতরাং, বর্ণিত ঘটনায় একটি তালাক (প্রথম বা দ্বিতীয়) পতিত হয়েছে। এটি রাজ‘ঈ তালাক (যে তালাকে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায়)। ইদ্দত (তিন মাসিক বা তিন পবিত্রতা) পর্যন্ত স্ত্রী স্বামীর ঘরেই থাকবেন। এ সময় স্বামী চাইলে ফিরিয়ে নিতে পারেন। ইদ্দত শেষ হলে তালাক বায়েন হয়ে যাবে। তবে ফিকহি সতর্কতার জন্য এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে তারা ইসলামি পরিবেশে পুনরায় বিয়ে করতেও পারেন।
পরামর্শ:
- স্বামী যদি সত্যিই তালাক দেওয়ার নিয়ত না করে থাকেন এবং শুধু সতর্ক করতে ম্যাসেজ করেছিলেন, তবে তিনি তালাক ফিরিয়ে নিতে চাইলে ইদ্দতের মধ্যেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিন (বলা: "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" বা সহবাস করলেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে)।
- যদি উভয়েই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চান, তাহলে পুনরায় ইসলামি নিয়মে বিয়ে করাই উত্তম।
- ভবিষ্যতে এমন শর্তযুক্ত তালাকের বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্বের সাথে করলে গুরুত্ব বহন করে আর হাসি-ঠাট্টায় করলেও গুরুত্ব বহন করে: বিয়ে, তালাক এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া।" (আবু দাউদ, তিরমিযি)
উপসংহার:
- ঘটনায় একটি তালাক কার্যকর হয়েছে।
- ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
- যদি ইদ্দত শেষ হয়, তবে পুনরায় নিকাহ করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।
وَاللہُ تَعَالٰی أَعْلَمُ
(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)