স্বামীর অজান্তে কাজী কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার লিখে দিলে তা কি শরীয়তে বৈধ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
যেহেতু স্বামী বলেছেন যে অধিকার দেন নি। 3/5 দিন আগে সকালে ও আমি ঘুম থাকে উঠে হুঁ হুঁ করছিলাম তখন ও মনের মধ্যে আবার তালাকের কথা ভাসছিল।4.আমার কি নিজেকে তালাক গ্রহণ এর ক্ষমতা আগে ছিল তখন কিছু বললে কি বৈধ হতো?5. আর বর্তমানে আছে কি? আমি আমার ওয়াসওয়াসা (মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অবসেসিভ থট)-এর সমস্যার কারণে স্বামীকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যার ফলে আমাদের মধ্যে একটি বড় ধরণের ভুল বোঝাবুঝি, কথা কাটাকাটি ও ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।, আমাদের ঝগড়াটি শুরু হয়েছিল আমার স্বামী প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "Just leave me alone"। তিনি আরও বলেন, "Jkhni vabi kichu bolbo na r, Tkni tor natok suru hoi" এবং চরম হতাশা প্রকাশ করে লেখেন, "Tor sathe 3/4 mas ai thakte parchi na, Baki jobon ki aksathe somvob?"। তার এই ভবিষ্যৎ নিয়ে করা প্রশ্ন ও দূরত্বের কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি জানতে চাই, "To ki korte chaisen, Bolen suni"। জবাবে তিনি আমাকে বলেন, "Tui kor"। এই "কোনো দায়িত্ব না নিয়ে নিজেই করতে বলা" কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি যখন আবার জানতে চাই, "Ki korbo?" (এটা বলার সময় ওয়াসওয়াসা কাজ করছিল মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল ), তখন তিনি রেগে গিয়ে বলেন, "Ja Kore baracchis" এবং ওসব বিষয় নিয়ে তাকে আর কোনো মানসিক চাপ না দিতে বারণ করে বলেন, "But amke para dibi na oisob nia"। তখন আমি প্রশ্ন করি, তুই কর বলার দ্বারা "Eta diye ki apnk bad dite bolsilen" অর্থাৎ আমি জানতে চাই যে তিনি তাঁর এই কথার দ্বারা আমাকে বা আমাদের সম্পর্ককে তাঁর জীবন থেকে বাদ দিতে বলছেন কি না? তখন তিনি উত্তর দেন, "Iccha hole dibi" এবং জানান যে তিনি তা মেনে নেবেন অর্থাৎ "Accept kore nibo"। সবশেষে আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিষ্কার জানিয়ে দিয়ে বলি, "Iccha nai kono"( এইটা বলার সময় ওয়াসওয়াসা কাজ করছিল মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল ) এবং "Dewar iccha nai"। এগুলো বলার পরে উনি আমাকে বলেন যে তোকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিয়ে রাখালাম আমি বলি নিবনা এই অধিকার এবং উনি বার বার বলতে থাকে আর আমি বার বার বলি নিবো না ।আমাদের মধ্যকার এই ভুল বোঝাবুঝি আরও জটিল আকার ধারণ করে । উনি আবার ও বলেন যে তোকে তালাকের অধিকার দিয়ে রাখলাম আমি তখন বলি যে নিবো না জোর করে দিবেন নাকি উনি বলেন যে হ্যাঁ আমি বলি জোর করে দেওয়া যায়না আমি নিলাম না ৬. অধিকার কি ছিল আমি না বলে দেওয়ার পরেও মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে কি সমস্যা হত । আমি যখন আবারও নিশ্চিত হতে জানতে চাই, তুই কর বলার দ্বারা"Amk ki nije thake dite bolsilen ETA jante chaisi", তখন তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আরও বলেন, "Dia deh to dia sesh kor"রেগে বলেছেন সত্যি সত্যি তালাক দিতে বলেন নি । এর উত্তরে আমি সরাসরি জানিয়ে দিই, "Dibona"( এটা বলার সময় ওয়াসওয়াসা কাজ করছিল মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল) তখন তিনি আমাকে তাঁর নিজের এলাকায় আসার কথা বলে লেখেন, "Rajshahi ay"। পরিস্থিতি শান্ত করতে আমি মূল বিষয়ে ফিরে এসে তাকে বলি tui kor বলার দ্বারা কি বুঝিয়েছে তাই জিজ্ঞাসা করি "Ami ki ask korchi setar uttor den"। আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "Ay bollam na oita mean kori ni" অর্থাৎ তিনি তখন আমাকে ডিভোর্স দিতে বলেন নি তুই কর বলার দ্বারা । আমার যেহেতু ওয়াসওয়াসার সমস্যা আছে তাই আমি কথা গুলো বলার সময় মনের মধ্যে স্ত্রীর তালাক গ্রহণের কথা গুলো মাথায় ঘুরছিল মুখ দিয়ে উচ্চারণ হয়নি মনে মনে বলছিলাম আর ঢোক গিলছিলাম ।তুই কর বা দিয়ে দে শেষ কর বলার দ্বারা উনি আমাকে নিজে থেকে তালাক দিতে বলেন নি বা গ্রহন করতে বলেন নি। ৭. মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে কি সমস্যা হত ৮ যেহেতু উনি অধিকার দেওয়া বুঝায় নি আর অধিকারের কথা বলার সময় আমি না করে দিয়েছিল তাহলে কি মুখ ফসকে কিছু বার হয়ে গেলে সমস্যা হত ঝগড়া শেষ হলে আমি আবার বলি যে আমি এই অধিকার নিবো না আপনি দিয়েন না উনি বলেন ওকে । আর একদিন আমি স্বামীকে বলেছিলাম যে আমি আর এক সেকেন্ড ও আপনার সাথে থাকতে চাই না বা থাকবো না উনি তখন তখন তালাকের নিয়ত ছাড়া বলেছিলেন যে তো থাকিস না মানে জোর করে রাখবেন না এমন বুঝিয়েছেন । এতে কোন সমস্যা হবে কি । এবং আজকেও হামি দিচ্ছিলাম তখন আল্লাহ বলছিলাম কিন্তু মনে মনে ওই একই কথা ঘুরছিল। আমি আমার প্রশ্নগুলো সিরিয়াল নম্বর দিয়ে লিখে রেখেছি দয়া করে একটু দেখে উত্তর দিয়েন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ওয়াসওয়াসা (মানসিক সন্দেহ ও খুঁতখুঁতানি) একটি রোগ। ইসলামে এর কোনো গুরুত্ব নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ»
(বুখারী, মুসলিম)
অর্থ: “আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।”
সুতরাং মনের মধ্যে শুধু চিন্তা আসা, তা বারবার আসলেও কোনো তালাক হয় না।
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর ক্রমান্বয়ে দেওয়া হলো:
১. ইসলামী বিধান অনুযায়ী কি আপনার কাছে তালাকের অধিকার ছিল?
না, ছিল না। কারণ:
- আপনার স্বামী বিয়ের সময় বা কাবিননামা লেখার সময় এই শর্ত সম্পর্কে জানতেনই না। কাজী স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজে থেকে ১৮ নম্বর কলাম পূরণ করেছেন, যা শরীয়তসম্মত নয়।
- স্বামীর অজান্তে বা তার ইচ্ছা ছাড়া তালাকের অধিকার দেওয়া বৈধ হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩০৬; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩৪২)
- আপনি যখন জানতে পেরে স্বামীকে বলেছেন, তখন তিনি হাসতে হাসতে বলেছেন “দিয়ে রাখব” কিন্তু আপনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। তালাকের অধিকার গ্রহণ না করলে তা কার্যকর হয় না। (ফতোয়ায়ে শামী, ৩/৩০৬)
আল্লাহর কাছে আপনার অবস্থান: আপনারা উভয়েই এই বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন, কাজী ভুল করেছেন। আপনারা এখন যে সঠিক পথে আসছেন, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। তালাকের অধিকার আপনার ছিল না এবং এখনও নেই।
২. আগে কি আপনার কাছে অধিকার ছিল?
না। স্বামী জানতেন না, কাজী তাঁর অনুমতি ছাড়া লিখেছেন—এতে কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আপনার ওয়াসওয়াসার কারণে কিছু বার মনে মনে চিন্তা আসা বা মুখ ফসকে কিছু বললে কোনো সমস্যা হয় না, কারণ ওয়াসওয়াসার কারণে বলা কথা শরীয়তে গণ্য হয় না।
(ফতোয়ায়ে শামী, ১/২২৮; কিতাবুল আছল, ১/৩৭২)
৩. এখন কি আপনার কাছে অধিকার আছে?
না। স্বামী পরে বলেছেন যে তিনি অধিকার দেননি। আর আপনি বারবার না বলেছেন। তাই কোনো অধিকার নেই।
৪. আগে কি নিজেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা ছিল?
না, অধিকার না থাকায় ক্ষমতাও ছিল না। অতএব আগে কিছু বললেও তালাক হতো না।
৫. বর্তমানে কি ক্ষমতা আছে?
না। এখনো নেই।
৬. অধিকার না থাকা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে কী হতো?
যেহেতু আপনার কাছে অধিকার ছিল না, তাই মুখ দিয়ে ‘তালাক’ উচ্চারণ করলেও কোনো তালাক হতো না। তাছাড়া আপনার উচ্চারণ যদি অর্ধনিদ্রা অবস্থায়, নিয়ত ছাড়া, ওয়াসওয়াসার কারণে হয়, তাহলে তা অবশ্যই কার্যকর হবে না।
(ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩৭৪; ‘ইলাউস সুনান, ১০/৩৩৩)
৭. মুখ ফসকে ‘তালাক দিলাম’ বা ‘গ্রহণ করলাম’ বলে ফেললে কী হতো?
- যদি অধিকার থাকত, তাহলে সচেতন অবস্থায় নিয়ত ছাড়া ‘তালাক’ বললেও তালাক হয়ে যেত (হানাফী মতে) যদি স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলা হয়।
- কিন্তু যেহেতু আপনার অধিকার নেই, তাই কোনো প্রভাব পড়ত না।
- আর যদি অর্ধনিদ্রা বা অজ্ঞান অবস্থায় বলতেন, তাহলে কখনোই তালাক হতো না। (শরহু মা‘আনিল আছার, ৩/১৩৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/২২৭)
৮. স্বামীর ‘তুই কর’, ‘দিয়ে দে শেষ কর’ ইত্যাদি কথার দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
স্বামী নিজেই পরে স্পষ্ট বলেছেন যে তিনি ‘তুই কর’ বলে তালাক দিতে বোঝাননি, বরং ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাই এর দ্বারা কোনো তালাক হয়নি। আপনার ওয়াসওয়াসার কারণে আপনি ভুল বুঝেছেন—এতে কোনো দোষ নেই।
৯. স্বামীর ‘তো থাকিস না’ বলার দ্বারা কী তালাক হয়েছে?
না। তিনি তালাকের নিয়ত করেননি, বরং জোর করে রাখবেন না—এমন অর্থ বুঝিয়েছেন। তাই কোনো তালাক হয়নি। নিয়ত ছাড়া ‘তালাক’ শব্দ না বললে তালাক হয় না। (ফতোয়ায়ে শামী, ৩/২৩২)
১০. আপনার ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা কী?
- ওয়াসওয়াসার সময় ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম’ পড়ুন এবং চিন্তা দূর করার চেষ্টা করুন।
- ইমাম ও আউযা‘ঈ বলেছেন: যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, তার জন্য কর্তব্য হলো ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া। মনে এলে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে চলে যান।
- আল্লাহর কাছে দো‘আ করুন : رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
- মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সারসংক্ষেপ
- আপনার তালাকের অধিকার ছিল না, নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না যতক্ষণ স্বামী আপনাকে স্পষ্টভাবে না দেন এবং আপনি গ্রহণ না করেন।
- মনের চিন্তা, অর্ধনিদ্রার কথা, ওয়াসওয়াসার কারণে মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কিছুই তালাক নয়।
- স্বামীর ‘তুই কর’ বা ‘দিয়ে দে’ কথার দ্বারাও কোনো তালাক হয়নি।
- আপনাদের দাম্পত্য জীবন সম্পূর্ণ বৈধ ও সুস্থ রয়েছে। এখন থেকে ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা না দিয়ে স্বামীর সাথে সুন্দরভাবে চলার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি দিন এবং আপনার সংসারে শান্তি দান করুন। আমীন।
📚 তথ্যসূত্র
- ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার) ৩/৩০৬, ৩/২২৭, ৩/২৩২
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ১/৩৪২, ১/৩৭৪
- কিতাবুল আছল ১/৩৭২
- শরহু মা‘আনিল আছার ৩/১৩৫
- বুখারী, মুসলিম (হাদীস: মনের কথা ক্ষমা)