বিদেশে (USA) স্থায়ীভাবে থাকার কারণে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা কি শরীয়ত সম্মত?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
একটি বিষয়ে শরয়ি পরামর্শ চাই।
অনেক দিন ধরে বিয়ের জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। আল্লাহর ফয়সালায় এখনো কোনো প্রস্তাবে মিল হয়নি। বর্তমানে একটি প্রস্তাব এসেছে। পাত্র USA-তে থাকে এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু আমার নিজের কোনো দিনই বিদেশে স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা ছিল না। বিশেষ করে দ্বীন ঠিকভাবে পালন, ভবিষ্যৎ সন্তানদের ইসলামী পরিবেশে বড় করা এবং নিজের জীবন-পরিকল্পনার কথা ভেবে বিদেশে স্থায়ী হওয়া নিয়ে আমার স্বস্তি নেই। এ কারণে মন থেকে রাজি হতে পারছি না। তবে পরিবার এই প্রস্তাবে আগ্রহী। আমি ইস্তিখারাও করেছি, কিন্তু কোনো স্পষ্ট ইশারা বুঝতে পারিনি। অন্যদিকে বয়সও বাড়ছে। কখনো কখনো মনে হয়, এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে পরে আর উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যাবে কি না। আবার এটাও বিশ্বাস করি যে বিয়ে আল্লাহর দেওয়া রিযিক, তাই ভয় বা দুশ্চিন্তার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।
আমার প্রশ্ন হলো:
১. শুধু বিদেশে (যেমন USA) স্থায়ীভাবে থাকার অনিচ্ছার কারণে এমন একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা কি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত?
২. নাকি পাত্র দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রের হলে শুধু এই কারণেই না বলা উচিত হবে না?কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানালে উপকৃত হব। জাযাকাল্লাহু খাইরান
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত জবাব: ১. শুধুমাত্র বিদেশে (বিশেষ করে অমুসলিম দেশে) স্থায়ীভাবে বসবাসের অনিচ্ছার কারণে একটি দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রের পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে, যদি আপনার দ্বীনি উদ্বেগ (যেমন দ্বীন পালনে অসুবিধা, সন্তানদের ইসলামী পরিবেশে বড় করতে পারবেন কিনা) সত্যিই গভীর হয়। তবে এটি ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
২. যদি পাত্র দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রের অধীকারী হয়, তবুও শুধু বিদেশে স্থায়ী হওয়ার কারণে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যদিও বৈধ, তবে উচিত হবে না বলার আগে বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ দ্বীনদার স্বামী অনেক ক্ষেত্রে দ্বীনি ও পার্থিব উভয় কল্যাণের কারণ হতে পারেন। তবে কোনো নারীর জন্য তার দ্বীনি স্বস্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ:
১. দ্বীনদার পাত্রের গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إذا جاءكم من ترضون دينه وخلقه فزوجوه، إلا تفعلوا تكن فتنة في الأرض وفساد عريض" অর্থ: "তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তাহলে জমিনে ফিতনা ও বড় ফাসাদ সৃষ্টি হবে।" (তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, দ্বীনদার ও চরিত্রবান পাত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্য কোনো বৈধ কারণে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।
২. দ্বীনি পরিবেশের গুরুত্ব ও বিদেশে স্থায়ী হওয়ার বিধান: কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا" অর্থ: "তোমাদের দাসীদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না, যদি তারা সতীত্ব রক্ষা করতে চায়।" (সূরা নূর: ৩৩)
এ থেকে বোঝা যায়, নারীর সতীত্ব ও দ্বীন রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিদেশে স্থায়ী হওয়ার কারণে আপনার দ্বীন পালনে বা ভবিষ্যৎ সন্তানদের ইসলামী শিক্ষায় বাধা আসে, তাহলে এ উদ্বেগ বৈধ।
হানাফি ফিকহের মতামত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার শিষ্যদের মতে, স্ত্রীকে স্বামীর দেশে নিয়ে যাওয়া কিছু শর্তে জায়েজ। যদি স্বামীর দেশ এমন হয় যেখানে স্ত্রীর দ্বীনি আমল বা নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্ত্রী যেতে বাধ্য নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪১)
বিশেষ করে অমুসলিম দেশে বসবাসের ব্যাপারে হানাফি ফুকাহারা বলেন:
إذا خافت المرأة على دينها أو دين أولادها من السفر إلى بلد الكفر، فلا يجب عليها السفر، بل يحرم إذا كان الخوف غالباً অর্থ: "যদি কোনো নারী কুফরি দেশে সফরে গিয়ে নিজের বা সন্তানদের দ্বীন সম্পর্কে ভয় করে, তাহলে তার ওপর সফর করা ওয়াজিব নয়, বরং যদি ভয় প্রবল হয় তাহলে হারাম।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/২৮০)
৩. ইস্তিখারার পর সিদ্ধান্ত: ইস্তিখারা করার পর কোনো স্পষ্ট ইশারা না পেলে, আপনি আপনার অন্তরের স্বস্তি ও দ্বীনি উদ্বেগের ওপর নির্ভর করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"استفت قلبك، وإن أفتاك الناس وأفتوك" অর্থ: "তোমার অন্তরকে ফতোয়া দিতে দাও (অর্থাৎ অন্তরের সাক্ষ্য নাও), যদিও লোকেরা তোমাকে ফতোয়া দেয়।" (আহমাদ, হাদিস: ১৮০২৭)
অর্থাৎ, যদি আপনার মন রাজি না হয় এবং দ্বীনি উদ্বেগ থাকে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ব্যবহারিক পরামর্শ:
- পাত্রটি দ্বীনদার হলে, তার সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ থাকলে (মাহরামের মাধ্যমে) বিদেশে দ্বীনি জীবনযাপন, সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা, ও আপনার উদ্বেগগুলো শেয়ার করুন।
- যদি পাত্র USA-তেও দ্বীনদার জীবনযাপনে আগ্রহী হন এবং সেখানে ইসলামী কমিউনিটিতে থাকার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
- বয়স ও পরিবারের চাপের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখুন। তিনি উত্তম রিযিক দানকারী।
সারসংক্ষেপ:
- শুধু বিদেশে স্থায়ী হওয়ার অনিচ্ছা – যদি দ্বীনি উদ্বেগ থেকে হয়, তাহলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত।
- পাত্র দ্বীনদার হলেও – যদি আপনার দ্বীনি স্বস্তি না থাকে, তাহলে প্রত্যাখ্যান করা জায়েজ, তবে ভালোভাবে ফয়সালা করা উচিত।
- সর্বোত্তম পন্থা: পাত্রের দ্বীনদারি ও চরিত্র মূল্যায়ন, তার বিদেশে দ্বীনি জীবনযাপনের পরিকল্পনা জানা, এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ইস্তিখারার পর আপনার অন্তর যেদিকে ঝোঁকে, তা গ্রহণ করুন।
দোয়া: আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন এবং আপনার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করুন। আমীন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।