মুরগী পালনের জন্য ঘরে তাবিজ বা লোহা লটকানো
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামে তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার ওপর রাখতে হবে। কোনো বস্তু বা উপকরণ নিজে নিজে উপকার বা ক্ষতি করতে সক্ষম – এই বিশ্বাস রাখা শিরক। কিন্তু একটি বস্তুকে সবব (কার্যকরী মাধ্যম) হিসেবে ব্যবহার করা, যার ক্ষমতা আল্লাহই দিয়েছেন, তা জায়েয এবং শিরক নয়।
১. লোহা বা চাবি ঝুলিয়ে রাখা কি শিরক?
যে আলেম আপনাকে বলেছেন তিনি কুরআন তেলাওয়াত করে লোহা বা চাবি পড়ে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখতে, এর উদ্দেশ্য হলো – কুরআনের বরকত ও আল্লাহর নামের মাধ্যমে জ্বিনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া। এটি মূলত একটি তা'বীজ (تعويذ) বা রুকইয়াহ-এর মতো। হানাফী ফিকহে কুরআনের আয়াত বা সহীহ দু‘আ লিখে বা পড়ে তা‘বীজ তৈরি করা জায়েয, যদি তা অপবিত্র স্থানে না থাকে এবং তার প্রতি নির্ভরতা না রেখে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা হয়।
হানাফী কিতাবের উল্লেখ:
- রদ্দুল মুহতার (৫/২৩৩): কুরআনের আয়াত ও সহীহ দু‘আ দিয়ে তা‘বীজ লেখা জায়েয।
- ফতোয়া উসমানী (২/৪৪০): যদি তা‘বীজে কুরআনের আয়াত থাকে এবং ব্যবহারকারী আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তবে তা জায়েয; কিন্তু শুধু বস্তুটির ওপর ভরসা করা শিরক।
লোহা বা চাবির ব্যাপারে: কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, লোহা জ্বিনের জন্য অস্বস্তিকর (যেমন: 'লোহা জ্বিন থেকে বাঁচায়' – মুসনাদে বাযযার, সহীহ নয়)। তবে এটি একটি প্রাকৃতিক কারণ (সবব) হতে পারে, যেমন সর্দি-কাশির জন্য পানি পান করা। তাই যদি আপনি মনে করেন যে, এই লোহা নিজে থেকে কোন ক্ষমতা রাখে, তবে তা শিরক। কিন্তু যদি আপনি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহই রক্ষাকারী আর এই লোহা কেবল একটি মাধ্যম (যেমন কুরআন পড়ার মাধ্যমে বরকত নিয়ে আসে), তবে তা শিরক নয়।
তবে সতর্কতা: অনেক বুজুর্গ এই ধরনের তা‘বীজ ঝুলানো থেকে বিরত থাকতে বলেন, কারণ এতে শিরকের সম্ভাবনা থাকে এবং তা পূর্ববর্তী মুশরিকদের রীতি বলে মনে হতে পারে। তাই উত্তম হলো সরাসরি কুরআন তেলাওয়াত ও দু‘আ করা।
২. বিকল্প পদ্ধতি (সুন্নাহসম্মত উপায়)
উপরোক্ত পদ্ধতি জায়েয হলেও নিম্নোক্ত সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিগুলো বেশি নিরাপদ ও কার্যকর:
ক. ঘরে ও মুরগির খাঁচায় নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা
- আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁক দেওয়া (প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা)।
- সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস (৩ বার) পড়ে ফুঁক দেওয়া।
- সূরা বাকারাহ পাঠ করা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যেই ঘরে সূরা বাকারাহ পড়া হয়, সেখানে শয়তান প্রবেশ করে না।” (সহীহ মুসলিম)
খ. জিকির ও দু‘আ
- বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করা।
- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাই’ইন ক্বাদীর – দিনে ১০০ বার পড়া।
- আ‘উযু বি কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক – তিনবার সকাল-সন্ধ্যা পড়া (আবু দাউদ)।
গ. ছাদাকাহ ও দান
অনেক সময় জ্বিনের সমস্যা বা বালা-মুসিবত দূর করতে ছাদাকাহ করা সুন্নত। কিছু টাকা বা খাবার গরিব-মিসকিনকে দিন।
ঘ. পেশাদার আলেম থেকে রুকইয়াহ করানো
যদি জ্বিনের সমস্যা প্রকট হয়, তবে কোনো অভিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে শার‘ঈ রুকইয়াহ করানো জরুরি। যাতে কুরআন ও সুন্নাহসম্মত দু‘আ দ্বারা জ্বিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
ঙ. স্বাভাবিক কারণ পরীক্ষা করা
মুরগি মরা শুধু জ্বিনের কারণে না-ও হতে পারে। রোগব্যাধি, খাদ্যের সমস্যা বা পরিবেশগত কারণও থাকতে পারে। পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার উল্লিখিত পদ্ধতি (লোহা/চাবি পড়ে ঝুলানো) শিরক হবে না যদি আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল থাকে এবং বস্তুটিকে শুধু মাধ্যম মনে করা হয়। তবে এটাকে সুন্নাহ মনে করা যাবে না। সুন্নাহসম্মত উপায় হলো সরাসরি কুরআন তেলাওয়াত ও দু‘আ পড়া এবং সেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
অতএব: আপনি চাইলে আলেম সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী করতে পারেন, তবে সাথে উপরে উল্লেখিত সুন্নাহ পদ্ধতি অবলম্বন করাই উত্তম। দ্বীনের ব্যাপারে সতর্কতা ও সহজতা উভয়ই রাখা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে জ্বিনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং আপনার মুরগি পালনকে বরকতময় করুন। (আমিন)