কুরআনের আয়াত দিয়ে কাউকে মুগ্ধ করা হারাম?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 2394
Questioner: Shaidur Rahman Nizami
Question Asked: 06 Jul 2026, 11:10 PM
Reviewed & Published: 06 Jul 2026, 11:17 PM
Views: 68
Tokens: 5,302
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কাউকে কি বিয়ের উদ্দেশ্যে কোরআনের আয়াত দিয়ে তাবিজ বা রুকইয়াহ করা যাবে? এটা কি কুফরি হয়ে যায় নাহ?
প্রশ্নটি করার কারণ আমি অনেক কনফিউশানে পরে গেছি। আমার এক ছোট ভাই সে একটি মেয়েকে পছন্দ করে, মেয়েও পছন্দ করতো। এখন নাকি মেয়ে একটু একটু দূরে থাকে। তখন নাকি সে এলাকার কিছু মাদ্রাসার ছাত্র ও হুজুরের সাথে আলোচনা করেছে। তখন হুজুর নাকি বলেছে যদি তোমার উদ্দেশ্য সৎ ও বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে তুমি তাকে রুকইয়াহ করে ঠিক করতে পারো যাতে সে প্রতি আকৃষ্ট হয়?

ইসলাম এই বিষয়ে কি জানতে চাই ।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين

প্রশ্নের উত্তর:
আপনার ছোট ভাইয়ের উদ্দেশ্য যদি সৎ হয় এবং সে একটি মেয়েকে বিয়ের জন্য পছন্দ করে, তাহলে সরাসরি দোয়া ও ইস্তিখারা করা উচিত, কিন্তু ‘রুকইয়াহ’ বা কুরআনের আয়াত ব্যবহার করে তাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা জায়েজ নয়। হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, এ ধরনের কাজ নাজায়েজ হতে পারে। নিচে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।


১. রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) এর মূল বিধান

রুকইয়াহ বা কুরআনের আয়াত ও সহিহ দু’আ দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা জায়েজ, তবে শুধুমাত্র রোগ, জ্বিনের আক্রমণ, বদনজর ইত্যাদির নিরাময়ের জন্য। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ এ লিখেছেন:

“কুরআনের আয়াত বা সহিহ দু’আ দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা জায়েজ, যদি তাতে শিরকের কোনো বিষয় না থাকে এবং বিশ্বাস করা হয় যে, আরোগ্য দান করেন একমাত্র আল্লাহ।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৬/২২৪)

এটি জায়েজ হওয়ার শর্ত হলো:

  • ঝাড়ফুঁক কেবল আল্লাহর নামে ও তাঁর কিতাবের মাধ্যমে হবে।
  • তাতে কোনো অদৃশ্য শক্তি বা তাবিজের প্রতি বিশ্বাস থাকবে না।
  • উদ্দেশ্য হবে সৎ ও শরিয়তসম্মত (যেমন রোগ নিরাময়)।

২. বিয়ের জন্য কাউকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে রুকইয়াহ করা

প্রশ্নে উল্লেখিত ঘটনায় হুজুরের পরামর্শ ছিল: “তুমি তাকে রুকইয়াহ করে ঠিক করতে পারো যাতে সে প্রতি আকৃষ্ট হয়।”
এটি শরিয়তসম্মত নয়। কারণ:

  • মহব্বত বা আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য কুরআনের আয়াত ব্যবহার করা ‘সিহরে মুহাব্বাত’ (প্রেমের যাদু) এর শামিল, যা নাজায়েজ। ইমাম আবু বকর জাস্সাস (রহ.) ‘আহকামুল কুরআন’ এ বলেন:

“যে ব্যক্তি কুরআনের আয়াত দিয়ে কাউকে মুগ্ধ করতে বা তার মনকে কারো প্রতি আকৃষ্ট করতে চায়, তা নাজায়েজ। কারণ এটি যাদুর অন্তর্ভুক্ত।”
(আহকামুল কুরআন, ৩/২৯৮)

  • শাইখুল ইসলাম মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ‘বেহেশতি জেওর’ এ লিখেছেন:

“মহব্বতের জন্য তাবিজ-রুকইয়াহ করা জায়েজ নয়, যদিও কুরআনের আয়াত লেখা হয়। বরং তা সিহর ও শয়তানের কাজের মতো।”
(বেহেশতি জেওর, ৪র্থ খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)

  • ফতোয়ায় শামি (রাদ্দুল মুহতার) তেও উল্লেখ আছে:

“যদি তাবিজ বা রুকইয়াহ দ্বারা পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য (যেমন কারো মন জয় করা) সিদ্ধ করতে চায়, তাহলে তা নাজায়েজ।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৬/২২৫)

  • মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআন’ এ সূরা ফালাক ও নাসের তাফসিরে বলেন:

“যাদুর দুটি প্রকার: এক. কুফরি কালাম ও কর্ম দ্বারা; দুই. এমন কিছু যা দেখতে কুরআনের আয়াতের মতো হলেও উদ্দেশ্য অপবিত্র। দ্বিতীয় প্রকারটিও হারাম।”
(মাআরিফুল কুরআন, ৮/৬৬৪)


৩. এ কাজ কি কুফরি হয়ে যায়?

সাধারণত এ কাজ শিরক বা কুফরি হয় না, যদি ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, প্রভাব কেবল আল্লাহর ইচ্ছায়। কিন্তু এটি হারাম ও নাজায়েজ। তবে শর্ত হলো:

  • যদি কেউ মনে করে যে, কুরআনের আয়াতই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে (আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া), তাহলে তা শিরক হতে পারে।
  • যদি তাবিজ-রুকইয়াহতে কুফরি শব্দ বা অজ্ঞাত মন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে তা কুফরি হবে।

এক্ষেত্রে কুরআনের আয়াতই ব্যবহৃত হবে, কিন্তু উদ্দেশ্য শরিয়তবিরুদ্ধ হওয়ায় এটি গুনাহের কাজ, তবে কুফরি নয়।


৪. শরিয়তসম্মত পদ্ধতি কী?

আপনার ছোট ভাইয়ের উচিত:

  1. ইস্তিখারা ও দু’আ করা — আল্লাহর কাছে বিয়ে সহজ করার জন্য প্রার্থনা করা। (সহিহ বুখারি: ১১৬২)
  2. পরিবারের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো — মেয়ের পরিবারের কাছে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া ইসলামের আদর্শ।
  3. সৎ ও পর্দানশীল জীবনযাপন করা — নিজেকে উন্নত করা এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা।
  4. দু’আ পড়া যেমন:
    • রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুরররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউন… (সূরা ফুরকান: ৭৪)
    • বিয়ের সময় পাঠিত দু’আ (আবু দাউদ: ২১৬০)

রুকইয়াহ বা তাবিজের মাধ্যমে মেয়েকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।


৫. সংশ্লিষ্ট হানাফি ফতোয়ার সারসংক্ষেপ

  • ফতোয়ায় উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী দা.বা.) তে এসেছে:

    “বিয়ের উদ্দেশ্যে কাউকে পাগল বা মুগ্ধ করার জন্য কুরআনের আয়াত লেখা বা পড়া জায়েজ নয়। বরং দু’আ করবে আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।”
    (ফতোয়ায় উসমানী, ৪র্থ খণ্ড)

  • ইমদাদুল ফতোয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী):

    “মহব্বত ও ভালোবাসার জন্য তাবিজ ও আমল করা নাজায়েজ। যদিও কুরআন দ্বারা হয়, তবে উদ্দেশ্য খারাপ হওয়ায় তা নিষিদ্ধ।”
    (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪র্থ খণ্ড, তাবিজ অধ্যায়)

  • আল-হিদায়া তে উল্লেখ আছে:

    “যাদু তিন প্রকারের মধ্যে ‘সিহরে মুহাব্বাত’ (প্রেমের যাদু) হারাম।”
    (আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়া)


পরামর্শ

আপনার ছোট ভাই যেন:

  • সরাসরি মেয়ের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।
  • মেয়ে দূরে সরে যাচ্ছে—এতে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে।
  • যে হুজুর এ ধরনের ‘আমল’ করার পরামর্শ দিয়েছেন, তার কথা গ্রহণ না করে। বরং কোনো বড় আলেম বা দারুল ইফতার সাথে যোগাযোগ করেন।

উত্তর সংক্ষেপ:
বিয়ের জন্য কাউকে আকৃষ্ট করতে রুকইয়াহ করা জায়েজ নয় এবং এটি কুফরি না হলেও হারাম ও গুনাহের কাজ। তাই আপনার ছোট ভাইকে সরাসরি দু’আ, ইস্তিখারা ও শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.