নবী ﷺ-এর রওজার মাটি আল্লাহর আরশ থেকে উত্তম বলা কি শিরক?
Faith and Belief · Hanafi
Question
উস্তাজ কেউ যদি মনে করে যে নবিজী (সাঃ) এর শরীর যেই মাটিতে মিলিত হয়েছে সেই স্থান আল্লহর আরশ থেকেও বেশি উত্তম তাহলে কি এটা শিরক হবে? একজন দাবি করেছে যে, ফাযায়েলে হজ্জে এমন লেখা আছে
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
কেউ যদি বিশ্বাস করে যে, নবী করীম ﷺ-এর শরীর যে মাটিতে মিলিত হয়েছে (অর্থাৎ রওজা মোবারকের মাটি/পবিত্র শরীরের সংস্পর্শে আসা মাটি) সেই স্থান আল্লাহর আরশ থেকেও উত্তম, তাহলে তা কি শিরক হবে? একজন দাবি করেছে যে, "ফাযায়েলে হজ্জ" কিতাবে এমন লেখা আছে।
উত্তর
১. মূল বিষয়: "উত্তম" (আফদাল) বলার অর্থ কী?
এখানে দুটি ভিন্ন বিষয় আলাদা করতে হবে:
ক) স্থান হিসেবে উত্তম হওয়া (মাকান হিসেবে আফদালিয়্যাত)
খ) ইবাদতের স্থান হিসেবে উত্তম হওয়া (মাসজিদ/ইবাদতগাহ হিসেবে আফদালিয়্যাত)
এবং আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
গ) সৃষ্টির মধ্যে তুলনা (তাফযীল বাইনা আল-মাখলুকাত) — এটি জায়েয।
ঘ) স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে তুলনা (তাফযীল বাইনা আল-খালিক ওয়া আল-মাখলুক) — এটি কুফর/শিরক।
২. "আল্লাহর আরশ থেকে উত্তম" — এ কথার বিশ্লেষণ
যদি কেউ বলে: "নবী ﷺ-এর রওজা মোবারকের মাটি আল্লাহর আরশের চেয়েও উত্তম" — এ কথাটি কয়েকভাবে বলা হতে পারে:
(ক) যদি অর্থ হয়: "আল্লাহর আরশ আল্লাহর কাছে যতটা সম্মানিত, তার চেয়ে নবী ﷺ-এর রওজার মাটি আল্লাহর কাছে বেশি সম্মানিত"
এটি আল্লাহর আরশকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা, যা সরাসরি কুফর ও শিরক। কারণ আল্লাহর আরশ হলো আল্লাহর মহিমার সর্বোচ্চ নিদর্শনসমূহের একটি; এটি সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ
"আরহমান (আল্লাহ) আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।"
— (সূরা ত্বহা: ৫)
আরশ আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি, যা সাত আসমান ও জমিনের চেয়েও বড় ও মহান। হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَا السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ فِي الْكُرْسِيِّ إِلَّا كَحَلْقَةٍ مُلْقَاةٍ فِي أَرْضٍ فَضَاءٍ، وَفَضْلُ الْعَرْشِ عَلَى الْكُرْسِيِّ كَفَضْلِ تِلْكَ الْأَرْضِ عَلَى تِلْكَ الْحَلْقَةِ»
"সাত আসমান কুরসির তুলনায় এমন, যেমন একটি মাঠে ফেলে দেওয়া একটি আংটি; আর কুরসির উপর আরশের শ্রেষ্ঠত্ব তেমন, যেমন সেই মাঠের উপর সেই আংটির শ্রেষ্ঠত্ব।"
— (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ৮৭৩৫; ইবনে আবি শাইবা, আল-আরশ; ইবনে জারীর তাবারী; ইবনে কাসীর 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া'তে উল্লেখ করেছেন; আলবানী 'সিলসিলা সহীহা' নং ১০৯-এ সহীহ বলেছেন)
সুতরাং আল্লাহর আরশের চেয়ে কোনো সৃষ্টিকে উত্তম বলা — এটি আকীদার সরল বিচ্যুতি।
(খ) যদি অর্থ হয়: "নবী ﷺ-এর রওজার মাটি অন্যান্য সাধারণ মাটির চেয়ে উত্তম"
এটি সঠিক ও জায়েয। কারণ নবী ﷺ-এর শরীর মোবারক সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা মাটি অবশ্যই সাধারণ মাটির চেয়ে সম্মানিত।
(গ) যদি অর্থ হয়: "নবী ﷺ-এর রওজার মাটি মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী, বাইতুল মুকাদ্দাসের চেয়েও উত্তম"
এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে আল্লাহর আরশের সাথে তুলনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় এবং তা কুফর।
৩. "ফাযায়েলে হজ্জ" কিতাবের দাবি
"ফাযায়েলে হজ্জ" বা "ফাযায়েলে আমল" (হযরত শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলবী রহ.-এর সংকলন) বা অনুরূপ কিতাবে যদি কোথাও এমন লেখা থাকে যে "রওজা মোবারকের মাটি আরশ থেকেও উত্তম" — তবে সেটির সঠিক ব্যাখ্যা হলো:
- এটি আরশের সাথে তুলনা নয়, বরং নবী ﷺ-এর মর্যাদা বোঝানো।
- অথবা এটি সৃষ্টির মধ্যে তুলনা — অর্থাৎ অন্যান্য স্থানের চেয়ে রওজার মাটি উত্তম।
- যদি কেউ আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর আরশের চেয়ে উত্তম বলে, তবে তা ভুল ও কুফর।
মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করেছেন: আল্লাহর আরশ, কুরসি, লাওহে মাহফুজ, জান্নাত, ফেরেশতাগণ — এগুলো আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি, যাদের মর্যাদা সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ। কোনো নবীর শরীর বা স্থানকে আল্লাহর আরশের চেয়ে উত্তম বলা আকীদার পরিপন্থী।
৪. হানাফী ফিকহ ও আকীদার কিতাবের বক্তব্য
ইমাম তাহাবী রহ. তাঁর 'আকীদা তাহাবিয়া'তে বলেন:
وَتَعَالَى عَنِ الْحُدُودِ وَالْغَايَاتِ وَالْأَرْكَانِ وَالْأَعْضَاءِ وَالْأَدَوَاتِ، لَا تَحْوِيهِ الْجِهَاتُ السِّتُّ كَسَائِرِ الْمُبْتَدَعَاتِ
"আল্লাহ তা'আলা সীমা, লক্ষ্য, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও যন্ত্রপাতি থেকে পবিত্র। ছয় দিক তাঁকে পরিবেষ্টন করে না, যেমনটি নব-আবিষ্কৃতদের (ভ্রষ্টদের) ধারণা।"
ইবনে আবিদীন শামী রহ. 'রাদ্দুল মুহতার'-এ (১/৫৬) বলেন:
وَالْعَرْشُ أَعْظَمُ الْمَخْلُوقَاتِ
"আরশ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।"
মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. 'মা'আরিফুল কুরআন'-এ সূরা ত্বহা: ৫-এর তাফসীরে বলেন:
"আরশ হলো আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, যা সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে।"
মুফতি তাকী উসমানী দা.বা. 'ফাতাওয়া উসমানী' (১/১৭৯) ও অন্যান্য ফাতাওয়ায় বলেন:
"আল্লাহর আরশ ও কুরসি সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ। কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর আরশের চেয়ে উত্তম বলা কুফর।"
৫. সিদ্ধান্ত
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | নবী ﷺ-এর রওজার মাটি সাধারণ মাটির চেয়ে উত্তম বলা | জায়েয | | নবী ﷺ-এর রওজার মাটি অন্যান্য মসজিদ/স্থানের চেয়ে উত্তম বলা | জায়েয (মতভেদসহ) | | নবী ﷺ-এর রওজার মাটি আল্লাহর আরশের চেয়ে উত্তম বলা | কুফর/শিরক — সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | | "ফাযায়েলে হজ্জ"-এর বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর আরশের সাথে তুলনা করা | ভুল ব্যাখ্যা; কিতাবের উদ্দেশ্য নয় |
সারকথা: আল্লাহর আরশ আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। কোনো নবী, ওলী, বা স্থানকে আল্লাহর আরশের চেয়ে উত্তম বলা আকীদা বিরোধী ও কুফর। "ফাযায়েলে হজ্জ"-এ যদি এমন কিছু থাকে, তবে তা নবী ﷺ-এর মর্যাদা বোঝানোর জন্য বলা হয়েছে, আল্লাহর আরশের সাথে তুলনা করার জন্য নয়। কেউ যদি আক্ষরিক অর্থে এমন বিশ্বাস করে, তবে তাকে তাওবা করতে হবে এবং আকীদা সংশোধন করতে হবে।
والله أعلم بالصواب