ওয়াসওয়াসা হতে মুক্তি পেতে সাহায্য চাই।
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন:
একজন রোগী, যার মনে নানান ধরনের চিন্তা আসে (যাকে ওয়াসওয়াসা বা অবসেসিভ থটস বলা হয়)। তিনি এই ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়ার জন্য মুফতি সাহেবের সাহায্য চাইছেন।
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
আপনার উল্লেখিত সমস্যাটি মূলত ওয়াসওয়াসা (وسوسہ) বা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এটি একটি সাধারণ মানসিক অবস্থা, যা অনেক মুমিনের হয়ে থাকে। তবে এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে ইসলামি পদ্ধতিতে সমাধান করা জরুরি।
১. ওয়াসওয়াসা কী?
ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে মনের মধ্যে খারাপ বা অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা ঢুকিয়ে দেওয়া। যেমন:
- নামাজের সময় মনে হয় যে নাপাকি হয়েছে।
- ঈমান নিয়ে সন্দেহ আসা।
- আল্লাহ, রাসূল বা ধর্ম সম্পর্কে অশ্রদ্ধাপূর্ণ চিন্তা আসা।
- বারবার তালাক বা শপথের চিন্তা আসা।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"শয়তান তোমাদের একজনের কাছে এসে বলে, কে এটা সৃষ্টি করেছে? কে ওটা সৃষ্টি করেছে? এমনকি সে বলে, কে আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে? যখন কেউ এরূপ পায়, সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং এর চিন্তা ছেড়ে দেয়।"
(সহিহ বুখারি: ৩২৭৬; সহিহ মুসলিম: ১৩৪)
২. মূলনীতি: ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করা
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো:
"ওয়াসওয়াসা দ্বারা কোনো কিছুই ওয়াজিব বা হারাম হয় না, যতক্ষণ না নিশ্চিত জ্ঞান বা দলিল না থাকে।"
(রদ্দুল মুহতার: ১/১২৯; আল-হিদায়া: ১/২৫)
অর্থাৎ, নামাজে মনে হলে যে বাতিল হয়ে গেছে, তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে পানি বা নাপাকির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
৩. করণীয় আমল ও পরামর্শ
ক. শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া:
- সূরা নাস, সূরা ফালাক, আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পড়ুন।
- যখনই খারাপ চিন্তা আসে, বলুন: "আমি আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাই" (أعوذ بالله من الشيطان الرجيم) এবং বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলার মতো করুন (শুকনো ঠোঁটে ফুঁ দিন)।
খ. চিন্তাকে তুচ্ছ করা:
-
ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন: "ওয়াসওয়াসা রোগীর জন্য একমাত্র চিকিৎসা হলো তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা এবং বিপরীত কাজ করা।"
(রদ্দুল মুহতার: ২/৪৩৩) -
যেমন, যদি মনে হয় তুমি কাফির হয়ে গেছ, তাহলে বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ুন। শয়তান চায় আপনাকে হতাশ ও উদ্বিগ্ন করতে।
গ. জ্ঞান ও ইবাদতে মগ্ন থাকা:
- কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, নফল নামাজ, দরুদ শরিফ পড়লে ওয়াসওয়াসা কমে যায়।
- শয়তানের ওয়াসওয়াসা তখনই আসে যখন মন খালি থাকে। তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
ঘ. ফতোয়া গ্রহণে সতর্কতা:
- নিজে নিজে ফতোয়া না দিয়ে কোনো আলেমের পরামর্শ নিন। তবে বারবার একই বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না, কারণ ওয়াসওয়াসা রোগীদের জন্য ফতোয়া জিজ্ঞাসা করাও ক্ষতিকর হতে পারে।
(ফাতাওয়া উসমানি: ১/৫৪৩)
৪. ডাক্তারি পরামর্শ
যদি চিন্তাগুলো এত বেশি হয় যে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, ঘুম ও খাওয়ার সমস্যা হয়, তাহলে একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের (Psychiatrist) পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ইসলামে চিকিৎসা করানো উত্তম।
(ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: ২৮/২৫৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৭৬)
৫. দোয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়েছেন:
- "اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَسَاوِسِ الصُّدُورِ وَشَتَاتِ الْأَمْرِ"
(হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে মনের ওয়াসওয়াসা ও কাজের বিক্ষিপ্ততা থেকে আশ্রয় চাই।) (আবু দাউদ: ৮২২; মিশকাত: ২৪২৫)
সারসংক্ষেপ:
- ওয়াসওয়াসা শয়তানের কাজ, এতে আতঙ্কিত হবেন না।
- উপেক্ষা করুন, বারবার একই বিষয়ে না ভেবে অন্য কাজে মন দিন।
- নিয়মিত জিকির ও দোয়া করুন।
- প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার যদি গুরুতর ওসিডি (OCD) থাকে, তাহলে আলেম এবং ডাক্তার—উভয়ের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। তবে হালাল উপায়ে চিকিৎসা করানো জায়েজ এবং উচিত।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
(উত্তরটি প্রস্তুতকরণে সহায়তা নেওয়া হয়েছে: ফাতাওয়া উসমানি, রদ্দুল মুহতার, আল-হিদায়া, ইমদাদুল ফাতাওয়া, বাহিশতি জেওর, কিতাবুল ফিকহ প্রভৃতি থেকে।)