গায়েবি কথা বলা, পোস্ট শেয়ার, মা-বাবাকে ডাকা, জাতীয় সংগীত ও গর্ভবতী মহিলার দিয়াশলাই দেওয়া — এগুলো কি শিরক?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 2318
Questioner: Mou
Question Asked: 04 Jul 2026, 05:47 PM
Reviewed & Published: 04 Jul 2026, 05:56 PM
Views: 55
Tokens: 5,718
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

তর কপাল খারাপ, তর ভবিষ্যত অন্ধকার এই ধরনের গায়েবি কথা কাউকে বললে কি তার শিরক হবে।আমি একটা পোস্ট শেয়ার করেছিলাম।সেখানে বলা এই ধরনে গায়েবি কথা কাউকে বললে শিরক হবে।এখানে গায়েবি শন্দটা উল্লেখ ছিল।এখন এইখানে কি যাকে পাঠিয়েছি ভুল বুজার সম্ভাবনা আছে??যদি ভুল বুজে আর আমি সেচ্ছায় তাকে না জানাই আমার কি ছুট বা বড় শিরক বা কুফুরি হবে??আর আরেকটা কথা ছিল বিপদে পড়ে আল্লাহকে বাদ দিয়ে ও মা ও বাবা এভাবে গায়েবি বলে ডাকা শিরক।এইখানে কি গায়েবি শব্দ ব্যবহার করায় বুজতে অসুবিধা হবে??আর বাংলাদেশে জাতিয় সংগিতে কি শিরক আছে?? প্রেগন্যান্ট মহিলাদের হাতে দেয়াশেলাই দিয়ে দেয় মনে করা যে এটা ব্যবহার করলে খারাপ জ্বীন থেকে তাকে রক্ষা করবে এই বিশ্বাস নিয়ে এসব ব্যবহার করা কি শিরক??

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া হলো হানাফি ফিকহ ও আকিদার আলোকে নিম্নরূপ:


১. "তোর কপাল খারাপ, তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার" — বলা কি শিরক?

এ ধরনের কথা গায়েবি জ্ঞান দাবি করার শামিল হতে পারে যদি তা অদৃশ্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানার অর্থে বলা হয়। কারণ গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। পবিত্র কুরআনে এসেছে:

"বলুন, আসমান ও জমিনে গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।" (সূরা আন-নামল: ৬৫)

তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোকেরা এ ধরনের কথা গালি, অভিশাপ বা হতাশা প্রকাশের জন্য বলে থাকে, গায়েব জানার দাবি করে নয়। সেক্ষেত্রে তা শিরক হয় না, বরং এটি গুনাহের কাজ হতে পারে (মিথ্যা বলা, অহেতুক অভিশাপ দেওয়া ইত্যাদি)।

আপনার শেয়ারকৃত পোস্ট: যদি পোস্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে "গায়েবি কথা বলা শিরক", আর আপনি তা শেয়ার করেছেন সঠিক আকিদা প্রচারের উদ্দেশ্যে, তাহলে আপনার কোনো গুনাহ নেই। যদি কেউ ভুল বুঝে থাকে (যেমন পোস্টের ভাষা দ্ব্যর্থবোধক ছিল), এবং আপনি তা জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে সংশোধন না করেন, তাহলে কিছুটা দায়িত্ব হতে পারে। কিন্তু সাধারণত স্বেচ্ছায় না জানালে বা না বুঝালে আপনার শিরক বা কুফরি হবে না — যতক্ষণ না আপনি নিজে ঐ ভুল বিশ্বাসে লিপ্ত হন।

ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন: শিরক ও কুফরি নির্ভর করে নিয়ত ও বিশ্বাসের ওপর, শুধু কথার ওপর নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল কুফর)

সারমর্ম: আপনার পোস্ট শেয়ার করা জায়েজ ছিল। যদি কেউ ভুল বুঝে থাকে, তবে আপনি সুযোগ পেলে সংশোধন করে দেবেন। ইচ্ছাকৃতভাবে না করালে আপনার কোনো শিরক বা কুফরি হবে না, ইনশাআল্লাহ।


২. "বিপদে পড়ে আল্লাহকে বাদ দিয়ে মা-বাবাকে গায়েবি বলে ডাকা শিরক" — এখানে 'গায়েবি' শব্দ ব্যবহার করায় বোঝাতে অসুবিধা?

না, অসুবিধা নেই। এখানে 'গায়েবি বলে ডাকা' অর্থ হলো অদৃশ্য থেকে সাহায্য চাওয়া, অর্থাৎ মা-বাবা বর্তমানে না থাকলেও তাদের ডেকে সাহায্য প্রার্থনা করা — যা শিরক। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

"আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ডাকা হয়, তারা কিছুই সৃষ্টি করে না; বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা মৃত, জীবিত নয়।" (সূরা আন-নাহল: ২০-২১)

এই বাক্যটি সঠিক ও পরিষ্কার। 'গায়েবি' শব্দটি এখানে 'অদৃশ্যে ডাকা' অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, যা শিরক বোঝাতে যথার্থ। এতে বিভ্রান্তির কিছু নেই।


৩. বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে কি শিরক আছে?

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত "আমার সোনার বাংলা" (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত) একটি দেশাত্মবোধক গান। এতে কোনো ইবাদত বা দেবদেবীর প্রশস্তি নেই। বরং দেশের প্রতি ভালোবাসা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে। এতে কোনো শিরক নেই, যতক্ষণ না কেউ একে ইবাদতের নিয়তে গায় বা গাওয়ায়।

তবে সতর্কতা: যদি কোনো অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় রুকু-সিজদা বা ইবাদতের মতো ভঙ্গি করা হয়, সেটা নাজায়েজ ও শিরকের কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু গানটির বক্তব্য শিরক নয়।


৪. গর্ভবতী মহিলাদের হাতে দিয়াশলাই দিয়ে এ বিশ্বাসে ব্যবহার করা যে এটি জিন থেকে রক্ষা করবে — তা কি শিরক?

হ্যাঁ, এটি শিরক। কারণ এখানে দিয়াশলাইকে স্বতন্ত্রভাবে ক্ষতি ও উপকারের কারণ মনে করে আল্লাহর ওপর ভরসা না করে বস্তুকে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকারী হিসেবে বিশ্বাস করা হচ্ছে। হাদিসে এসেছে:

"যে ব্যক্তি তাবিজ-কবজ ঝুলায়, সে শিরক করল।" (মুসনাদ আহমাদ: ১৭৪৪৪, সহিহ ইবনে হিব্বান)

যদি শুধু প্রতীক বা সাধারণ রীতি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং বিশ্বাস থাকে যে আল্লাহই রক্ষাকর্তা ও কারণ, তাহলে শিরক হবে না। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের কাজ সাধারণত কুসংস্কার ও তাবিজ-কবজের বিশ্বাস থেকেই হয়, যা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

রাদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে: কোনো বস্তুকে এমনভাবে ব্যবহার করা যে তা নিজ থেকে উপকার বা ক্ষতি করে — এটি শিরকে আসগার (ছোট শিরক)। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল কুফর)

সারমর্ম: দিয়াশলাই বা অন্য কোনো বস্তুকে আল্লাহর ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব গুণে রক্ষাকারী ভাবা শিরক। বরং সর্বদা বলতে হবে: "বিসমিল্লাহ, আল্লাহর নামে, তিনিই রক্ষাকর্তা।"


চূড়ান্ত ফতোয়া ও উপদেশ

  • কপাল খারাপ/ভবিষ্যৎ অন্ধকার — বলা শিরক নয়, তবে নাজায়েজ কথা ও মিথ্যা আশঙ্কা।
  • পোস্ট শেয়ার করা — আপনার জন্য দোষ নেই; কেউ ভুল বুঝলে সুযোগে সংশোধন করবেন।
  • মা-বাবাকে আল্লাহ ছেড়ে ডাকা — স্পষ্ট শিরক; 'গায়েবি' শব্দ ব্যবহার সঠিক।
  • জাতীয় সংগীত — শিরকমুক্ত, তবে ইবাদতের নিয়তে গাওয়া যাবে না।
  • দিয়াশলাই দিয়ে রক্ষার বিশ্বাস — শিরক; আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরক থেকে হেফাজত করুন এবং সঠিক আকিদা দান করুন। (আমিন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.