রাগান্বিত অবস্থায় প্রদত্ব তালাক কি গ্রহণযোগ্য হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2313
Questioner: olive Oliver
Question Asked: 04 Jul 2026, 04:05 PM
Reviewed & Published: 04 Jul 2026, 04:20 PM
Views: 102
Tokens: 71,756
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
দয়া করে মুফতি ইমদাদুল হক সাহেব যদি রুজু দিয়ে কৃতজ্ঞ করেন।

আমার স্ত্রীর সঙ্গে এক পর্যায়ে ঝগড়ার সময় আমি "এক তালাক, দুই তালাক এবং তিন তালাক" শব্দগুলো উচ্চারণ করি।
ঘটনাটি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন।
পেশাগত কারণে আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করি, মানসিক একাকীত্ব এবং কাজের অত্যন্ত কঠিন পরিবেশের কারণে আমি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে থাকি। এছাড়াও পারিবারিক বিভিন্ন চাপও আমাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবিত করে। এসব বিষয় আমার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং অতিরিক্ত রাগের সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে।

এ কারণে আমার অত্যন্ত তীব্র রাগের সমস্যা রয়েছে, যা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমি রাগে এরও আগে মাঝে মাঝে এমন কিছু করেছি যা কোন ভাবে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এর পক্ষে করা সম্ভব না আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুসারে। রাগের সময় আমি কখনো কখনো এমন কাজ করে ফেলি জিনিস পত্র ভাংচুর করা, মারামারি ইত্যাদি। যার জন্য পরে অনুতপ্ত হই এবং উপলব্ধি করি যে, স্বাভাবিক ও সুস্থ মানসিক অবস্থায় আমি এমনটি কখনোই করতাম না। এছাড়া পরে এসব বিষয় নিয়ে একা একা চিন্তা করি এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে একা একা কথাও বলে থাকি। আমি বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন (অনিয়মিত) করছি এবং পূর্বেও এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। রাগের সময় আমার মানসিক অবস্থা এমন হয় যে অন্য পক্ষ যা বলতেছে তার বিপরীতে আমার কিছু বলতেই হবে এবং জিততেই হবে সেটা লজিক্যাল হোক বা না হোক যেমন যদি বলা হয় আমাকে আমি ভালো আমার ধারণা আমি বলব যে না আমি ভালো না।

দ্বিতীয়ত, একবার আমি আমার স্ত্রীকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে "তালাক" শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম, যখন আমি জানতাম না যে শরিয়তে তালাক কীভাবে কার্যকর হয়। সে সময় আমার তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না; আমি কেবল তাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম।

আর আমার স্ত্রীর ভাষ্যমতে আমি বোধহয় বলেছিলাম যে তালাক দিয়ে দিব কিন্তু সে বলেছে তোমাকে ইচ্ছা হলে দাও। আমি বোধহয় বলেছিলাম আচ্ছা দিলাম (স্ত্রীর ভাষ্যমতে)। কিন্তু আমি ঘটনাটা পুরোপুরি মনে করতে পারছি না যেহেতু ঘটনাটি অনেকদিন আগের প্রায় ১০-১১ বছর কিন্তু মনে আছে যে এটা নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছিল এবং এর পরেই আমি এটা নিয়ে জানার চেষ্টা করি।

পরবর্তীতে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে নিজেদের ভেতর দ্বিধা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে আমি তালাকের বিধান সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি। তখন আমার মনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় যে, আমার রাগের সমস্যার কারণে কোনো এক সময় প্রবল রাগের মাথায় আমি এমন কিছু বলে ফেলতে পারি যা আমি প্রকৃতপক্ষে চাই না।

এই উদ্বেগের কারণেই আমি পূর্বে আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম যে, যেহেতু আমার রাগ অত্যন্ত বেশি, তাই আমি যদি কখনো তালাক দিই, তবে সেই তালাক কখনই কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি সে নিজে তা না চায় বা গ্রহণ করে। অর্থাৎ, তালাক বিষয়ে আমি সমস্ত কর্তৃত্ব তার হাতে দিয়েছিলাম এবং নিজের জন্য কোনো কর্তৃত্ব রাখিনি।

এটিও উল্লেখযোগ্য যে, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকে আমাদের মধ্যে ছোট ছোট পারিবারিক কলহ চলছিল। আমার মনে হতে শুরু করেছিল যে আমি ও আমার স্ত্রী একে অপরকে অপছন্দ করি এবং তার পরিবার স্বার্থপর। অন্যদিকে, সেও কয়েক দিন ধরে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছিল যা আমার জানা মতে তার স্বাভাবিক আচরণ নয়। যেমন ছোট ছোট কথা যেগুলো খুবই তুচ্ছ তার বাসায় বলা আমার সাথে তার কি কথোপো কথন হয়েছে সেগুলোও তার বাসায় বলা ইত্যাদি।এর ফলে আমার মনে হয়েছিল যে হয়তো কেউ তাকে বদ পরামর্শ দিচ্ছে অথবা কোনো অশুভ প্রভাব বা জাদুর প্রভাব থাকতে পারে; আল্লাহই সর্বাধিক অবগত। তবে এটাও সত্য যে, কয়েক দিন ধরে আমরা উভয়েই একে অপরের প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত ছিলাম এবং কষ্টদায়ক কথা বলছিলাম, যা আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্কের চিত্র নয়।

এসব ছোট ছোট তুচ্ছ কারণে আমার স্ত্রী হয়তো বা তার বাবা অথবা মাকে এ সম্পর্কে জানায় তারা আমার স্ত্রীকে নিতে আসে। এ ছোট্ট তুচ্ছ ঘটনার গুলোর প্রেক্ষিতে তার বাবা মাকে ডাকা অথবা এলাকার লোকজনকে ডাকা কোন কারণ হতে পারে না। এরপর উক্ত ঘটনার সময় আমি এবং আমার বাবা বারবার না বলা সত্ত্বেও আমার স্ত্রীর বাবা অর্থাৎ আমার শশুর এলাকার লোকজন জড়ো করতে চায় যে ব্যাপারে আমি আমার স্ত্রীকে আগেই বারবার সতর্ক করে আসছি কিন্তু তার বাবা জনসমাগম করেছিল (আল্লাহ ভালো জানেন)। এই সময় এই জনসমাগম কে কেন্দ্র করে আমার ভয়াবহ রাগ ওঠে আমার এমন মনে হতে থাকে যে আমার স্ট্রোক হতে পারে আমি ওখানে রাগে কাঁপছিলাম এবং আমার ঘাড়ের ডানপাশে ব্যথা করতে থাকে, এমতাবস্থায় কথা কাটাকাটির এক সময় আমি "এক তালাক, দুই তালাক এবং তিন তালাক" শব্দগুলো উচ্চারণ করি।

তবে এই ঘটনার আগেই আমার অন্তরের দৃঢ় নিয়ত ছিল যে, যদি পূর্বে আমার দেওয়া কর্তৃত্বের কারণে আদৌ কোনো তালাক কার্যকর বলে গণ্য হবে না, আল্লাহ ভালো জানেন। যদিও তালাক কার্যকর হওয়া বা না হওয়ার বিষয়ে আমার মনে সংশয় ছিল, তবুও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, কার্যকর হলে তা এক তালাকের বেশি হবে না যাতে আমরা ইদ্দত কালীন সময় পাব সম্ভাব্য শালা-পরামর্শ বা ফয়সালার জন্য ।আল্লাহ আমার মনের কথা ভালো জানেন।

স্ত্রীর বাবার বক্তব্য:
1.আমার স্ত্রীর বাবার ধারণা যে বিড়াল পালনে আমি আসক্ত
এখানে আরো উল্লেখ্য যে আমাদের বাড়িতে আমরা অসুস্থ বিড়াল কুকুর চিকিৎসা করার জন্য নিয়ে আসি এবং তাদের চিকিৎসা করার চেষ্টা করে থাকি এবং লালন পালন করি যাতে আমার স্ত্রীও আমাকে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু এ নিয়ে আমার স্ত্রীর বাবার ধারণা যে বিড়াল পালনে আমি আসক্ত সেই আগেও বিড়াল নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু ১০-১৫ বছর বয়সের বৃদ্ধ বিড়াল যদি আমি বাইরে ছেড়ে দেই তবে সম্ভবত কারণে তারা বাঁচতে পারবে না যা (আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন)। তাই আমি বলেছি যে এটা তার খুব বেশিদিন বাঁচবে না তো আমি আর নতুন বিড়াল কুকুর চিকিৎসা করার জন্য আনবো না আর পালন করবো না।

2.হলফনামা
• এর আগে আমাদের ঝগড়ার একপর্যায়ে আমার স্ত্রীর সাথে আমার হাতাহাতি হয়। সেবার তার পরিবার এসে তাকে নিয়ে যায়। এবং এটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হওয়ার পরে আমার বাবা ,আমার স্ত্রীর বাবার অনুরোধে বা পীড়াপীড়িতে আমাকে দশ লক্ষ টাকার হলফনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে যেখানে উল্লেখ আছে যে আমি কখনো তার গায়ে হাত তুলবো না বা যদি কখন হাত তুলি তাহলে দশ লাখ টাকা দিতে বাধ্য থাকিব।
আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে এই হলফনামা উপরে ভিত্তি করে আমার শশুর আমাকে ও আমার পরিবারকে মানসিকভাবে দমন পীড়ন করার অপচেষ্টা চেষ্টা করছে। সামান্য এই তুচ্ছ কারণে আমার শশুর শাশুড়ি তার মেয়েকে একেবারে নিয়ে যেতে চলে আসবে অথবা আমার বাবাকে শাসানো "যে আপনি লোকজন ডাকবেন তা না হলে আমি এলাকার লোকজনকে ডেকে নিয়ে আসবো আপনার বাড়িতে " অথবা আমার পরিবারকে হেয় করা ইত্যাদি।

3.আমার স্ত্রীর বাবার মতে যে আমি মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শে নেই নাই।
অথচ আমার স্ত্রী এবং তার বাবা আমাকে হলফনামা নামার সময় বলেছে যে আমার মনোবিজ্ঞানী পরামর্শ অবশ্যই নিতে হবে। যেহেতু আমার ক্রোধ বেশি এবং আমি যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছি সে ব্যাপারে আমার স্ত্রী খুব ভালোভাবে জানে। এ সম্পর্কে আমার পরিবার ও অবগত এবং মনোবিজ্ঞানী দেখানোর এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের প্রেসক্রিপশন আমার কাছে আছে।

আমার বাবার বক্তব্য:
আমি যখন দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি দিচ্ছিলাম তখন আমার বিয়াই সাহেব তড়িঘড়ি করে আমার ছেলের কাছ থেকে হলফনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয় আবার আমি সাত মাস পরে বাহিরে থাকার পর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ২-৩ মাসের জন্য দেশে আসি ঠিক সেই মুহূর্তে তারা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপ্রত্যাশিত পর্যায়ে নিয়ে যায়।
উল্লেখ্য যে আমার ছেলে যখন ক্লাস টেনে পড়ে তখনই মনে হয়েছে যে, সে খুব রাগী ছিল অল্প কথাতে রেগে যেত যার দরুন আমি এবং আমার স্ত্রী উভয় মিলে তাকে মানসিক ডাক্তার দেখান হয় তখন থেকেই তার নিয়মিত চিকিৎসা চলছিল। আমার স্ত্রী মারা গেলে তার নিয়মিত চিকিৎসা হয়নি।
এখানে বিড়াল নিয়ে আরো একটা কথা না বললেই নয় যে আমি দেখেছি আমার ছেলে যেমন বিড়াল পোষে তার স্ত্রী অর্থাৎ আমার বৌমাও বিড়াল খুব পছন্দ করে ও পোষে। বিড়ালের খাবার, ঘর পরিষ্কার জন্য তিনজন সহযোগী নিয়োগ করা আছে তা সত্ত্বেও আমার ছেলের স্ত্রী ওষুধ পত্র দেয়ার জন্য সাহায্য করে থাকে। এই ঘটনা এক পর্যায়ে আমার বিয়াই বলেন যে তার মেয়ে নাকি রাত তিনটার আগে ঘুমাতে পারে না বিড়ালের ওষুধ দেয়ার জন্য আমি এই ব্যাপারে আমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি যে বিড়াল অসুস্থ ডাক্তার সাত দিনের জন্য ওষুধ দিয়েছে ঐ ওষুধ গুলো একসাথে দেয়া যায় না দুই ঘন্টা পর পর দিতে হয় তাই যদি কোন একটি ওষুধ একটু দেরিতে দেয়া হয় তাহলে শেষ ওষুধটা দিতে দেরি করতে হয় অথচ কোনদিনই নাকি রাত তিনটা পর্যন্ত জাগিয়ে রাখা হয়নি সর্বোচ্চ রাত একটা অথচ বিয়াই বলতেছেন যে তার মেয়ে তার সাথে কথা বলার সময় পায়না ও প্রত্যেক দিন রাত তিনটা পর্যন্ত জাগে থাকে। তবে এ সত্য যে ছেলের প্রচন্ড রাগের সমস্যা আছে এবং সেদিন ঘটনাকালীন সময়ে সে রাগে কাঁপতে ছিল এবং রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে থাকার কথা শুনে সে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে রাগান্বিত হয়ে পড়ে। এবং এও সত্য যে সে মানসিক চাপে থাকে এবং মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ পূর্বেও নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এছাড়াও ছেলের হাইপারটেনশন রয়েছে।


এমতাবস্থায়, আমি সম্মানিত মুফতি সাহেবের নিকট বিনীতভাবে জানতে চাই, উপরোক্ত পরিস্থিতিতে আমি যে কথাগুলো প্রবল রাগ ও আবেগের বশে উচ্চারণ করেছি, তার কারণে কি আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে?
আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে সঠিক সমাধান ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে আমাকে উপকৃত করবেন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

উত্তর:

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আপনার দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা আমি বুঝতে পেরেছি এবং আপনার প্রতি সহানুভূতি জানাচ্ছি। আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে আমি হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দিচ্ছি।

মূল ঘটনা সংক্ষেপে: আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার সময় অত্যাধিক রাগ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে "এক তালাক, দুই তালাক এবং তিন তালাক" শব্দগুলো উচ্চারণ করেছেন। এর আগেও একবার আপনি "তালাক" শব্দটি ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করেছিলেন এবং স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী আপনি "আচ্ছা দিলাম" বলেছিলেন। এছাড়া আপনি পূর্বেই আপনার স্ত্রীকে বলে রেখেছিলেন যে, আপনার তালাকের কর্তৃত্ব তার হাতে দেওয়া আছে এবং আপনার রাগের কারণে আপনি যে তালাক দেবেন তা কার্যকর হবে না যদি না সে গ্রহণ করে।

শরীয়তের বিধান:

প্রথম অবস্থা: অত্যন্ত ক্রোধ (গাদাব) ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা: হানাফি ফিকহের একটি মূলনীতি হলো, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য ব্যক্তির ইচ্ছা (নিয়্যত) ও জ্ঞানের (শু’রু) পাশাপাশি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা থাকা আবশ্যক। যদি কোনো ব্যক্তি এতটাই রাগান্বিত হয় যে, সে তার কথার অর্থ ও ফলাফল সম্পর্কে অবহিত নয়, বরং তার উপর রাগের প্রভাব এত বেশি যে, সে স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তবে সে অবস্থায় দেওয়া তালাক কার্যকর হয় না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিন অবস্থায় কারও কাজ গণনা করা হয় না: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, পাগল যতক্ষণ না সুস্থ হয় এবং নাবালক যতক্ষণ না বালেগ হয়।" (আবু দাউদ, তিরমিযি)

হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম এ হাদিসের আলোকে বলেছেন, অত্যাধিক ক্রোধ যা ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি থেকে বঞ্চিত করে দেয়, তা পাগলামির মতো গণ্য হবে এবং সে অবস্থায় দেওয়া তালাক কার্যকর হবে না। (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৮৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৫)

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • আপনি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপে রয়েছেন।
  • আপনার অত্যন্ত তীব্র রাগের সমস্যা রয়েছে, যা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
  • রাগের সময় আপনি জিনিসপত্র ভাংচুর, মারামারি, অনিয়ন্ত্রিতভাবে কথা বলা ইত্যাদি করে থাকেন।
  • ঘটনার সময় আপনি এতটাই রাগান্বিত ছিলেন যে, আপনি কাঁপছিলেন, ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছিল এবং আপনার মনে হচ্ছিল যে স্ট্রোক হতে পারে।
  • আপনি চিকিৎসকের পরামর্শে রয়েছেন এবং আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নিশ্চিত।

এসব কারণে আপনার সেই সময়ের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না এবং আপনি উক্ত তীব্র রাগের অবস্থায় "এক তালাক, দুই তালাক ও তিন তালাক" বললেও তা শরীয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর হবে না। তাই আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

দ্বিতীয় অবস্থা: পূর্বের তালাক (১০-১১ বছর আগের): আপনি একবার ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে "তালাক" শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, তখন আপনার কোনো ইচ্ছা ছিল না। এছাড়া স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী আপনি "আচ্ছা দিলাম" বলেছিলেন কিন্তু আপনি পুরোপুরি মনে করতে পারছেন না।

  • ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে "তালাক" বলা: যদি কোনো ব্যক্তি স্ত্রীকে ভয় দেখানোর জন্য বা তালাক দেওয়ার ইচ্ছা ছাড়া শুধু "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে, তবে হানাফি মতে তা কার্যকর হয়। কারণ "তালাক" স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ, যা উচ্চারণ করলে নিয়ত নির্বিশেষে তালাক পতিত হয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৭; আল-হিদায়া, ২/২৩৪) তবে, আপনি যদি সেদিন তালাক দেওয়ার ইচ্ছা না রেখে শুধু ভয় দেখান, তবুও শরীয়তে তা একটি তালাক হিসেবেই গণ্য হবে।

  • "আচ্ছা দিলাম" বলা: আপনার স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী আপনি এটি বলেছিলেন। হানাফি ফিকহে, "আমি তালাক দিলাম" বা "আচ্ছা দিলাম" স্পষ্ট শব্দ (সরীহ) নয়, বরং কিনায়া (অস্পষ্ট) শব্দ। কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক কার্যকর হতে হলে নিয়ত (ইচ্ছা) প্রয়োজন। যেহেতু আপনি সেই সময় তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না এবং এটি নিয়ে আপনার মনে সন্দেহ রয়েছে, তাই এই "আচ্ছা দিলাম" কথাটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০; ফাতাওয়া মুফতি মাহমুদ, ৫/২৩৪)

  • সন্দেহের নিয়ম: যেহেতু এ ঘটনা ১০-১১ বছর আগের এবং আপনি এটি পুরোপুরি মনে করতে পারছেন না, তাই সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, তালাক পতিত হয়নি ধরা হবে। (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, পৃ. ৬১)

সুতরাং, ১০-১১ বছর আগের ঐ ঘটনার কারণেও কোনো তালাক পতিত হয়নি। তবে, ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে "তালাক" বলা একটি তালাক পতিত হয়েছে বলে ধরে নিলেও, তা আপনার বর্তমান রাগের ঘটনার সাথে একত্রিত করে দেখা হবে না।

তৃতীয় অবস্থা: তালাকের কর্তৃত্ব স্ত্রীর হাতে দেওয়া: আপনি বলেছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রীকে বলে রেখেছিলেন যে, আপনি যে তালাক দেবেন তা কার্যকর হবে না যদি না সে নিজে গ্রহণ করে। হানাফি ফিকহে এ ধরনের বক্তব্য তালাকের তাফউইজ (ক্ষমতা অর্পণ) হিসেবে গণ্য হয়। এর অর্থ হলো, আপনি তালাক দেওয়ার ক্ষমতা আপনার স্ত্রীকে দিয়েছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনি নিজে তালাক দিলে তা কার্যকর হবে না। বরং আপনি যদি স্পষ্ট শব্দে তালাক দেন, তাহলে তা কার্যকর হবে। আপনি যে রাগের বশে স্বাভাবিক অবস্থায় না থেকে তালাক দিয়েছেন, সেই দিকটাই এখানে বিবেচ্য। তাই কর্তৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি আপনার বর্তমান ঘটনায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৩০৫; আল-হিদায়া, ২/৩৬০)

সারসংক্ষেপ ও দিকনির্দেশনা:

  1. আপনার বর্তমান ঘটনাটি (এক, দুই ও তিন তালাক বলা) অত্যাধিক ক্রোধ ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ অটুট রয়েছে। আপনার রাগান্বিত হওয়ার বিষয়টাকে যদি আপনার স্ত্রী সমর্থন না করে, তাহলে আপনার মসজিদের ইমাম সাহেবকে সাথে নিয়ে বিজ্ঞ স্থানীয় পর্যায়ের কোনো মুফতির স্বরণাপন্ন হবেন। মুফতি সাহেব আপনার বাড়ীতে গিয়ে আশপাশের লোকদেরকে জড়ো করে যাচাই বাচাই পূর্বক সিদ্ধান্ত দিবেন। রাগের তিন অবস্থায় মধ্যে সর্বোচ্ছ পর্যায়ের রাগের ক্ষেত্রে তালাক হয় না। মধ্যম বা নিম্ন পর্যায়ের রাগের ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়।

  2. ১০-১১ বছর আগের ঘটনায় ভয় দেখানোর জন্য "তালাক" বলায় একটি তালাক পতিত হলেও, বর্তমানে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং আপনার বিবাহ বহাল আছে। অতএব, আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হালাল এবং বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট।

পরামর্শ:

  • সতর্কতা: যেহেতু আপনার রাগের সমস্যা রয়েছে, তাই ভবিষ্যতে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, রাগের সময় স্বাভাবিক অবস্থা না থাকলেও, অনেক সময় রাগ কমে গেলে তালাক কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • চিকিৎসা: আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা নিয়মিত ও গুরুত্ব সহকারে চালিয়ে যান। মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন। এটি আপনার ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবনের জন্যই কল্যাণকর।
  • পারিবারিক সম্পর্ক: আপনার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির সাথে দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা করুন। আলোচনার মাধ্যমে এবং পরিবারের প্রবীণ ও বিজ্ঞজনের সাহায্য নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।
  • শুকরিয়া: আপনি আপনার স্ত্রীকে বলেছিলেন যে তালাকের কর্তৃত্ব তার হাতে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ ছিল। তবে এখন থেকে আপনি নিজেও বিষয়টি মাথায় রাখবেন এবং রাগের মুহূর্তে কোনো অবস্থাতেই তালাকের শব্দ বলবেন না।

উপসংহার: আপনার বর্ণিত সকল পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে, হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহের আলোকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়নি। আল্লাহ তায়ালাই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই প্রকৃত সাহায্যকারী।

আপনার রাগান্বিত হওয়ার বিষয়টাকে যদি আপনার স্ত্রী সমর্থন না করে, তাহলে আপনার মসজিদের ইমাম সাহেবকে সাথে নিয়ে বিজ্ঞ স্থানীয় পর্যায়ের কোনো মুফতির স্বরণাপন্ন হবেন। মুফতি সাহেব আপনার বাড়ীতে গিয়ে আশপাশের লোকদেরকে জড়ো করে যাচাই বাচাই পূর্বক সিদ্ধান্ত দিবেন। রাগের তিন অবস্থায় মধ্যে সর্বোচ্ছ পর্যায়ের রাগের ক্ষেত্রে তালাক হয় না। মধ্যম বা নিম্ন পর্যায়ের রাগের ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.