শুধু মেয়ে কাজিনরা মিলে বিয়ের আগের দিন আনন্দ করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (বাংলায়)
শুধু মেয়ে কাজিনরা মিলে বিয়ের আগের দিন আনন্দ করা বা মেহেন্দি/হলুদের অনুষ্ঠান করা, ইসলামী বিধান অনুযায়ী জায়েয কি না, তা নির্ভর করে উক্ত অনুষ্ঠানে কী কী কাজ করা হচ্ছে তার উপর। সাধারণভাবে, যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো মানা হয়, তাহলে মহিলাদের পৃথকভাবে আনন্দ উদযাপন করা জায়েয:
- পর্দার সাথে – অনুষ্ঠানে কেবল মহিলা কাজিন ও অন্যান্য মাহরাম নারী থাকবেন। কোনো অমাহরাম পুরুষ সেখানে প্রবেশ করবেন না।
- হারাম কাজ থেকে বিরত – গান-বাজনা (বাদ্যযন্ত্র ও হারাম গান), অশ্লীল নাচ, গীবত, পরনিন্দা, অশ্লীল কথাবার্তা ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। তবে দফ বাজানো (এক পাশবিহীন ঢোল) এবং বৈধ ইসলামী গজল বা হামদ-নাত পড়া জায়েয, কিন্তু তাও বিয়ে উপলক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (যেমন বিয়ের অনুষ্ঠানে) সীমিত রাখা উচিত।
- অপচয় না করা – বিলাসিতা ও অপচয় (ইসরাফ) থেকে বাঁচতে হবে। ইসলাম অপচয়কে নিষেধ করে (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৬-২৭)।
- বিদ‘আত ও রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা – কোনো প্রকার ইসলামবিরোধী কুসংস্কার বা অমুসলিমদের অনুকরণ (যেমন দোতলা মেহেন্দি, নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান) করা যাবে না।
যদি এসব শর্ত রক্ষা করা সম্ভব হয়, তাহলে মেয়ে কাজিনদের মিলনে বিয়ের আগের দিন আনন্দ করা জায়েয। তবে যদি অনুষ্ঠানে হারাম বাদ্যযন্ত্র, গান-বাজনা, বা পর্দাহীনতা থাকে, তাহলে তা সম্পূর্ণ হারাম।
হানাফি ফিকহের কিছু মূলনীতি
১. মহিলাদের পৃথক জমায়েত – হানাফি ফিকহে মহিলাদের নিজেদের মধ্যে জমায়েত হওয়া জায়েয, যতক্ষণ না তাতে শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো কাজ থাকে। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ৫/৩৫৮; রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
২. দফ বাজানোর অনুমতি – বিয়ে উপলক্ষে মহিলাদের দফ বাজানোর অনুমতি হাদিসে রয়েছে (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫১৪৮)। তবে বিয়ের আগের দিন বা মেহেন্দি অনুষ্ঠানে দফ বাজানো সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের মতভেদ আছে। অধিকাংশ হানাফি ফকীহ মনে করেন, শুধু বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের সময় দফ জায়েয, আগে-পরে নয়। (আহসানুল ফাতাওয়া, ৫/৪৯৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৮০)
৩. হারাম বাদ্যযন্ত্র – বাদ্যযন্ত্র (যেমন হারমোনিয়াম, ড্রামস, গিটার) ব্যবহার করা যেকোনো অবস্থায় হারাম, তা বিয়ের আগে হোক বা পরে। (কিতাবুল মাসাইল, ২/৩০৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫০৪)
৪. মেহেন্দি অনুষ্ঠানের বিধান – মেহেন্দি লাগানো নিজে জায়েয, তবে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিকতা ইসলামে নেই। যদি তাতে অপচয়, গান-বাজনা বা পর্দাহীনতা থাকে, তাহলে তা বর্জন করা উচিত। (বাহিশতী জেওর, অধ্যায়: বিবাহ)
ফাতাওয়া ও উলামাদের বক্তব্য
- মুফতি মুহাম্মদ শফি সাহেব (রহ.) বলেছেন: “মহিলাদের পৃথক মেহেন্দি অনুষ্ঠানে যদি গান-বাজনা ও নাচ না থাকে, বরং শুধু ভালো আলোচনা ও ইসলামী গজল হয়, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাতে হারাম গান-বাজনা হয়, তাই তা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।” (আপনার মাসায়েল, পৃষ্ঠা ৮৫)
- মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানবী (রহ.) বলেছেন: “আজকাল মেহেন্দি অনুষ্ঠানে গান-বাজনা ও অশ্লীল নাচের প্রচলন হয়েছে, যা সম্পূর্ণ হারাম। তাই এ জাতীয় অনুষ্ঠান পরিহার করা কর্তব্য।” (আহসানুল ফাতাওয়া, ৫/৪৯৫)
- মুফতি তাকি উসমানী সাহেব (দা.বা.) বলেছেন: “বিয়ের আগের দিন শুধু মহিলাদের জমায়েতে যদি কোনো প্রকার শরিয়ত বিরোধী কাজ না হয়, তবে তা বৈধ। কিন্তু বর্তমান সমাজে অধিকাংশ এই অনুষ্ঠানই হারাম গান-বাজনা ও পাপপূর্ণ কার্যকলাপে পরিণত হয়েছে, তাই সতর্কতা আবশ্যক।” (ইসলাহী খুতুবাত, ৬/২৫৪)
সারসংক্ষেপ
| শর্ত | অনুমতি | |------|--------| | কেবল মাহরাম নারী উপস্থিত | ✔️ জায়েয | | হারাম বাদ্যযন্ত্র ও গান নেই | ✔️ জায়েয | | অশ্লীলতা, নাচ, গীবত নেই | ✔️ জায়েয | | অপচয় ও অনৈসলামিক রীতি নেই | ✔️ জায়েয | | উপরোক্ত কোনো শর্ত লঙ্ঘিত | ❌ হারাম |
নির্দেশনা
যেহেতু প্রশ্নে শুধু মেয়ে কাজিনদের জমায়েতের কথা বলা হয়েছে, তাই পর্দার সমস্যা নেই। কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে যে অনুষ্ঠানটি যেন কোনো হারাম কাজে পরিণত না হয়। বেশি ভালো হয় যদি বিয়ে উপলক্ষে আনন্দ সরল রাখা হয় এবং হারাম-মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। কিছু সংখ্যক ইসলামী গজল, কোরআন তিলাওয়াত, মর্যাদাপূর্ণ আলোচনা, ও মেহেন্দি লাগানো জায়েয আছে, তবে অতি উৎসাহে পাপে লিপ্ত না হওয়া জরুরি।
সুতরাং, যদি উপরোক্ত শর্তগুলো মানা হয়, তাহলে শুধু মেয়ে কাজিনরা মিলে বিয়ের আগের দিন আনন্দ করা যাবে। অন্যথায় নিষেধ।