মূলধন অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেওয়ার শর্তে মুদরাবা ব্যবসা কি জায়েজ?
Business and Job · Hanafi
Question
সম্মানিত মুফতি সাহেবের কাছে একটি ব্যবসায়িক বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানতে চাই।
আমার একটি চলমান ব্যবসা রয়েছে। একজন ব্যক্তি এতে **১০ লক্ষ টাকা** বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
আমাদের প্রস্তাবিত চুক্তি হলো:
* তিনি ১০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করবেন।
* প্রতি মাসে ব্যবসার **প্রকৃত লাভ বা ক্ষতির ১০%** তিনি বহন করবেন (অর্থাৎ লাভ হলে ১০% পাবেন, ক্ষতি হলে ১০% বহন করবেন)।
* **১ বছর পর** তার বিনিয়োগকৃত **১০ লক্ষ টাকা সম্পূর্ণ ফেরত** দেওয়া হবে।
আমার প্রশ্নগুলো হলো:
১. এই ধরনের চুক্তি শরীয়তসম্মত ও হালাল হবে কি?
২. এক বছর শেষে মূলধন ফেরত দেওয়ার এই শর্ত রাখা কি বৈধ?
৩. যদি ব্যবসায় ক্ষতি হয়, তাহলে মূলধন সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার শর্ত রাখা কি জায়েজ?
৪. এই চুক্তিকে শরীয়তসম্মত করার জন্য কীভাবে লিখিত চুক্তি করা উচিত?
কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে দলিলসহ উত্তর দিলে উপকৃত হব, ইনশাআল্লাহ।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত চুক্তিটি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। নিম্নে এর কারণ ও শরীয়তসম্মত বিকল্প উল্লেখ করা হলো।
১. প্রস্তাবিত চুক্তির শরয়ী বিশ্লেষণ
আপনার প্রস্তাবিত চুক্তিটি মূলত মুদারাবা বা মুশারাকা (অংশীদারি ব্যবসা) এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিন্তু এতে দুটি গুরুতর সমস্যা রয়েছে:
ক) মূলধন ফেরতের শর্ত (১ বছর পর সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত)
মুদারাবা বা মুশারাকায় বিনিয়োগকারীর মূলধন ব্যবসার ঝুঁকির সাথে জড়িত থাকে। ব্যবসায় লোকসান হলে তা বিনিয়োগকারীর মূলধন থেকে পুষিয়ে নেওয়া হয়। মূলধন সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার শর্ত রাখা সুদ (রেবা) এর শামিল, কারণ এটি বিনিয়োগকারীকে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই লাভের অংশ দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
হাদীসে এসেছে:
الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ
"লাভ (উপার্জন) ঝুঁকির ভিত্তিতে হয়।" (আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫০৮; তিরমিযী, হাদীস: ১২৮৫)
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি লোকসানের ঝুঁকি বহন করেনি, সে লাভের অধিকারী হবে না। আপনার চুক্তিতে বিনিয়োগকারী মূলধন ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা রাখছেন, অথচ ব্যবসায় লোকসান হলে তাঁর মূলধন কমানো উচিত। এটি সুদ (রেবা) এর সদৃশ।
খ) লাভ-লোকসানের শতকরা হার নির্ধারণ
প্রতি মাসে প্রকৃত লাভের ১০% দেওয়া বা লোকসানের ১০% বহন করা শরীয়তসম্মত হতে পারে, তবে তা অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবসায়িক হিসাব (যেমন বার্ষিক বা অর্ধবার্ষিক) শেষে করতে হবে, মাসিক নয়। কারণ মাসিক লাভ-লোকসান অস্থায়ী; ব্যবসায় পণ্য বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত লাভ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তবে এই সমস্যা সমাধানযোগ্য; মূল সমস্যা হলো মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা।
২. এক বছর পর মূলধন ফেরত দেওয়ার শর্ত
এই শর্ত জায়েজ নয়। কারণ এটি বিনিয়োগকারীকে সুদি ঋণ এর মতো করে। বাস্তবে যদি ব্যবসায় লোকসান হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীর মূলধনের কিছু অংশ কমে যাবে। তা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়া মানে লোকসানের অংশ অন্য পক্ষকে (আপনাকে) বহন করতে হবে, যা জুলম (অন্যায়) এবং সুদের অন্তর্ভুক্ত।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
এখানে সুদ শুধু নির্দিষ্ট হারে লাভ নয়, বরং কোনো বিনিময় ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাও সুদ। মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া এমন একটি অতিরিক্ত সুবিধা, যা বিনিয়োগকারীকে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে, তাই তা হারাম।
৩. ক্ষতি হলেও মূলধন ফেরতের শর্ত
এটিও অবৈধ। ইসলামী অংশীদারিতে লোকসান বণ্টন হয় মূলধনের অনুপাতে। আপনি যদি বিনিয়োগকারীকে তার পুরো মূলধন ফেরত দেওয়ার শর্ত রাখেন, তাহলে তা তার জন্য লোকসানের ঝুঁকি শূন্য করে দেয়। অথচ ইসলামী অর্থনীতিতে বলা হয়েছে:
الغُنْمُ بِالْغُرْمِ
"লাভ তার প্রাপ্য, যে ঝুঁকি বহন করে।" (ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২২০৫)
সুতরাং, এই শর্ত হারাম।
৪. শরীয়তসম্মত বিকল্প চুক্তি
আপনার ব্যবসাকে শরীয়তসম্মত করতে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
ক) মুদারাবা (باب المضاربة)
- বিনিয়োগকারী (রব্বুল মাল) ১০ লক্ষ টাকা দেবেন।
- আপনি (মুদারিব) ব্যবসা পরিচালনা করবেন।
- লাভের একটি নির্দিষ্ট শতকরা হার (যেমন ৪০% বিনিয়োগকারীর, ৬০% আপনার) পূর্বেই নির্ধারণ করে নিতে হবে। লোকসান হলে তা শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীর মূলধন থেকে পুষিয়ে নেওয়া হবে; আপনার (মুদারিব) কোনো ক্ষতি হবে না, তবে আপনি কোনো পারিশ্রমিক পাবেন না (শ্রম বিফলে যাবে)।
শর্ত:
- লাভের হার নির্দিষ্ট করতে হবে (যেমন ৪০:৬০)।
- মূলধন ফেরতের কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না।
- লাভ বণ্টন হবে ব্যবসার প্রকৃত হিসাব শেষে (মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বাৎসরিক)।
খ) মুশারাকা (مشاركة)
- আপনি ও বিনিয়োগকারী উভয়ে মিলে ব্যবসায় মূলধন দেবেন।
- লাভ-লোকসান বণ্টন হবে মূলধনের অনুপাতে (যেমন ৫০:৫০) অথবা লাভের ক্ষেত্রে ভিন্ন অনুপাত চুক্তি করা যেতে পারে (কিন্তু লোকসান সর্বদা মূলধনের অনুপাতে হবে)।
- এখানেও মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না।
নমুনা লিখিত চুক্তি (মুদারাবার জন্য):
আমরা, [আপনার নাম] (মুদারিব) ও [বিনিয়োগকারীর নাম] (রব্বুল মাল) এই মর্মে চুক্তি করছি যে,
১. রব্বুল মাল ব্যবসায় ১০,০০,০০০/- (দশ লক্ষ) টাকা বিনিয়োগ করবেন।
২. মুদারিব ব্যবসা পরিচালনা করবেন।
৩. ব্যবসার প্রকৃত নীট লাভের ৪০% রব্বুল মাল এবং ৬০% মুদারিব পাবেন।
৪. ব্যবসায় কোনো লোকসান হলে তা শুধুমাত্র রব্বুল মালের বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে পুষিয়ে নেওয়া হবে; মুদারিবের কোনো আর্থিক দায়িত্ব নেই।
৫. মূলধন ফেরত দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে না; তবে চুক্তি শেষে (যেমন ১ বছর পর) মূলধন ফেরত দেওয়া হবে, তবে তা লোকসান বাদ দিয়ে (অর্থাৎ মূলধনের প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী)।
৬. এই চুক্তি শরীয়াহ সম্মত এবং কোনো সুদ বা প্রতারণামুক্ত।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. আপনার চুক্তি হারাম, কারণ এতে মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যা সুদের শামিল।
২. এক বছর পর সম্পূর্ণ মূলধন ফেরতের শর্ত বৈধ নয়।
৩. ক্ষতি হলেও মূলধন সম্পূর্ণ ফেরতের শর্ত জায়েজ নয়।
৪. শরীয়তসম্মত করতে মুদারাবা বা মুশারাকা চুক্তি করুন, যেখানে লাভ-লোকসান বণ্টনের নিয়ম সঠিকভাবে উল্লেখ থাকবে এবং কোনো প্রকার মূলধন গ্যারান্টি থাকবে না।
দলিল:
- সূরা আল-বাকারা (২:২৭৫) - সুদ হারাম।
- হাদীস: "লাভ ঝুঁকির ভিত্তিতে হয়" (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
- ইবনে আবেদীন, রদ্দুল মুহতার (৫/১৬৪) - মুদারাবায় মূলধন গ্যারান্টি নাজায়েজ।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫০) - শর্তযুক্ত মুদারাবা নাজায়েজ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।