জামাতে নামাজ পড়া ছেড়ে দেয়,এমন পাত্রকে বিয়ের বিষয়ে পরামর্শ চাই
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১.তিনি বলেছেন উনাদের বিশাল স্যানিটেশনের পাইকারি দোকান আছে।যে কারনে একসাথে সবাই জামাতে যাওয়া সম্ভব হয় না।একজন যুহরে গেলে আরেকজন কে আসরে যেতে হয়।তাই দিনে ২ ওয়াক্ত মত নামাজ জামাত তরক হয়।পরে সম্ভবত নিজে আদায় করে নেন যেহেতু বললেন কাযা তেমন হয়না।আমার প্রশ্ন,উনার যে কারন এই কারনে জামাত তরক করা কি জায়েজ আছে?
২.উনি কোন মাজহাব ফলো করেন এই প্রশ্ন করায় বললেন রাবি স্ট্রং কিনা সেটা দেখেন দেখে সহিহ যেটা মনে হয় সেটাই আমল করেন।কথা বলে যা বুঝলাম উনি স্ট্রংলি হানাফি ফলো করে না।সব মাজহাব থেকেই মাসয়ালা নেন।উনি দাখিল পাস।কিন্তু আমার জানামতে সব মাজহাব থেকে মাসয়ালা নিতে হলে তাকে সেই পরিমান ইলম থাকতে হবে।এই বিষয় টা আমি উনাকে বলি উনি ও হুম হুম করেন।পরে আমি জানাই যে আমি স্ট্রংলি হানাফি ই ফলো করি আলহামদুলিল্লাহ।তখন উনি বলেন আমরা ত মুসলিম,এক নবির ই উম্মত।এটা কোনো বিষয় না।আসলেই কি এটা তেমন বিষয় না?এই বিষয় মেনে নিয়েই কি এই প্রস্তাবে আগানো যাবে?
দুইটা প্রশ্ন মিলে এই প্রস্তাবে কি আমার আগানো উচিত হবে?আমার পরিবারে এরকম দ্বীনের বিষয় ভালো জানা বা ওইরকম প্রাকটিসিং কেউ নাই।তাই বিষয় গুলা নিয়ে আমার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।উস্তাজগন যদি আমাকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিতেন আমার জন্য উপকার হত।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার দ্বীনি উদ্বেগ ও বিয়ের বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি যে দুটি বিষয় তুলে ধরেছেন, সেগুলো শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে আমরা প্রতিটি বিষয়ে দলিল-প্রমাণ ও হানাফি ফিকহের আলোকে পরামর্শ পেশ করছি।
১. জামাত তরক করার কারণ ও শরয়ী বিধান
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মতানুসারে পুরুষদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা ওয়াজিব (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৫৪; আল-হিদায়া, ১/১১৪)। তবে কিছু শারঈ ওজর (অজুহাত) থাকলে জামাত তরক করা জায়েয হতে পারে, যেমন:
- প্রবল বৃষ্টি বা ঝড়
- ভীষণ অন্ধকার
- অসুস্থতা
- প্রাণ বা সম্পদের গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা
- এমন কাজে লিপ্ত থাকা যা ছেড়ে দিলে গুরুতর ক্ষতি হয় (যেমন: সময়মতো চিকিৎসা না করানো, অত্যাবশ্যকীয় পেশাগত দায়িত্ব পালন)
প্রশ্নে উল্লেখিত প্রসঙ্গ:
পাত্রের দোকানটি যদি বিশাল পাইকারি ব্যবসা এবং এমন হয় যে একই সাথে সব কর্মী বের হয়ে গেলে সম্পূর্ণ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় কিংবা বড় ক্ষতি হয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি এক প্রকার অবশ্যম্ভাবী ওজর হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে তারা যেন অন্ততপক্ষে এক ওয়াক্তের জামাত (যুহর বা আসর) সবার সম্মিলিতভাবে আদায়ের চেষ্টা করে। আর বাকি ওয়াক্তগুলো ব্যক্তিগতভাবে মসজিদে অথবা নিজেরা আলাদাভাবে জামাত করে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা উচিত।
উনি বলেছেন "কাযা তেমন হয় না" — এর অর্থ, তিনি জামাত ছুটে গেলেও পরবর্তীতে একাকী সময়মতো নামাজ আদায় করেন। এটি জামাত তরকের অপরাধ কিছুটা লাঘব করে, তবে পূর্ণ জামাত আদায়ের ওয়াজিব আদায় হয় না।
পরামর্শ:
- আপনি যদি চান, তবে পাত্রকে বিনীতভাবে বলতে পারেন যে, জামাতের গুরুত্ব কত বড় এবং সম্ভব হলে দোকানের সময়সূচী এমনভাবে সাজান যাতে পাঁচ ওয়াক্তের জামাত সম্ভব হয় (যেমন: শিফটের পুনর্বিন্যাস)।
- যদি উনি জামাতকে গুরুত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে এটি দ্বীনি মূল্যবোধের একটি বড় ব্যবধান নির্দেশ করে, যা ভবিষ্যতে দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
২. মাজহাব অনুসরণের বিষয়
আপনি সঠিকই বলেছেন—সকল মাজহাব থেকে বিনা ইলমে মাসয়ালা নেওয়া সাধারণ মুসলিমের জন্য দুরূহ ও বিপজ্জনক। এতে তালফিক (বিভিন্ন মাজহাবের হালকা দিক জোড়া লাগানো) ও ইখতিলাফে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হানাফি মাজহাবের উসূলবিদরা স্পষ্ট বলেছেন:
"العامي يجب عليه التقليد، ولا يجوز له أن يتبع من شاء من المجتهدين بغير ضابط"
“সাধারণ মুসলিমের জন্য তাকলীদ (একটি মাজহাব অনুসরণ) ওয়াজিব; ইচ্ছামত মুজতাহিদদের অনুসরণ করা জায়েয নয়।”
(উসূলুশশাশী, ১/৩৪৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২০৪)
ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
"لا يجوز للعامي أن يختار من المذاهب ما تهواه نفسه"
“সাধারণ ব্যক্তির জন্য নিজের মনমতো মাজহাব থেকে মাসয়ালা নেওয়া জায়েয নয়।”
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৯)
পাত্রের কথা—"আমি রাবি স্ট্রং কিনা দেখি, তারপর সহীহ মনে হয় তাই করি"—এটি একটি ভুল ধারণা। সহীহ বুঝার জন্য আরবি ভাষা, কুরআন-হাদীসের গভীর জ্ঞান, ইজমা-কিয়াসের পদ্ধতি প্রভৃতি অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। অর্ধেক জ্ঞান নিয়ে ‘সহীহ’ যাচাই করা একটি বড় ফিতনার দরজা খুলে দেয়।
আপনার করণীয়:
- আপনি যখন তাকে বলেছেন আপনি স্ট্রংলি হানাফি, তখন তিনি বলেন “আমরা তো মুসলিম, এক নবীর উম্মত”— এটি পাত্রের পক্ষ থেকে মাজহাবের গুরুত্ব না বোঝার ইঙ্গিত।
- দ্বীনি জীবনে সামঞ্জস্যের জন্য স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একই মাজহাব বা অন্তত মাজহাবের প্রতি সম্মান ও তাকলীদের মূলনীতি বোঝা জরুরি। অন্যথায় পরবর্তীতে পরিবারে ইবাদত-বন্দেগী, লেনদেন, বিবাহ-তালাক, ইত্যাদি ক্ষেত্রে মতানৈক্য তৈরি হতে পারে।
৩. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ
উপরোক্ত দুটি বিষয় একত্রে বিবেচনা করে আপনি নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
ক. স্বচ্ছ আলোচনা:
পাত্রের সাথে দ্বীনি বিষয়ে খোলামেলা ও শিষ্টাচারপূর্ণ আলোচনা করুন। তাকে বোঝান:
- জামাতের ফজিলত ও গুরুত্ব (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৫৫২)
- মাজহাব অনুসরণ কেন প্রয়োজন—বিশেষ করে সাধারণ মুসলিমের জন্য (তাকলীদ ব্যতীত দ্বীন বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা)
খ. তার দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই:
- তিনি যদি জামাত ও মাজহাবের ব্যাপারে নমনীয় ও সংশোধনপ্রবণ হন, তবে আশার আলো আছে।
- যদি তিনি ‘হুম হুম’ করে কথা এড়িয়ে যান এবং নিজের অবস্থানেই অটল থাকেন, তাহলে সতর্ক থাকুন।
গ. পরিবারে দ্বীনি পরিবেশের গুরুত্ব:
যেহেতু আপনার পরিবারে দ্বীনি জ্ঞান ও আমল কম, তাই আপনাকে একজন দ্বীনদার ও মাজহাবের অনুসারী স্বামী বেছে নেওয়া আরও বেশি জরুরি। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেন:
"الدين كله حسن الخلق، وأوله اختيار الزوج الصالح للابنة"
“সমগ্র দ্বীন সচ্চরিত্রের নাম; আর মেয়ের জন্য ভালো স্বামী নির্বাচনই তার শুরু।”
ঘ. ইস্তিখারা করুন:
সবকিছুর পর আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা (নিয়ত করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নির্দিষ্ট দো‘আ পাঠ) করে নিন। যেখানে অন্তরের প্রশান্তি ও ইতিবাচকতা অনুভব করবেন, সেই পথই গ্রহণ করা কর্তব্য।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. জামাত তরক করা: যদি উক্ত ওজর সত্যিই অবশ্যম্ভাবী হয় তবে ছাড় দেওয়া যেতে পারে, তবে পাত্রের উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা পাঁচ ওয়াক্তই জামাতে আদায়ের। আপনার উচিত এ বিষয়ে তাকে গুরুত্ব সহকারে বলা।
২. মাজহাব না মানা: এটি একটি বড় দ্বীনি সমস্যা। সাধারণ মানুষের জন্য যেকোনো মাজহাব থেকে ইচ্ছামত মাসয়ালা নেওয়া জায়েয নয়। পাত্র যদি এই বিষয়ে না মানেন এবং আপনার কঠোর হানাফি মাযহাবের প্রতি আস্থা রাখতে অসম্মতি দেন, তাহলে এই প্রস্তাবে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ।
চূড়ান্ত পরামর্শ:
পাত্রের সাথে দ্বিতীয়বার দেখা করে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করুন। যদি তিনি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেন এবং আমলে আন্তরিক হন, তবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যেতে পারেন। আর যদি তিনি অনড় থাকেন এবং জামাত-মাজহাবের গুরুত্ব বোঝার ইচ্ছা না রাখেন, তাহলে এই সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করাই আপনার ও আপনার ভবিষ্যতের জন্য অধিক নিরাপদ।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।