স্ত্রীর সাথে তর্কের সময় রাগে বলা "উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে" ইত্যাদি উক্তি কি তালাক গণ্য হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
স্ত্রীর সঙ্গে প্রচণ্ড পরিমাণে তর্ক বিতর্ক হচ্ছিলো , স্ত্রী এত বাজে কথা বলছে মাথা গরম করে দিচ্ছিল। তাই আমি রেগে বলেছি ,
***(মনে কেনায়া বা তালাক সংক্রান্ত কথার ভাবনা ছিল)
***তুমি এই ভাবে আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছ, মাথা গরম করে দিচ্ছ এর জন্যই আমার মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা বেরিয়ে জাই । ( এর আগে একবার তালাক সংক্রান্ত সমস্যা হয়েছিল । তাই বোঝানোর জন্য বলেছি )
***এইভাবে রাগলে মাথা গরম করে দিলে মুখ দিয়ে খারাপ বা উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে।
হুজুর তালাক বা শর্ত তালাক হবে?? হুজুর একটু ভালো করে দেখে আমাকে নিশ্চিন্ত করুন ।
Answer
উত্তর: শর্ত তালাক বা তালাক কিছুই হয়নি
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি ও উক্তিগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি:
১. আপনি যা বলেছেন তা তালাকের স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ নয়
তালাকের সরীহ শব্দ হলো যেমন: "তুমি তালাক", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম", "তুমি মাকতূবা" ইত্যাদি। আপনার বক্তব্যে এর কোনোটিই নেই। বরং আপনি বলেছেন:
- "তুমি আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছ, এর জন্যই আমার মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা বেরিয়ে যায়।"
- "এইভাবে রাগিয়ে দিলে মুখ দিয়ে খারাপ বা উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে।"
এগুলো কিনায়া (অপ্রকাশ্য/ইঙ্গিতবোধক) শব্দ। হানাফী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক সংঘটিত হতে হলে নির্দিষ্টভাবে তালাকের নিয়ত থাকতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২)
২. আপনার নিয়ত কী ছিল?
আপনি নিজেই বলেছেন:
- "মনে কেনায়া বা তালাক সংক্রান্ত কথার ভাবনা ছিল" – কিন্তু এটি শুধু চিন্তা বা ভাবনা, তা তালাকের নিয়ত নয়।
- আরও বলেছেন: "এর আগে একবার তালাক সংক্রান্ত সমস্যা হয়েছিল, তাই বোঝানোর জন্য বলেছি।" – অর্থাৎ আপনার উদ্দেশ্য ছিল স্ত্রীকে বোঝানো, তালাক দেওয়া নয়।
হানাফী ফিকহে কিনায়া শব্দের জন্য তালাকের স্পষ্ট ও দৃঢ় নিয়ত (নিয়্যাতুল জাযম) প্রয়োজন। নিছক চিন্তা বা সম্ভাবনা যথেষ্ট নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২২৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪০৮)
৩. শর্ত তালাক (Conditional Talaq) হয়নি
শর্ত তালাক হলে বক্তব্যে একটি শর্ত ও তার ফলাফল স্পষ্ট থাকতে হবে, যেমন: "যদি তুমি আমাকে রাগাও, তবে তুমি তালাক।" আপনার বক্তব্যে এরূপ কোনো শর্তারোপ নেই। আপনি তো বলেছেন: "এইভাবে রাগিয়ে দিলে মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে" – এটি একটি সাধারণ মানবিক প্রতিক্রিয়া বর্ণনা, তালাকের শর্ত নয়।
৪. রাগের অবস্থায় বলা কথা
আপনি প্রচণ্ড রাগের মুহূর্তে কথাগুলো বলেছেন। হাদীসে এসেছে, রাগের সময় তালাক দেওয়া অপছন্দনীয়, তবে তা যদি সরীহ শব্দে হয় তবে তালাক পতিত হয়। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে শব্দ সরীহ নয়, কিনায়া, এবং আপনার নিয়ত তালাকের ছিল না। তাই তালাক পতিত হয়নি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২১৯২; আল-হিদায়া, ২/২৭৯)
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত
- আপনার বিবাহ বহাল আছে। কোনো তালাক বা শর্ত তালাক পতিত হয়নি।
- আপনার স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিক বৈবাহিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।
- তবে ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাকের কথার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন। প্রয়োজনে মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়ে রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারে শান্তি বর্ষণ করুন।
উল্লেখযোগ্য হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানবী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
- আল-হিদায়া (মারগীনানী)
- বেহেশতী জেওর (মুফতি শফী)