স্বামী তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, আমি কি ১ মাসের গর্ভকে নষ্ট করতে পারবো?
Family Life · Hanafi
Question
এখন আমি কনসিভ করেছি আবার ১ মাস হয়। আমি বাচ্চাটা নিতে চাই না। আমার প্রচন্ড ভয় হয় একেও আমি একটা ভালো শিক্ষা দিতে পারবো না। আমি এখানে পড়তে এসেছি আমি বাচ্চাটা নিলে এই ৯ মাস বাচ্চা পেটে নিয়ে আমার ক্লাসে যেতে হবে, পড়তে হবে, পরিক্ষা দিতে হবে, আমার এখন যেই শারিরীক অবস্থা, খুবই শোচনিয়। আমি আসলে আর বাচতেই চাই না। আল্লহর জন্য সব। এখন এই অবস্থায় কি বাচ্চা টা আমাকে নিতেই হবে? আমি রিযিক এর চিন্তা করি না না না। আমার বাচ্চা টাকে পালার মতো শক্তি টাও নেই। আমি নিজের সব দিয়ে সংসার শেষ পর্যন্ত করে যেতে চাই। কিন্তু এই জঘন্য পরিবেশে আর কাউকে আনতে চাই না। আমি জানি না আসলে মানসিক শান্তির কি কোনো দাম নেই আল্লাহর কাছে? আমার বাচ্চা টাকে নিয়ে ৯ মাস ক্লাস করতেই হবে। এখানে অবকাশের কোনো সুযোগ নেই। লাখ টাকা দেয়া ওখানে। আমি এখন কি করতে পারি??
Answer
উত্তর:
আপনার দীর্ঘ ও মর্মান্তিক বিবরণ পড়ে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত। আপনার স্বামীর নির্যাতন, মানসিক অত্যাচার এবং পীড়ন কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের জন্য শান্তির উৎস হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা প্রথমেই আপনাকে বলব, আপনার জীবনের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনি চরম মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতায় ভুগছেন, যা আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনুগ্রহ করে দয়া করে একজন পেশাদার মনোবিদ বা পরামর্শকের সাহায্য নিন। আপনার দেশে সম্ভবত হেল্পলাইন বা কাউন্সেলিং সেবা আছে।
এখন আপনার মূল প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে ১ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, আপনি কি এই সন্তান নিতে বাধ্য, নাকি গর্ভপাত করতে পারেন?
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে গর্ভপাতের বিধান:
-
১২০ দিন (৪ মাস) পর: রূহ ফুঁকানোর পর গর্ভপাত সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি হত্যার মতো গুনাহ। কোনো অবস্থায় বৈধ নয়।
-
১২০ দিনের আগে: হানাফী মাযহাবে প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে গর্ভপাতের অনুমতি নিয়ে মতভেদ আছে। অধিকাংশ হানাফী ফকীহ (যেমন ইবনে আবেদীন শামী) বলেছেন, কোনো প্রয়োজন ছাড়া ১২০ দিনের আগেও গর্ভপাত মাকরুহ তাহরীমী (অত্যন্ত অপছন্দনীয়) এবং গুনাহের কাজ। তবে যদি কোনো জরুরি কারণে (যেমন মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য সাংঘাতিক ঝুঁকি, অথবা ধর্ষণের ফলে সন্তান ইত্যাদি) তবে প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৪০ দিন পর থেকে ১২০ দিন পর্যন্ত গর্ভপাত হারামের কাছাকাছি এবং শুধুমাত্র অত্যন্ত জরুরি অবস্থায় অনুমতি আছে।
-
আপনার বর্তমান অবস্থা: আপনি ১ মাসের অন্তঃসত্ত্বা (অর্থাৎ ৪০ দিনের মধ্যে)। হানাফী মাযহাবের সুপরিচিত ফকীহগণ যেমন মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) ও মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) স্পষ্টভাবে বলেছেন, শুধুমাত্র অভাব-অনটন, সন্তান লালন-পালনের অসুবিধা, বা সংসারিক সমস্যার কারণে গর্ভপাত জায়েজ নয়। তবে যদি মায়ের শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয় এবং গর্ভাবস্থা চলতে থাকলে তার প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে, তাহলে এই অবস্থায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে গর্ভপাতের অনুমতি কিছু উলামা দিয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- আপনি গুরুতর মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন এবং আত্মহত্যার চিন্তায় আছেন। এটি একটি গুরুতর স্বাস্থ্যগত সংকট।
- আপনার স্বামী প্রচণ্ড হিংস্র এবং সহিংস। এই শিশুটি সেই পরিবেশে বড় হবে, যা তার জন্য আরও বড় বিপদ।
- আপনার পড়াশোনার প্রয়োজন রয়েছে, তবে এটি গর্ভপাতের জন্য এককভাবে যথেষ্ট কারণ নয়।
কিন্তু মনে রাখবেন, গর্ভপাত একটি শিশুকে হত্যা করার মতো গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা সন্তানকে রিজিক দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। আপনার সন্তানের জন্য চিন্তা করার চেয়ে বরং আপনার জন্য জরুরি হলো প্রথমে আপনার নিজের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা।
আমাদের পরামর্শ:
১. সবার আগে নিজের জীবন বাঁচান:
আপনি যদি মানসিকভাবে এত বিপর্যস্ত হন যে আত্মহত্যার চিন্তা আসে, তাহলে অবশ্যই একজন ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। ইসলামে আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ। আল্লাহর রহমত অপরিসীম। আপনি এই কষ্টের বিনিময়ে জান্নাতের আশা রাখতে পারেন।
২. আপনার স্বামী থেকে আলাদা হন:
যেহেতু তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনকারী, আপনার জন্য জায়েজ আছে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক) নেওয়া। আপনি স্থানীয় ইসলামী কেন্দ্র বা মুসলিম সংগঠনের মাধ্যমে একজন ইমামের শরণাপন্ন হন এবং নিজের অধিকার রক্ষা করুন। আপনি ইউরোপে আছেন, সেখানে আইনতও আপনি সুরক্ষা পেতে পারেন।
৩. এই সন্তান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত:
গর্ভপাতের পরিবর্তে আমরা আপনাকে অনুরোধ করব দয়া করে সন্তানটি রেখে দেওয়ার চেষ্টা করুন। আল্লাহই রিজিকদাতা। আপনি নিজেই বলেছেন, আপনি আপনার ছেলেটিকে একজন ভালো মানুষ করতে চান। দ্বিতীয় সন্তানটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তবে আপনি যদি বিশ্বাসযোগ্য মুসলিম চিকিৎসকের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে আপনার শারীরিক বা মানসিক অবস্থার কারণে গর্ভাবস্থা চলা আপনার জন্য জীবন-মরণের বিষয়, তাহলে প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে সেটি চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে করা যেতে পারে। কিন্তু শুধু পড়াশোনা বা অসুবিধার কারণে এটি বৈধ হবে না। এই ব্যাপারে সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে যোগাযোগ করে ফতোয়া নিন।
৪. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল:
আপনি লিখেছেন, “মানসিক শান্তির কি কোনো দাম নেই আল্লাহর কাছে?” – শান্তি অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু সেই শান্তি অর্জনের পথ হলো আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা, হারাম থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর ওপর ভরসা করা। গর্ভপাত একটি হারাম কাজ, যা আপনাকে প্রকৃত শান্তি থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। বরং আপনি ধৈর্য ধারণ করলে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করলে ইনশাআল্লাহ তিনি আপনার জন্য উত্তম পথ বের করে দেবেন।
৫. আপনার ছেলের জন্য চিন্তা:
আপনার চার বছরের ছেলে ইতিমধ্যে সহিংসতা দেখছে। তাকে এই পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়াই উত্তম। আপনি চাইলে স্বামী থেকে আলাদা হয়ে নিজেই তাকে মানুষ করতে পারেন। ইসলামে আপনার উপার্জনের অধিকারও আছে। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি বা শিক্ষা গ্রহণ করে তাকে বড় করতে পারেন।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
-
গর্ভপাত: প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে অত্যন্ত জরুরি অবস্থা (যেমন মায়ের প্রাণহানির স্পষ্ট আশঙ্কা) ছাড়া গর্ভপাত জায়েজ নয়। আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থা গুরুতর, তবে এটি সন্তান হত্যার বৈধতা দেয় না। আপনি যদি চিকিৎসকের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে গর্ভাবস্থা চললে আপনার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তাহলে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে শুধু অসুবিধা বা ভয়ের কারণে নয়।
-
পরামর্শ: আপনি নিজে একজন ইসলামী স্কলার বা মুফতির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন এবং আপনার সম্পূর্ণ পরিস্থিতি খুলে বলুন।
-
দুআ: আল্লাহ যেন আপনার কষ্ট লাঘব করেন এবং আপনাকে ধৈর্য দান করেন। আপনার একটি ছেলে আছে, তাকে ভালোভাবে মানুষ করার মাধ্যমে আপনি অনেক সওয়াব পেতে পারেন।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) ১/৪৩৫-৪৩৬
- ফতোয়ায়ে উসমানী ২/৪১-৪২
- ইমদাদুল ফতোয়া ৪/২৮৪
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.) ১/২১১-২১২
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।