গার্হস্থ্য নির্যাতনের শিকার একজন বিবাহিত মুসলিম নারীর প্রশ্ন—স্বামীর অত্যাচার, মানসিক বিপর্যস্ততা ও উচ্চশিক্ষার চাপের মধ্যে গর্ভপাত করা জায়েজ হবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 2114
Questioner: Jannatul ferdaous
Question Asked: 28 Jun 2026, 03:38 PM
Reviewed & Published: 28 Jun 2026, 03:44 PM
Views: 82
Tokens: 10,056
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি ২০১৭ সাল থেকে বিবাহিত। আমার একজন ছেলে সন্তান আছেন। বর্তমানে আমি আমার সামি সহ ইউরোপ এর একটি দেশে এসেছি আমার উচ্চশিক্ষার জন্য। ১০ মাস হলো মাত্র। আমার সামির ভরনপোষন নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু তার সাথে আমার কোনো মানসিক সম্পর্ক নেই। সে নিজের বড়ত্ত জাহির করার জন্য প্রায়ই খুব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার গায়ে খুব বাজে ভাবে হাত তুলে, যখন সে লজিক দিয়ে কথায় পারে না তখনই, এটা প্রায় ১০ বছর যাবতই। আমার ছেলের বয়স ৪ বছর তার সামনএও আমার গায়ে হাত তুললো, ছেলে আমার ভয়ে কান্না করেছে, সে সব বুঝে, এবং মনিও রাখে, এটা আমার জন্য খুব কসটের, আমি চাই নাই এই পরিবেশে সন্তানকে মানুষ করতে। তারপরও ভাবি যাক অনেক বছর জিবনের চলে গেছে আর যতদিন আল্লহ হায়াত দিয়েছেন ততদিনই সহ্য করি। আসলে আমার যাওয়ার জায়গা নেই। সে প্রচন্ড হিংসাত্মক একজন মানুষ। আমি আর কোনো সন্তান নিতে চাই না। আমার ছেলেকেই আল্লহর পথে মানুষ করতে চাই। আমি মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত যার শেষ হয়তো মৃত্যু দিয়ে।তিনি প্রচন্ড ভাবে টাকার খোটা দেন, বাবার বারি থেকে কিছু কেনো দেয় নি। এখনও বলে, এমন ভাবে কথা বলে যেটা আমার ভিতর ছিদ্র হয়ে যায়।যেগুলার কোনো উত্তর আমি দিতে পারি নাই টাকার জন্য। যে কথার আঘাত গুলা তার ব্যক্তিতের পরিচয়। যা আমি মৃত্যু পর্যন্ত ভুলবো না। হয়তো সে মারা গেলেও আমি মাফ করতে পারবো না।
এখন আমি কনসিভ করেছি আবার ১ মাস হয়। আমি বাচ্চাটা নিতে চাই না। আমার প্রচন্ড ভয় হয় একেও আমি একটা ভালো শিক্ষা দিতে পারবো না। আমি এখানে পড়তে এসেছি আমি বাচ্চাটা নিলে এই ৯ মাস বাচ্চা পেটে নিয়ে আমার ক্লাসে যেতে হবে, পড়তে হবে, পরিক্ষা দিতে হবে, আমার এখন যেই শারিরীক অবস্থা, খুবই শোচনিয়। আমি আসলে আর বাচতেই চাই না। আল্লহর জন্য সব। এখন এই অবস্থায় কি বাচ্চা টা আমাকে নিতেই হবে? আমি রিযিক এর চিন্তা করি না না না। আমার বাচ্চা টাকে পালার মতো শক্তি টাও নেই। আমি নিজের সব দিয়ে সংসার শেষ পর্যন্ত করে যেতে চাই। কিন্তু এই জঘন্য পরিবেশে আর কাউকে আনতে চাই না। আমি জানি না আসলে মানসিক শান্তির কি কোনো দাম নেই আল্লাহর কাছে? আমার বাচ্চা টাকে নিয়ে ৯ মাস ক্লাস করতেই হবে। এখানে অবকাশের কোনো সুযোগ নেই। লাখ টাকা দেয়া ওখানে। আমি এখন কি করতে পারি??

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মানবিক। আপনি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার, যা আপনার মানসিক অবস্থাকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এবং ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করলেও বর্তমানে আপনি গর্ভবতী—এটি একটি নতুন সংকট। আপনি জানতে চান, এই অবস্থায় কি গর্ভস্থ সন্তানটিকে রাখতে বাধ্য? অথবা গর্ভপাত করার অনুমতি আছে কি?

হানাফি ফিকহে গর্ভপাতের বিধান

হানাফি মাজহাবের মূলনীতি হলো:

  1. ১০০ দিনের (১৪ সপ্তাহ) পর গর্ভপাত সম্পূর্ণ হারাম।
    ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ১২০ দিনের মধ্যে যখন রূহ ফুঁকানো হয়, তার আগেও গর্ভপাত নাজায়েজ, তবে কিছু বিশেষ অবস্থায় অনুমতি আছে। কিন্তু ১২০ দিনের পর তা কখনোই জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৬)

  2. ৪০ দিনের (প্রথম ৬ সপ্তাহ) মধ্যে গর্ভপাত:
    হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের একটি বড় অংশের মতে, ৪০ দিনের মধ্যে যদি কোনো বৈধ ও জরুরি কারণ থাকে (যেমন মায়ের জীবন হুমকির মুখে, বা শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর), তাহলে কিছু শর্তে গর্ভপাত জায়েজ হতে পারে। তবে এটি শুধু তখনই, যখন কোনো শরয়ি ওজর (উজর) বিদ্যমান থাকে।
    (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৭৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২২৭)

  3. গর্ভপাতের জন্য বৈধ ওজর কী কী?

    • মায়ের জীবন রক্ষা।
    • মায়ের শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হলে।
    • কোনো অসুস্থতা বা ওষুধের কারণে বাচ্চা মারাত্মক ত্রুটিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা।

    কিন্তু অর্থাভাব, পড়াশোনার চাপ, সন্তান লালন-পালনের অক্ষমতা, বা দাম্পত্য কলহ—এগুলো সাধারণত গর্ভপাতের বৈধ ওজর গণ্য হয় না।
    (বাহিশতি জেওর, ৮/২৪৩; ফতওয়া দারুল উলুম দেবন্দ, ৪/৪৯৪)

আপনার বর্তমান পরিস্থিতির পর্যালোচনা

আপনি বর্তমানে ১ মাসের গর্ভবতী। অর্থাৎ ৪০ দিনেরও কম সময়। আপনার মানসিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, আপনি ‘মৃত্যু দিয়ে শেষ’ হওয়ার কথাও বলছেন। এটি স্পষ্ট যে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য চরম সংকটে রয়েছে।

ইসলামে মানুষের জীবন অতি মূল্যবান, তবে মায়ের জীবনও অমূল্য। আপনি যদি চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারেন যে এই গর্ভধারণ আপনার দীর্ঘমেয়াদি মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য সত্যিই হুমকি (যেমন গুরুতর ডিপ্রেশন, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদি), তাহলে হানাফি ফিকহে এইরূপ জরুরি অবস্থায় ৪০ দিনের মধ্যে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে

তবে খুব সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নিন:

  • গর্ভপাত একটি অত্যন্ত গুরুতর পদক্ষেপ। আপনি যেহেতু ‘আর বাঁচতে চাই না’ বলছেন, এটি ইঙ্গিত দেয় যে আপনার মানসিক সাহায্য জরুরি। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পেশাদার সাহায্য নিন।
  • আপনার ছেলের জন্যও দায়িত্ব আছে। তিনি ইতিমধ্যে ৪ বছর বয়সী এবং বাবার আচরণে তিনি ভয় পাচ্ছেন। তাকে সুন্দর মানুষ করতে হলে আপনার নিজের সুস্থতা জরুরি।
  • রিজিকের চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ বলেন, “তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। তাদের ও তোমাদের রিজিক দেওয়া আমারই দায়িত্ব।” (সূরা বনী ইসরাইল, ৩১)

আপনি কী করতে পারেন?

১. স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া:
আপনার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং গুরুতর গুনাহ। আপনি চাইলে:

  • খুলা (স্বামীর রাজি না থাকলেও স্ত্রী পণ ফিরিয়ে দিয়ে তালাক নিতে পারে) অথবা আদালতের মাধ্যমে ফাসখ (বিবাহ বিচ্ছেদ) করতে পারেন।
  • স্থানীয় মুসলিম সংস্থা বা ইসলামি স্কলারদের সহায়তা নিন।
  • যদি নির্যাতন প্রমাণিত হয়, তাহলে স্বামীর জন্য আপনার ভরণপোষণ ও মোহরানা দেওয়া আবশ্যক।

২. গর্ভাবস্থায় পড়াশোনা:
ইসলামে গর্ভাবস্থায় পড়াশোনা বা ক্লাস করা নিষেধ নয়। অনেক নারী দুনিয়ার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন গর্ভবতী অবস্থায়। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো মাতৃত্বকালীন ছুটি বা অন্যান্য সুবিধা দেয়। আবেদন করে দেখতে পারেন। আল্লাহর সাহায্যে সব সম্ভব।

৩. সন্তানকে রাখার সিদ্ধান্ত:
আপনার ১ মাসের গর্ভ। আপনি যদি মনে করেন আপনার মানসিক অবস্থা একেবারেই অচল, তাহলে নির্ভরযোগ্য ইসলামি স্কলার বা মুফতি-এর কাছে সরাসরি পরামর্শ করুন এবং আপনার চিকিৎসকের সার্টিফিকেট দেখান। তবে মনে রাখবেন, গর্ভপাত একটি শেষ বিকল্প, প্রথম নয়।

৪. তওবা ও ইস্তেগফার:
আপনি যেসব কঠোর কথা বলেছেন (যেমন ‘মাফ করবো না’)—এটি স্বাভাবিক, তবে ক্ষমা ও ধৈর্যের জন্য চেষ্টা করুন। নবী (সা.) বলেছেন, “যে ক্ষমা করে, আল্লাহ তার সম্মান বাড়িয়ে দেন।” (মুসলিম) তবে আপনার স্বামীর আচরণ ক্ষমাযোগ্য নয়। আপনি যদি তাকে মাফ করতে না পারেন, সেটা গুনাহ নয়, কিন্তু নিজের শান্তির জন্য চেষ্টা করবেন।

ফতোয়া ও পরামর্শ

উল্লেখযোগ্য হানাফি গ্রন্থের বক্তব্য:

  • রদ্দুল মুহতার (৬/৪১৭): “গর্ভধারণের ১৪০ দিনের মধ্যে গর্ভপাত করা নাজায়েজ, তবে যদি কোনো ওজর হয় (যেমন বুকের দুধ শেষ হয়ে যাওয়া বা সন্তানের শারীরিক ক্ষতি) তাহলে ৪০ দিনের মধ্যে অনুমতি আছে।”
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩৫৬): “গর্ভপাতের অনুমতি শুধু ততটুকু, যতটুকু মায়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২২৭) – আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন: “যদি কোনো ওজর থাকে যেমন বাচ্চা মায়ের জীবন শেষ করে দেওয়ার উপক্রম হয়, তাহলে ৪০ দিনের মধ্যে জায়েজ, কিন্তু তার পরেই নয়।”
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি শফি, রহ.) – সূরা বনী ইসরাইলের তাফসিরে স্পষ্ট: “দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করা নিষিদ্ধ।” তবে এখানে জীবন রক্ষার বিষয়টি ভিন্ন।

সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত:
প্রশ্নের বিবরন মতে গর্ভপাত করা জায়েজ হবেনা।

আল্লাহর ওপর ভরসা করুন, তিনি আপনার সন্তানের জন্য উত্তম কিছুর ব্যবস্থা করবেন।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপ:

  1. বিশ্বস্ত নারী ডাক্তার ও ইসলামি স্কলারের সাথে কথা বলুন।
  2. আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং নিন।
  3. স্বামীকে স্পষ্ট জানিয়ে দিন—হয় সে পরিবর্তন হবে নতুবা আপনি বিবাহ বিচ্ছেদের পথে যাবেন।
  4. সন্তানের জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ তাকে আপনার জন্য শান্তির কারণ করে দেবেন।

আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও শক্তি দিন। আপনার অবস্থা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু হতাশ হবেন না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত নিকটবর্তী।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.