স্বামী যদি শর্ত দিয়ে তালাক বলে কিন্তু নিয়ত না থাকে তাহলে কি তালাক হবে?
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
আর বলছে যদি তোমার বাচ্চা না হয় ছেড়ে দিব এখন যদি কোনোদিন বাচ্চা না হয় আর স্বামী যদি তালাক না দিতে চায় তাহলে কিছু হবে?
২.সকালে আমি বলছিলাম তালাকের অধিকার দেও সে আমাকে তালাকের অধিকার দেয় আমি কিছু বলিনি এর মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছিল ২/৩ মিনিট পর আমকে স্বামী বলে মিলে যেতে আমি বলি মিলব না আমার মনে তালাকের নিয়ত ছিল না কিন্তু মিলব না কথাটা বলার সময় আমার তালাকের অধিকার এর কথাই মাথায় ঘুরছিল। এতে কি তালাক হবে আমার নিয়ত ছিল না কিন্তু বলার সময় অধিকারের কথাই ছিল মনে । এতে কি তালাক হবে? পরবর্তীতে আমি তাকে বলি অধিকার ফিরিয়ে নাও। সে শুধু বলে "আমি রাইট right ফিরায় নিলাম" এইটাই আর কিছু না এতে কি অধিকার উঠে গেছে?
Answer in bangla please. Also kosom er kaffara ekhon na dile ki talaq hobe?
Answer
উত্তর: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার উল্লেখিত বিষয়গুলোতে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-বিভ্রান্তি) থেকে বাঁচার জন্য নিম্নোক্ত ফাতাওয়া ও নির্দেশনা অনুসরণ করুন। এখানে শুধুমাত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস এবং সালাফী বিদ্বানদের (ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবন বায, আলবানী, উসাইমীন, ফাওযান) মতামত প্রদান করা হলো।
১ম ঘটনা: স্বামীর শর্ত/কসম এবং তালাকের পরিণতি
প্রশ্নের সারাংশ:
স্বামী কথায় বলেছে: “যদি তুমি ব্যবহার ঠিক না কর, আল্লাহর কসম, তাহলে ছেড়ে দিব” → আপনি রাগের মাথায় বললেন: “বদলাবো না” → স্বামী বলল: “তাহলে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে” → পরে স্বামী জানাল যে তার তালাকের নিয়ত ছিল না, শুধু আপনাকে ভয় দেখানোর জন্য বলেছিল। একইভাবে স্বামী বলেছে: “যদি বাচ্চা না হয়, ছেড়ে দিব” — কিন্তু এখন সে তালাক দিতে চায় না।
ফাতাওয়া ও দলিল:
১. শর্তযুক্ত তালাক (তালিকে তালীক) ও কসমের মধ্যে পার্থক্য:
- স্বামী যদি “আল্লাহর কসম” বলে তালাকের শর্তারোপ করে (যেমন: “তুমি যদি X করো, তাহলে তালাক”) এবং তার নিয়ত হয় শুধু কসম করা (তালাক না দেয়া), তবে তা ইয়ামীন (শপথ) গণ্য হবে, তালাক নয়। ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “শপথের সঙ্গে তালাক যুক্ত করলে, যদি শপথ ভাঙে তবে তালাক হবে না, বরং শপথের কাফফারা দিতে হবে” (মাজমূ’ ফাতাওয়া, ৩৩/৭৬)।
- ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) আরও বলেন: “যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে শপথের মাধ্যমে বলল ‘তুমি যদি এমন করো, তবে তুমি তালাক’ — আর তার নিয়ত ছিল কেবল নিষেধ করা বা ভয় দেখানো, তাহলে তা তালাক নয়” (ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ঈন, ৩/১০৫)।
আপনার স্বামী স্পষ্ট বলেছে: “তালাকের নিয়ত ছিল না, শুধু বুঝাতে চেয়েছি” — তাই এটি তালাক নয়, বরং একটি শপথ (কসম) যা ভঙ্গ হলে কাফফারা দিতে হবে।
২. যদি শর্ত পূর্ণ হয় (আপনি না বদলান) কিন্তু স্বামী তালাক না দেয়:
- যেহেতু স্বামীর নিয়ত তালাকের ছিল না, তাই কোনো তালাক হয়নি। তবে তার শপথ ভঙ্গের কারণে কাফফারা দিতে হবে। কাফফারা: ১০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো, অথবা ১০ জনকে কাপড় দেয়া, অথবা ৩টি রোজা রাখা (সূরা আল-মায়েদা: ৮৯)।
একইভাবে “বাচ্চা না হলে তালাক” – এটিও যদি শপথ আরাধে (নিয়ত তালাক না হয়), তবে বাচ্চা না হলেও তালাক হবে না, শুধু কাফফারা লাগবে (যদি কসম ভাঙে বা শর্ত পূর্ণ হয়)।
৩. স্বামীর “ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে” কথাটি:
- এটি আগের বক্তব্যের ফলাফল মাত্র। যেহেতু মূল বক্তব্য শপথ-ভিত্তিক ছিল, তাই এটি স্বয়ংক্রিয় তালাক নয়। স্বামী পরে যখন বলেছেন “শর্ত না”, তখন বুঝতে হবে তিনি তালাকের ইচ্ছা করেননি। ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া: “যদি স্বামী বলে ‘তালাক’ কিন্তু তালাকের নিয়ত না থাকে, তবে তা তালাক নয়।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২০/২৪৫)
সারসংক্ষেপ:
- তালাক হবে না।
- কসমের কাফফারা: এখন না দিলেও তালাক হবে না। তবে যত দ্রুত সম্ভব কাফফারা আদায় করতে হবে (যদি শর্ত পূর্ণ হয়ে থাকে বা আপনি না বদলে থাকেন)।
২য় ঘটনা: তালাকের অধিকার দেওয়া ও পরে “মিলব না” বলা
প্রশ্নের সারাংশ:
সকালে আপনি তালাকের অধিকার চান, স্বামী আপনাকে ‘হক্কে তালাক’ দেন। ২/৩ মিনিট পর ঝগড়ায় স্বামী বলে “মিলে যেতে” → আপনি বলেন “মিলব না” — আপনার নিয়ত ছিল না তালাকের, কিন্তু মুখে বলার সময় তালাকের অধিকারের কথাই মাথায় ঘুরছিল। পরে আপনি অধিকার ফিরিয়ে নিতে বললে স্বামী বলেন “আমি রাইট ফিরায় নিলাম”।
ফাতাওয়া ও দলিল:
১. “মিলব না” কথাটি তালাক হয় কিনা:
-
আপনি স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ বলেননি (যেমন: “তোমাকে তালাক” বা “আমি তালাক নিচ্ছি”)। শুধু “মিলব না” বলা তালাকের ইজাব (প্রস্তাব) নয়। ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: “তালাক হতে হলে স্ত্রীকে অবশ্যই সুস্পষ্ট শব্দ বলতে হবে, অথবা ইশারা-ইঙ্গিত ব্যবহার করতে হবে, যাতে তালাকের নিয়ত প্রকাশ পায়। আর ‘মিলব না’ শব্দটি তালাকের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দরব, ১৯/২)
-
আপনার মনে তালাকের নিয়ত ছিল না — এটিই মূল বিষয়। হাদীসে এসেছে: “প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল” (বুখারী, ১; মুসলিম, ১৯০৭)। তাই কোনো তালাক হয়নি।
২. মনে অধিকারের কথা ঘুরলেও:
- মনের চিন্তা বা খেয়াল তালাকের জন্য যথেষ্ট না, যতক্ষণ না আপনি মুখে তালাকের শব্দ উচ্চারণ বা ইজাব করেন। ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি তালাকের নিয়ত করে কিন্তু মুখে বলে না, তার তালাক হয় না।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩২/১০৫)
৩. অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া:
- স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া (তাফবীয) বৈধ, এবং এই অধিকার স্ত্রী ব্যবহার না করা পর্যন্ত স্বামী তা ফিরিয়ে নিতে পারে। ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন: “তালাকের অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া বৈধ, যতক্ষণ স্ত্রী তা ব্যবহার না করে।” (আল-মুগনী, ৭/৩৬৫)
- স্বামী বলেছেন “রাইট ফিরায় নিলাম” — এটি একটি সুস্পষ্ট বাক্য, যা দ্বারা অধিকার প্রত্যাহার হয়। তাই এখন আপনার হাতে আর তালাকের অধিকার নেই।
সারসংক্ষেপ:
- “মিলব না” বলায় তালাক হয়নি।
- স্বামী অধিকার ফিরিয়ে নিয়েছে, তাই আর আপনার হাতে তালাকের ক্ষমতা নেই।
কসমের কাফফারা: এখন না দিলে কি তালাক হবে?
উত্তর:
- কসম ভঙ্গ করলে তালাক হবে না, বরং কাফফারা দিতে হবে। যত দেরি করবেন, গুনাহ বাড়বে, কিন্তু তালাকের কোনো সম্পর্ক নেই।
- যদি এখন কাফফারা না দেন, তাহলে আপনাকে তওবা করতে হবে এবং যত শীঘ্র সম্ভব কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে দেরি করায় তালাক সংঘটিত হবে না।
শেষ পরামর্শ: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচুন
ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-বিভ্রান্তি) শয়তানের কাজ। আপনাকে এই বিষয়গুলো নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিম্নোক্ত নির্দেশনাগুলো মেনে চলুন:
- তালাকের ব্যাপারে কেবলমাত্র সুস্পষ্ট বক্তব্য ও নিয়তকেই গণ্য করুন। মনের ভাবনা বা অনিশ্চিত শব্দকে তালাক মনে করবেন না।
- স্বামীর কথাকে ভালো ধারণায় নিন — তিনি যদি বলেন “তালাকের নিয়ত ছিল না”, তাহলে তা মেনে নিন।
- ওয়াসওয়াসার সময় এই দো‘আ পড়ুন:
“আমিনতু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি, আ‘ঊযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম।”
(আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি, আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইছি।) - কসমের কাফফারা আদায় করে দিন — তাহলে আপনার মন শান্ত হবে।
- গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া: শায়খ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, সে যেন কোনো কিছুকে তালাক গণ্য না করে, যতক্ষণ না সুস্পষ্টভাবে তালাকের কথা বলা হয় এবং নিয়ত থাকে।” (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর, ২২৪)
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও বরকত দান করুন। আপনার যেকোনো প্রশ্ন থাকলে জানাতে পারেন।