রাগান্বিত অবস্থায় তালাক এবং স্ত্রী গ্রহণের শর্তে তালাক প্রদান সম্পর্কে জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার স্ত্রীর সঙ্গে এক পর্যায়ে ঝগড়ার সময় আমি "এক তালাক, দুই তালাক এবং তিন তালাক" শব্দগুলো উচ্চারণ করি।
ঘটনাটি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, আমি পেশায় একজন নাবিক । দীর্ঘ সময় জাহাজে অবস্থান, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন, মানসিক একাকীত্ব এবং কাজের অত্যন্ত কঠিন পরিবেশের কারণে আমি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে থাকি। এছাড়াও পারিবারিক বিভিন্ন চাপও আমাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবিত করে। এসব বিষয় আমার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং অতিরিক্ত রাগের সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে।
এ কারণে আমার অত্যন্ত তীব্র রাগের সমস্যা রয়েছে, যা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমি রাগে এরও আগে মাঝে মাঝে এমন কিছু করেছি যা কোন ভাবে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এর পক্ষে করা সম্ভব না আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুসারে।আমি বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করছি এবং পূর্বেও এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। রাগের সময় আমি কখনো কখনো এমন কাজ করে ফেলি যার জন্য পরে অনুতপ্ত হই এবং উপলব্ধি করি যে, স্বাভাবিক ও সুস্থ মানসিক অবস্থায় আমি এমনটি করতাম না। এছাড়া পরে এসব বিষয় নিয়ে একা একা চিন্তা করি এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে একা একা কথাও বলে থাকি। যা সুস্পষ্ট একটি মানসিক রোগ।
দ্বিতীয়ত, একবার আমি আমার স্ত্রীকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে "তালাক" শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম, যখন আমি জানতাম না যে শরিয়তে তালাক কীভাবে কার্যকর হয়। সে সময় আমার তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না; আমি কেবল তাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম।
পরবর্তীতে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে নিজেদের ভেতর দ্বিধা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে আমি তালাকের বিধান সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি। তখন আমার মনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় যে, আমার রাগের সমস্যার কারণে কোনো এক সময় প্রবল রাগের মাথায় আমি এমন কিছু বলে ফেলতে পারি যা আমি প্রকৃতপক্ষে চাই না।
এই উদ্বেগের কারণেই আমি পূর্বে আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম যে, যেহেতু আমার রাগ অত্যন্ত বেশি, তাই আমি যদি কখনো তালাক দিই, তবে সেই তালাক কখনই কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি সে নিজে তা না চায় বা গ্রহণ করে। অর্থাৎ, তালাক বিষয়ে আমি সমস্ত কর্তৃত্ব তার হাতে দিয়েছিলাম এবং নিজের জন্য কোনো কর্তৃত্ব রাখিনি।
এটিও উল্লেখযোগ্য যে, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকে আমাদের মধ্যে ছোট ছোট পারিবারিক কলহ চলছিল। আমার মনে হতে শুরু করেছিল যে আমি ও আমার স্ত্রী একে অপরকে অপছন্দ করি এবং তার পরিবার স্বার্থপর। অন্যদিকে, সেও কয়েক দিন ধরে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছিল যা আমার জানা মতে তার স্বাভাবিক আচরণ নয়। যেমন ছোট ছোট কথা যেগুলো খুবই তুচ্ছ তার বাসায় বলা আমার সাথে তার কি কথোপো কথন হয়েছে সেগুলোও তার বাসায় বলা ইত্যাদি।এর ফলে আমার মনে হয়েছিল যে হয়তো কেউ তাকে বদ পরামর্শ দিচ্ছে অথবা কোনো অশুভ প্রভাব বা জাদুর প্রভাব থাকতে পারে; আল্লাহই সর্বাধিক অবগত। তবে এটাও সত্য যে, কয়েক দিন ধরে আমরা উভয়েই একে অপরের প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত ছিলাম এবং কষ্টদায়ক কথা বলছিলাম, যা আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্কের চিত্র নয়। অন্তত আমার স্ত্রীর স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
এসব ছোট ছোট তুচ্ছ কারণে আমার স্ত্রী হয়তো বা তার বাবা অথবা মাকে এ সম্পর্কে জানায় তারা আমার স্ত্রীকে নিতে আসে। এ ছোট্ট তুচ্ছ ঘটনার গুলোর প্রেক্ষিতে তার বাবা মাকে ডাকা অথবা এলাকার লোকজনকে ডাকা কোন কারণ হতে পারে না।এরপর উক্ত ঘটনার সময় আমি এবং আমার বাবা বারবার না বলা সত্ত্বেও আমার স্ত্রীর বাবা এলাকার লোকজন জড়ো করতে চায় যে ব্যাপারে আমি আমার স্ত্রীকে আগেই বারবার সতর্ক করে আসছি কিন্তু তার বাবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর জন্য জনসমাগম করেছিল । এই সময় এই জনসমাগম কে কেন্দ্র করে আমার ভয়াবহ রাগ ওঠে আমার এমন মনে হতে থাকে যে আমার স্ট্রোক হতে পারে আমি ওখানে রাগে কাঁপছিলাম এবং আমার ঘাড়ের ডানপাশে ব্যথা করতে থাকে, এমত অবস্থায় কথা কাটাকাটির এক সময় আমি "এক তালাক, দুই তালাক এবং তিন তালাক" শব্দগুলো উচ্চারণ করি।
তবে আমার অন্তরের দৃঢ় নিয়ত ছিল যে, যদি পূর্বে আমার দেওয়া কর্তৃত্বের কারণে আদৌ কোনো তালাক কার্যকর বলে গণ্য হবে না, আল্লাহ ভালো জানেন। যদিও তালাক কার্যকর হওয়া বা না হওয়ার বিষয়ে আমার মনে সংশয় ছিল, তবুও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, কার্যকর হলে তা এক তালাকের বেশি হবে না যাতে আমরা ইদ্দত কালীন সময় পাই সম্ভাব্য শালা-পরামর্শ বা ফয়সালার জন্য ।আল্লাহ আমার মনের কথা ভালো জানেন।
অতএব, আমি সম্মানিত মুফতি সাহেবের নিকট বিনীতভাবে জানতে চাই, উপরোক্ত পরিস্থিতিতে আমি যে কথাগুলো প্রবল রাগ ও আবেগের বশে উচ্চারণ করেছি, তার কারণে কি আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে?
আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে সঠিক সমাধান ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে আমাকে উপকৃত করবেন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার দেওয়া বিস্তারিত বর্ণনা ও মানসিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি:
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ:
আপনি ঝগড়ার সময় অত্যন্ত তীব্র রাগ ও আবেগের বশে “এক তালাক, দুই তালাক এবং তিন তালাক” শব্দগুলো উচ্চারণ করেন। আপনার পেশাগত চাপ, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা, তীব্র রাগের কারণে আগেও চিকিৎসা নেওয়া, এবং ঘটনার সময় আপনি কাঁপছিলেন ও ঘাড়ে ব্যথা অনুভব করছিলেন—এসব ইঙ্গিত দেয় যে আপনি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ছিলেন না। বরং আপনি অতিরিক্ত রাগের কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যেখানে নিজের কথার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
১. অত্যাধিক রাগের প্রভাব:
- হানাফি ফিকহে যদি কোনো ব্যক্তি এতটাই রাগান্বিত হয় যে সে তার কথা ও কাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে (অর্থাৎ তার বিবেক লোপ পায়), তবে সেই অবস্থায় উচ্চারিত তালাক কার্যকর হয় না।
- (ফাতাওয়া শামী, ৩/২৪৩; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩৭)
- আপনার বর্ণনায় আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, রাগের সময় আপনি এমন কাজ করেন যা স্বাভাবিক অবস্থায় করতেন না, এবং বর্তমানে ওষুধ সেবন করছেন। এটি অত্যন্ত তীব্র রাগের (গাদাব মুফরিত) লক্ষণ যা তালাকের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
২. তালাকের কর্তৃত্ব অর্পণ (তাফবীয):
- আপনি আগে আপনার স্ত্রীকে বলে রেখেছিলেন যে, আমি যদি তালাক দিই, তবে তা কার্যকর হবে না, যতক্ষণ না তুমি তা গ্রহণ করো।
- হানাফি ফিকহে এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক (তা‘লীক) হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, আপনি আপনার ভবিষ্যৎ তালাককে আপনার স্ত্রীর গ্রহণের শর্তে আবদ্ধ করে দিয়েছেন।
- যেহেতু আপনার স্ত্রী সেই সময় তালাক গ্রহণ করেননি (বরং তারা আলাদা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন), তাই শর্ত পূর্ণ হয়নি। ফলে তালাক কার্যকর হয়নি।
- (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৮৯; আল-হিদায়া, ২/৮০; বাহেশতী জেওর, ৭/২৬)
৩. একসাথে তিন তালাকের উচ্চারণ:
- যদি কোনো ব্যক্তি একই সাথে “এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক” বলে, তবে সাধারণত এটি তিন তালাক গণ্য হয়। কিন্তু যেহেতু উপরোক্ত উভয় কারণেই তালাকই কার্যকর হয়নি, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই।
চূড়ান্ত ফতোয়া:
আপনার উচ্চারিত তালাকগুলি (এক, দুই এবং তিন তালাক) শরিয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর হয়নি। তাই আপনার স্ত্রীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে। আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই বিদ্যমান।
প্রতিকার ও দিকনির্দেশনা:
- আপনার রাগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যান।
- ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাকের মতো গুরুতর কথা বলা থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।
- পারিবারিক বিষয়গুলো সমাধানের জন্য দ্বন্দ্বের সময় শান্ত পরিবেশে বসে আলোচনা করুন, প্রয়োজনে পরিবার বা সমাজের বিজ্ঞ ব্যক্তির মধ্যস্থতা নিন।
- মনে রাখবেন: তালাক আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় হালাল কাজ। রাগের বশে তা ব্যবহার করা কখনোই উচিত নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনার সম্পর্ককে সুস্থ ও সুন্দর করুন এবং আপনাকে সবর ও হিকমত দান করুন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
সতর্কীকরণ: এই ফতোয়া শুধুমাত্র আপনার বর্ণিত পরিস্থিতির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে কোনো সরকারি বা আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন হতে পারে।