স্বামী কর্তৃক স্ত্রী কে খোলা কাবিন মূলে ৩ তালাক
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হাসবেন্ড যদি স্ত্রী কে খোলা কাবিন মূলে ৩ তালাক এর নোটিশ পাঠায় তাহলে কি ৩ তালাক পতিত হবে??
স্ত্রীর কোন ভরনপোষণ না দিয়েই যদি তালাক দেয় তাহলে কি গুনাহগার হবে না//??
ইদ্দত পালনের নিয়ম গুলো কি কি??
যাদের দুনিয়ার জীবনে বিয়ে হয়ে ডিবোর্স হয়ে যায়,এদের তগদীরে কি ডিবোর্স লিখা ই ছিল??
যারা ২য় বার বিয়ে করে তাদের তগদীরে কি ২য় বিয়ে ই লিখা ছিল??
স্ত্রী যদি মনে মনে হাসবেন্ড কে চায়,তার জন্য দোয়া ও করে,সেক্ষেত্রে হঠাৎ করে তালাক এর নোটিশ পাঠানো টা অন্যায় হবে না??যদি ও স্ত্রী মুখে বলেছে সে যাবে না কিন্তু সে তালাক চায় নি।
যেহেতু তগদীর আল্লাহ তায়ালা লিখে রেখেছেন,সেক্ষেত্রে বিয়ে হয়ে ডিবোর্স হওয়া আবার ২য় বিয়ে হওয়া,, বিষয় টা একটু বুজিয়ে বলবেন আশা করি, জাজাকুমুল্লাহু খাইর।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নটি একাধিক বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত। নিচে প্রতিটি অংশের উত্তর ক্রমান্বয়ে পেশ করা হলো—
১. খোলা কাবিন মূলে ৩ তালাকের নোটিশ পাঠালে কি ৩ তালাক পতিত হবে?
উত্তর:
হানাফি ফিকহ অনুসারে, কাবিননামায় “খোলা” (অর্থাৎ স্ত্রীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া) বলে কোনো আলাদা ধারা নেই। বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য “ইজাব-কবুল”ই যথেষ্ট। তবে যদি কাবিননামায় উল্লেখ থাকে যে, “স্ত্রী ইচ্ছা করলে তালাক দিতে পারবে” (তালাকে তাফবীয), তাহলে তালাকের অধিকার স্ত্রীর নিকট ন্যস্ত হয়। কিন্তু এখানে স্বামী নিজেই স্ত্রীকে লিখিত নোটিশের মাধ্যমে “৩ তালাক” বলেছে বা লিখেছে, তাহলে—
- যদি নোটিশে স্পষ্টভাবে “তোমাকে তালাক” বা “৩ তালাক” শব্দ উল্লেখ থাকে এবং উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া হয়, তাহলে ৩ তালাক পতিত হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৯)
- আর কেবল “নোটিশ” শব্দ লিখলে, কিন্তু তালাকের শব্দ না থাকলে এবং নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হবে না। তবে লিখিত বক্তব্য যদি দ্ব্যর্থবোধক হয় এবং স্ত্রী প্রমাণ করতে পারে যে উদ্দেশ্য তালাক ছিল, তাহলে আদালতের রায় অনুযায়ী তালাক গণ্য হতে পারে।
সারকথা: খোলা কাবিন হওয়া সত্ত্বেও যদি স্বামী স্পষ্টভাবে “৩ তালাক” লেখে বা বলে, তাহলে তা কার্যকর হবে।
২. স্ত্রীর ভরণপোষণ না দিয়ে তালাক দিলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, গুনাহ হবে।
স্বামীর উপর স্ত্রীর জন্যে খোরপোষ (ভরণপোষণ) ফরজ। তালাক দেওয়ার পরও ইদ্দতকাল পর্যন্ত খোরপোষ দেওয়া ওয়াজিব। যদি স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে তা আদায় না করে, তবে সে গুনাহগার হবে। তবে তালাক বৈধ হওয়ার জন্য খোরপোষ দেওয়া শর্ত নয়; খোরপোষ না দিলেও তালাক পতিত হবে, কিন্তু স্বামী পাপী হবে। (সূরা তালাক, ৬৫:৬-৭; বাহিশতি জেওর, ৭/২৬)
৩. ইদ্দত পালনের নিয়ম কী কী?
উত্তর:
ইদ্দত হল তালাক বা বিচ্ছেদের পর এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা। নিয়মগুলো হলো—
- হায়েজওয়ালী (মাসিক চলাকালীন) স্ত্রী: তিন মাসিক চক্র (তিন কুরূ’) পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। (সূরা বাকারা, ২:২২৮)
- গর্ভবতী স্ত্রী: সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত। (সূরা তালাক, ৬৫:৪)
- যৌবন বন্ধ (আয়েসা) বা ছোট মেয়ে: তিন মাস ইদ্দত।
- ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে না।
- ইদ্দত সাধারণত স্বামীর গৃহেই কাটানো উচিত (যতক্ষণ না স্বামী অন্যায়ভাবে বের করে দেয়)।
- ইদ্দতের সময় সাজসজ্জা, সুগন্ধি ব্যবহার, বাইরে বের হওয়া ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব। (বাদায়িউস সানায়ি’, ৩/২৩০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪১০)
৪. তাকদীরে কি বিবাহ-ডিভোর্স লেখা আছে? দ্বিতীয় বিবাহ কি তাকদীরে লেখা?
উত্তর:
হ্যাঁ, তাকদীরে প্রতিটি মানুষের জীবন ও কর্মের সব বিবরণ আল্লাহ লিখে রেখেছেন।
সূরা হাদীদ (৫৭:২২)-এ বলা হয়েছে:
“পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের জীবনে কোনো বিপদ-আপদ আসে না, তা সংঘটনের পূর্বেই আমি কিতাবে লিপিবদ্ধ না করে থাকি।”
সুতরাং—
- কারো তাকদীরে ডিভোর্স লেখা থাকলে, তা ঘটবেই।
- দ্বিতীয় বিবাহও তাকদীর অনুযায়ী হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানুষ কোনো ইচ্ছা ও কর্ম স্বাধীন নয়।
ইসলামী আকীদায়: তাকদীর ও মানবীয় ইচ্ছা (কাসব) উভয়ই সত্য। আল্লাহ পূর্ব থেকে জানেন এবং লিখে রেখেছেন; আর মানুষ নিজের ইচ্ছা ও পছন্দ অনুযায়ী কাজ করে। তাই বিবাহ-ডিভোর্স মানুষের পছন্দ-অপছন্দ, ধৈর্য, চেষ্টা ইত্যাদির মাধ্যমেই ঘটে। (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৫০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৫০)
তাই ডিভোর্স বা দ্বিতীয় বিবাহ কাউকেই হতাশ বা অপরাধী করে না; বরং প্রতিটি ঘটনায় আল্লাহর হিকমত ও পরীক্ষা আছে।
৫. স্ত্রী স্বামীকে চায় ও দোয়া করে, অথচ স্বামী হঠাৎ তালাকের নোটিশ পাঠায়—এটা কি অন্যায়?
উত্তর:
হ্যাঁ, এটা অন্যায় ও গুনাহের কাজ।
যদি স্ত্রী স্বামীর প্রতি অনুগত হয়, কোনো অসৎ আচরণ না করে, বরং তাকে ভালোবাসে ও দোয়া করে, তাহলে অকারণে তালাক দেওয়া মাকরূহে তাহরীমি (ঘৃণিত) এবং গুনাহ। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০১৪৪; তিরমিযী, ১১৮৭)
রাসূল ﷺ বলেন:
“আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণিত হালাল কাজ হল তালাক।” (আবু দাউদ, ২২২০)
যদি স্বামী নিজের আবেগ বা ভুল বুঝাবুঝির কারণে তালাক দিয়ে দেয়, তা হলে তার জন্য তওবা করা জরুরি। তবে তালাক পতিত হলে তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় (যদি ৩ তালাক হয়ে যায়)।
৬. তাকদীরের পরিপ্রেক্ষিতে ডিভোর্স ও দ্বিতীয় বিবাহের ব্যাখ্যা
সংক্ষেপে:
- তাকদীরে আল্লাহ পূর্বেই জানেন কে কাকে বিয়ে করবে, কখন ডিভোর্স হবে, কখন দ্বিতীয় বিয়ে হবে।
- তবে মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী। কারণ, আল্লাহ মানুষের ইচ্ছা ও পছন্দকে কাজে লাগিয়েই তা ঘটান।
- ডিভোর্স বা দ্বিতীয় বিবাহকে মেনে নেওয়াই ঈমানের দাবি। এর জন্য হতাশ না হয়ে ধৈর্য ও তওবা করা কর্তব্য।
সারসংক্ষেপ:
- স্বামী স্পষ্ট “৩ তালাক” লিখলে বা বললে ৩ তালাক পতিত হবে, খোলা কাবিন থাকলেও।
- খোরপোষ না দিয়ে তালাক দিলে গুনাহ হবে, তবে তালাক বৈধ থাকবে।
- ইদ্দতের নিয়ম: তিন মাসিক চক্র বা সন্তান জন্ম পর্যন্ত।
- তাকদীরে সব লেখা আছে, কিন্তু মানুষের ইচ্ছা ও কর্মও সত্য।
- স্ত্রী চাইলেও স্বামী অকারণে তালাক দিলে গুনাহগার হবে।
- ডিভোর্স ও দ্বিতীয় বিবাহ তাকদীরের অংশ হলেও এর জন্য ব্যক্তি দায়ী।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।
وَاللهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ