হানাফি মতে বিয়ের আগে আংটি পরানোর বিধান
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ইসলামী শরীয়তে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক চুক্তি। এর জন্য কিছু সুন্নাত ও শর্ত রয়েছে। আপনি বিয়ের আগে পাত্রীকে আংটি পরানো ও বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন। নিম্নে হানাফি ফিকহের আলোকে এর বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:
১. বিয়ের আগে আংটি পরানো বা উপহার দেওয়া:
ইসলামে বিয়ের আগে পাত্রী বা পাত্রকে আংটি বা অন্য কোনো উপহার দেওয়া জায়েজ। এটি খিতবা (বাগদান)-এর অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এটিকে সুন্নাত বা বাধ্যতামূলক কিছু মনে করা ঠিক নয়। শরীয়তে বিয়ের বৈধতার জন্য শুধু ইজাব-কবুল (প্রস্তাব-স্বীকৃতি), সাক্ষী ও মাহর ধার্য করা আবশ্যক; আংটি পরানো এগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়।
-
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে: বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর পাত্রীকে কোনো উপহার দেওয়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) হতে পারে, তবে এটি বিয়ের রুকন বা শর্ত নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫; ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/২৮৯)
-
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের কন্যাদের বিয়েতে মাহর ছাড়া অন্য কোনো নির্দিষ্ট উপহারের নিয়ম করেননি। তবে সাহাবায়ে কেরাম বিয়ের আগে-পরে উপহার দিতেন। (বুখারী, মুসলিম)
-
শর্ত: আংটি পরানোর সময় যদি পর্দা লঙ্ঘন (নামাহরমের সঙ্গে একান্তে দেখা-সাক্ষাৎ) বা গায়রে মাহরামের সঙ্গে হাত ছোঁয়ার মতো হারাম কাজ না হয়, তবে তা জায়েজ। কিন্তু বর্তমানে অনেক জায়গায় এই অনুষ্ঠানে গান-বাজনা, অশ্লীলতা ও বেপর্দা হয়ে থাকে, যা সম্পূর্ণ হারাম। তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
সারসংক্ষেপ: বিয়ের আগে পাত্রীকে আংটি পরানো জায়েজ; কিন্তু এটি সুন্নাত নয়। বরং এটি একটি প্রচলিত রীতি মাত্র। এর কোনো বিশেষ ফজিলত বা গুরুত্ব ইসলামে নেই।
২. বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করা:
বিয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন-তারিখ ঠিক করা জায়েজ এবং বাস্তবসম্মত প্রয়োজন। তবে শরীয়তে এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন বা তারিখ নির্ধারিত নেই। যেমন: শুক্রবার, সোমবার বা কোনো বিশেষ মাসকে বিয়ের জন্য বেশি পছন্দ করা যায়, কিন্তু তা ফরজ বা ওয়াজিব নয়।
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বিয়ের জন্য কোনো বিশেষ সময় নির্ধারণ করা সুন্নাত নয়; বরং যে কোনো পবিত্র ও সুবিধাজনক সময়ে বিয়ে করা যায়। (আল-হিদায়া, ২/৩০০)
-
তবে কিছু দিন (যেমন: জুমার দিন) বিয়ে করাতে বাড়তি সওয়াব আছে বলে কিছু বর্ণনা রয়েছে, কিন্তু তা গ্রহণ করা মুস্তাহাব, আবশ্যক নয়। (ফতোয়া উসমানী, ২/১২৩)
সতর্কতা: বিয়ের তারিখ ঠিক করার সময় নক্ষত্র, গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব, শুভ-অশুভ সময় ইত্যাদি মানা শিরক বা কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে। ইসলামে এগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (সূরা আল-ইমরান: ১৬৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২১৭)
৩. ইসলামী বিয়ের সহিহ পদ্ধতি:
ইসলামী শরীয়তে বিয়ে বলতে যা বোঝায়:
- ইজাব-কবুল: পাত্রী/অভিভাবকের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এবং পাত্রের পক্ষ থেকে গ্রহণ।
- দুইজন মুসলিম পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুই নারী সাক্ষী।
- মাহর ধার্য করা (যা পাত্রীকে দিতে হবে)।
- প্রস্তাব ও গ্রহণ একই মজলিসে হওয়া।
এগুলো বিয়ের শর্ত ও রুকন। এগুলো ছাড়া বিয়ে সহিহ হয় না। আংটি পরানো, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, মেহেদী দেওয়া ইত্যাদি কেবল রীতি-প্রথা; এসব কোনোভাবেই বিয়ের অংশ নয়।
- রদ্দুল মুহতার (৩/৩): বিয়ের বৈধতার জন্য ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও মাহর ছাড়া অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই।
- বাহেশতি জেওর (পার্ট ২, বিবাহ অধ্যায়): বিয়ের আগে কোনো অনুষ্ঠান করা জরুরি নয়; তবে উপহার দেওয়া-নেওয়া জায়েজ।
৪. উপসংহার:
- আংটি পরানো: জায়েজ (সুন্নাত নয়), তবে পর্দা ও শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
- দিন-তারিখ ঠিক করা: জায়েজ ও বাস্তবসম্মত; কোনো নির্দিষ্ট দিন আবশ্যক নয়।
- সুন্নাত সম্মত বিয়ে: শুধু ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও মাহর দিয়ে সম্পন্ন হয়; আগে-পরে কোনো অনুষ্ঠান বিয়ের অংশ নয়।
রেফারেন্সসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৩/৫৫, ৩/৩
- ফতোয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): ১/২৮৯
- আল-হিদায়া (মারগীনানী): ২/৩০০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মোহাম্মদ শফী): ৪/২১৭
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): বিবাহ অধ্যায়
- ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): ২/১২৩
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন। (আমিন)