ইসলামে শর্তযুক্ত দান (হেবা বিল শর্ত) জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
কোন মহিলা পালক পুত্রকে বড় করে ভবিষ্যতের জন্য তার সম্পত্তি এই অর্থে দলিল করে দিতে চায় মরার আগ পর্যন্ত সে মালিক মারার পর ওই ছেলে মালিক হবে,এই রকম দলিল কি ইসলামে নাজায়েজ হবে? মহিলার মা , স্বামী, সহোদর ২ বোন রাজি, তবে বাবা বেঁচে নেই,২ সৎ ভাই আছে
Answer
উত্তর: আসসালামুআলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ
প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর করা ইসলামী শরীয়তে জায়েয নয়। কারণ এটি একটি শর্তযুক্ত দান (হেবা বিল শর্ত), যা হানাফী ফিকহে বাতিল গণ্য হয়। নিচে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা পেশ করা হলো:
১. শরীয়তের মূলনীতি:
ইসলামী আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য স্পষ্ট ও শর্তহীন দলিল (হেবা) অথবা উইল (ওসিয়ত) বৈধ। কিন্তু কোনো শর্তে দান করা (যেমন: দাতার মৃত্যুর পর মালিকানা কার্যকর হবে) কেবলমাত্র উইলের মাধ্যমেই সম্ভব। উইল না করে দানপত্রে মৃত্যুর শর্ত যুক্ত করলে তা বাতিল হয়ে যায়।
২. হানাফী ফিকহের রায়:
-
রদ্দুল মুহতার (৪/৪৭৫) -এ উল্লেখ আছে:
"যদি কেউ বলে, 'আমি তোমাকে এই সম্পত্তি দিলাম, কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে তুমি এর মালিক হবে না, আমার মৃত্যুর পর মালিক হবে', তবে এটি হেবা নয়; বরং এটি একটি বাতিল শর্তযুক্ত দান। কারণ হেবা অবশ্যই তৎক্ষণাৎ কার্যকরী হতে হবে।" -
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৪/৩৮০) -তে বলা হয়েছে:
"দানের সময় মালিকানা স্থানান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত দান সম্পূর্ণ হয় না। মৃত্যুর সাথে মালিকানা শর্তযুক্ত করলে তা ওসিয়াতের মতো গণ্য হবে, কিন্তু সেটি ওসিয়াতের নিয়ম অনুযায়ী পালনীয়।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৩) -তে শায়খুল ইসলাম মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
"মৃত্যুর পর মালিকানা হওয়ার শর্ত দিয়ে দান করলে তা দান নয়; বরং এটি একটি ওসিয়াত (উইল)। তবে ওসিয়াতের জন্য তিনটি শর্ত জরুরি: (১) সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি না হওয়া, (২) ওয়ারিসদের অনুমতি থাকা, (৩) ওয়ারিসদের জন্য ওসিয়াত না করা।"
قال في الدر في آخر کتاب الہبة في فصل مسائل متفرقة․․․ وہب دارا علی أن یرد علیہ شیئا منہا ولو معینا کثلث الدار أو ربعہا أو علی أن یعوض فی الہبة والصدقة شیئا عنہا صحت الہبة وبطل الاستثناء فی الصورة الأولی و بطل الشرط فی الصور الباقیة؛ لأنہ بعض أو مجہول والہبة لا تبطل بالشروط․ قال الشامي قولہ شیئًا عنہا أي شیئًا مجہولاً․ (الدر مع الرد: ۴/۵۸۰رشیدیہ کوئٹہ)
হ্যাঁ যদি সেই মহিলা তার সমূদয় সম্পত্তি সেই পালক পুত্রকে এখনই হস্তগত করে দিয়ে দেয়, এবং পালক পুত্রের নামে দলিল করে দেয়, সেক্ষেত্রে ওই মহিলার শর্তটি বাতিল বলে গণ্য হবে, আর সম্পত্তির পুরো মালিকানা সেই পালক পুত্রের হবে।
তবে ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে এ কাজ জায়েজ হবেনা।
৩. পালক পুত্রের ক্ষেত্রে বিধান:
- ইসলামে পালক পুত্র ওয়ারিস নয়। তাই তাকে সম্পত্তি দিতে চাইলে ওসিয়াত করা যেতে পারে, তবে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয় (সূরা নিসা: ১১-১২, সহিহ বুখারি: ২৭৪২)।
- প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে (মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মালিক না হওয়া) পুরো সম্পত্তি দান করা হলে তা বাতিল হবে। কারণ:
- এটি হেবা নয় (শর্তযুক্ত)।
- এটি ওসিয়াতও নয় (কারণ ওসিয়াতের জন্য মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিধান আছে, কিন্তু এখানে দানপত্রে সরাসরি মালিকানা দেওয়া হচ্ছে না)।
উল্লেখ্য, উক্ত মহিলার যদি কোনো ওয়ারিশ থাকে,সেক্ষেত্রে ওয়ারিশদেরকে বঞ্চিত করে এভাবে সমূদয় সম্পত্তি পালক পুত্রকে দেয়া কোনো ছুরতেই জায়েজ হবেনা।
৪. সঠিক পদ্ধতি:
যদি মহিলা তার পালক পুত্রকে সম্পত্তি দিতে চান, তাহলে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
- সরাসরি দান (হেবা): জীবিত অবস্থায় সম্পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর করে দিন। এতে কোনো শর্ত নেই।
- ওসিয়াত: মৃত্যুর পর তাকে সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে যাওয়ার উইল করুন।
- ওয়ারিসদের অনুমতি: যদি ওয়ারিসরা অনুমতি দেয়, তাহলে পুরো সম্পত্তি দান করলেও তা বৈধ হবে (সুরা নিসা: ১৭৬)।
৫. কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
- সূরা নিসা (৪:১৭৬): "তোমাদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন..." এখানে ওয়ারিসদের অধিকার নির্ধারিত আছে। পালক পুত্র ওয়ারিস নয়, তাই তাকে ইচ্ছেমতো দান করা যাবে, তবে ওয়ারিসদের অধিকার নষ্ট করে নয়।
- হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের ওয়ারিসদের জন্য এক তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়াত করো না। এক তৃতীয়াংশও অধিক।" (সহিহ বুখারি: ২৭৪২)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতি (মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মালিক না হওয়ার শর্তে দলিল) নাজায়েজ এবং বাতিল। এ ধরনের দলিল করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। বরং সরাসরি হেবা অথবা ওসিয়াত এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করুন।
উল্লেখ্য, উক্ত মহিলার যদি কোনো ওয়ারিশ থাকে,সেক্ষেত্রে ওয়ারিশদেরকে বঞ্চিত করে এভাবে সমূদয় সম্পত্তি পালক পুত্রকে দেয়া কোনো ছুরতেই জায়েজ হবেনা। হ্যাঁ যদি তার সকল ওয়ারিশ সন্তুষ্টি চিত্তে রাজী হয়,তাহলে এটি উপরোক্ত সহীহ নীতিমালা ফলো করলে বৈধ হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।