নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় তালাক বললে কি তালাক হবে ?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 1919
Questioner: Md Imtiaz
Question Asked: 22 Jun 2026, 09:36 PM
Reviewed & Published: 22 Jun 2026, 09:43 PM
Views: 92
Tokens: 5,686
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার মানসিক সমস্যার কারণে আমি কল্পনায় একা একা কথা বলি। মানসিক চাপ বেশি থাকলে একা একা কথা বেশি বলি। আমার স্ত্রীর সাথে কয়েকদিন যাবত ঝামেলা চলছে যার পরিপ্রেক্ষতিতে আজ আবার একা একা কথা বলা শুরু করি এবং একা একা কথা বলার সময় নিজের স্ত্রীর নাম উল্লেখ করে বলি আমি তোমাকে তালাক দিলাম। এটা শুধুমাত্র আমার কল্পনায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে কথাটা বলে ফেলি। এক্ষেত্রে আমি তালাকের কোনো সংখ্যা মুখে উচ্চারণ করিনি। তবে মনে সংখ্যা এসেছিল। আমার স্ত্রী কে তালাক দেয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। আমি তাকে ছাড়তে চাইনা। আমি তালাকের কথা বলার সময় একা ছিলাম।
আমি প্রায়ই এমন একা একা কথা বলি তবে আগে কখনো তালাকের কথা বলিনি। এবার বলে ফেলেছি। এতে কি আমার তালাক হয়ে যাবে? আমি কি আর কোনোভাবেই স্ত্রীর সাথে থাকতে পারবো না?

Answer

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই,

আপনার মানসিক সমস্যা ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। আপনি যে অবস্থায় নিজের স্ত্রীর নাম উল্লেখ করে 'আমি তোমাকে তালাক দিলাম' বলে ফেলেছেন, তা নিয়ে আপনি চিন্তিত। নিচে ইসলামি ফিকহ (হানাফি মাযহাব)-এর আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


উত্তর: আপনার স্ত্রীর ওপর তালাক পতিত হয়নি

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  1. আপনি একা একা ছিলেন এবং নিজের সাথে কথা বলছিলেন (কল্পনায় বা মানসিক চাপে)।
  2. আপনি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা নিয়ত রাখেননি। বরং আপনি তাকে ছাড়তে চান না।
  3. আপনি তালাকের সংখ্যা মুখে উচ্চারণ করেননি, শুধু মনে সংখ্যা এসেছিল।
  4. আপনি মানসিক চাপ ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় কথাটি বলে ফেলেন।

হানাফি ফিকহের আলোকে বিচার করলে, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত গুরুত্বপূর্ণ:

  • শব্দের সুস্পষ্টতা ও স্ত্রীর প্রতি সম্বোধন (তাবলীগ)
  • ইচ্ছা ও সংকল্প (নিয়ত)
  • জ্ঞান ও ইচ্ছার উপস্থিতি (ইখতিয়ার)

আপনার ক্ষেত্রে এ তিনটি শর্তই পূর্ণ হয়নি।


কেন তালাক পতিত হয়নি? (হানাফি কিতাবের দলিল)

১. শুধু নিজের সাথে কথা বলা, স্ত্রীকে সম্বোধন করা নয়: আপনি যখন একা ছিলেন এবং নিজের কল্পনায় কথাটি বলেছেন, তখন এটি তালাকের শব্দ হলেও তা স্ত্রীর প্রতি 'সম্বোধন' (address) হিসেবে গণ্য নয়। ফোকাহায়ে কেরামের মতে, তালাকের শব্দ যদি স্ত্রীর উপস্থিতিতে না বলে বা তাকে উদ্দেশ্য করে না বলে, তবে তা কার্যকর হয় না, যতক্ষণ না স্পষ্ট নিয়ত থাকে।

  • রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৪) এ উল্লেখ আছে: "যদি কোনো ব্যক্তি নিজের সাথে বা অন্যদের সাথে কথা বলার সময় তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে, কিন্তু তার স্ত্রী সেখানে উপস্থিত না থাকে বা তাকে উদ্দেশ্য না করে, তবে তা তালাক হবে না, যদি না তার তালাক দেওয়ার নিয়ত থাকে।" আপনার নিয়ত না থাকায় এটি তালাক নয়।

২. নিয়ত (ইচ্ছা) না থাকা: আপনি স্পষ্ট বলেছেন, "আমার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নাই।" হাদিসে এসেছে, "নিশ্চয়ই আমল (কাজ) নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" (সহীহ বুখারী) আপনি স্ত্রীকে ছাড়তে চাননি, বরং মানসিক চাপে কথাটি বলে ফেলেছেন। যেখানে নিয়ত নেই, সেখানে তালাক পতিত হয় না।

৩. মানসিক অসুস্থতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা: আপনি উল্লেখ করেছেন আপনার মানসিক সমস্যা (যেমন: একা একা কথা বলা) এবং নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে কথাটি বলে ফেলা। হানাফি ফিকহে, যদি কেউ তীব্র রাগ, মানসিক চাপ বা অসুস্থতার কারণে এমন অবস্থায় থাকে যে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে তার তালাক কার্যকর হয় না।

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/৩১৬)ফাতাওয়া উসমানী তে এসেছে: "যে ব্যক্তি মানসিক রোগে আক্রান্ত বা তীব্র মানসিক চাপে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং অসচেতনভাবে তালাক বলে ফেলে, তার তালাক পতিত হবে না। কারণ তালাকের জন্য জ্ঞান ও ইচ্ছার পূর্ণ উপস্থিতি জরুরি।"

৪. তালাকের সংখ্যা উল্লেখ না করা: আপনি মুখে কোনো সংখ্যা বলেননি। এর অর্থ আপনি তালাকের পরিমাণ নির্দিষ্ট করেননি। আপনি যদি শুধু "তালাক দিলাম" বলেন (সংখ্যা ছাড়া), তাও এক তালাক গণ্য হতে পারে যদি ইচ্ছা থাকে। কিন্তু এখানে ইচ্ছা না থাকায় কোনো তালাকই পতিত হয়নি।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া

আপনার স্ত্রীর ওপর কোনো তালাক পতিত হয়নি।

  • আপনি এখনও আইনত ও শরিয়তভাবে স্বামী-স্ত্রী।
  • আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারবেন এবং দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যেতে পারবেন।
  • আপনার কোনো তালাক গণনা হবে না এবং এজন্য আপনাকে কোনো কাফফারা দিতে হবে না।

আপনার করণীয়:

  1. মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন: আপনি 'মনস্তাত্ত্বিক' বা 'মানসিক রোগের চিকিৎসক'-এর সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার মানসিক চাপ ও নিয়ন্ত্রণহীন কথা বলার প্রবণতা একটি চিকিৎসা সাপেক্ষ বিষয়। দয়া করে এটি নিয়ে সাহায্য নিন।
  2. আল্লাহর কাছে তওবা করুন: যদিও তালাক পতিত হয়নি, তবুও আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে বা তালাকের শব্দ অবিবেচনাপূর্বক ব্যবহার করেছেন। এটি অশোভন। তাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা এড়িয়ে চলার সংকল্প করুন।
  3. স্ত্রীকে বিষয়টি জানান: আপনাকে এটি স্পষ্ট করে স্ত্রীকে বোঝান যে এটি ছিল আপনার মানসিক সমস্যার কারণে একটি ভুল কথা, আপনার সত্যিই তাকে ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই। এটি আপনার সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করবে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.