স্বামীর সম্মতিক্রমে স্ত্রী কর্তৃক তালাক প্রদান ইসলামী শরীয়তে শুদ্ধ কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার স্বামী এবং তার পরিবারের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আমি ২মাস যাবত আমার মায়ের সঙ্গে আছি,ওনারা অনেক যেতে বলেছে কিন্তু আমি যাইনি তার অনেক গুলো কারণের একটি হলো আমার স্বামী পূর্বের স্ত্রী বর্তমানে থাকা অবস্থায় গোপন রেখে আমাকে বিয়ে করে এবং মানসিক অত্যাচার করে
আমি তার কাছে যেতে চাইনি তারপর থেকে তারা একাধিক বার জানিয়েছেন যেন আমি আমার পক্ষ থেকে ডিভোর্স পেপার পাঠাই তাতে ওরা রাজি এবং সিগনেচার করে দিবে
আমি কাজী অফিসের মাধ্যমে স্ত্রী কর্তৃক তালাক প্রদানের নিয়মে পেপার পাঠিয়েছি যেহেতু আমার স্বামীর সম্মতি এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে পাঠানো হয়েছে সেহেতু এটা কি ইসলামি শরীয়ত মতে তালাক শুদ্ধ হয়েছে কিনা ?জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার পূর্বে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি উল্লেখ করছি:
ইসলামী শরীয়তে তালাকের মূলনীতি: ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তালাক দেওয়ার ক্ষমতা মূলত স্বামীর হাতে। তবে স্ত্রীও নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিতে তালাক নিতে পারেন, যেমন:
- খুলা (خلع): স্ত্রী স্বামীকে কিছু অর্থ (মোহর বা অন্যান্য) প্রদানের বিনিময়ে তালাক গ্রহণ করে। এতে স্বামীর সম্মতি আবশ্যক।
- মোবারাআত (مبارأة): উভয় পক্ষ পারস্পরিক সম্মতিতে কোনো বিনিময় ছাড়া বা নির্ধারিত বিনিময়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করে।
- তালাকে তাফভীয (تفويض الطلاق): স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করে থাকে, তবে স্ত্রী নিজের উপর তালাক প্রয়োগ করতে পারে।
- কাযীর মাধ্যমে তালাক: আদালত বা কাযী নির্দিষ্ট কারণে (যেমন স্বামীর অক্ষমতা, নির্যাতন, খোরপোষ না দেওয়া ইত্যাদি) স্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিবাহ বিচ্ছেদ করি দিতে পারবে।
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনার বিশ্লেষণ:
প্রশ্নে উল্লেখ আছে যে, স্বামী ও দুই পরিবারের সম্মতিক্রমে স্ত্রী কাজী অফিসের মাধ্যমে "স্ত্রী কর্তৃক তালাক প্রদানের নিয়মে" পেপার পাঠিয়েছেন। স্বামী তাতে সই করতে রাজি আছেন।
হানাফী ফিকহের আলোকে বিধান:
১. স্বামীর সম্মতি থাকায় তালাক শুদ্ধ হবে: যেহেতু স্বামী নিজেও তালাক দিতে রাজি আছেন এবং পেপারে সই করতে সম্মত হয়েছেন, তাই এটি কার্যকরীভাবে স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে এসেছে, যদি স্বামী স্ত্রীর প্রেরিত তালাকনামায় সম্মতি জানায় অথবা সই করে, তবে তা স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক বলে বিবেচিত হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৬৪)
২. খুলা অথবা মোবারাআত হিসেবে গণ্য হতে পারে: বেশি সম্ভাবনা এটি খুলা হিসেবে গণ্য হবে। কেননা স্ত্রী নিজে পেপার পাঠিয়েছেন এবং স্বামী সম্মতি দিয়েছেন। তবে এখানে যদি কোনো অর্থের বিনিময় (যেমন মোহর ফিরিয়ে দেওয়া) না থাকে, তবে তা মোবারাআত হবে। উভয় অবস্থায় তালাক পতিত হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮০; বেহেশতি জেওর, ৬/২৭)
৩. তালাক পতিত হওয়ার শর্ত: তালাক তখনই পতিত হবে যখন স্বামী সজ্ঞান ও স্বেচ্ছায় সম্মতি দেন। প্রশ্নে বলা হয়েছে "স্বামীর সম্মতি এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে" পাঠানো হয়েছে। যদি স্বামী কোনো প্রকার জবরদস্তি বা চাপ ছাড়া নিজ ইচ্ছায় সম্মত হন, তবে তালাক পতিত হবে এবং তা শুদ্ধ হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: উল্লেখিত "মানসিক অত্যাচার" এবং "প্রথম স্ত্রী গোপন রাখা" বিষয়গুলো নৈতিক ও আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ। স্বামী এতে গুনাহগার হবে। তবে এটি তালাকের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না। তালাক পতিত হওয়ার পর স্ত্রীকে ইদ্দত (তিন হায়েয বা তিন মাস) পালন করতে হবে।
উপসংহার:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, যেহেতু আপনার স্বামী নিজেও তালাক দিতে রাজি আছেন এবং তার সম্মতিক্রমে কাজী অফিসের মাধ্যমে পেপার পাঠানো হয়েছে, যেহেতু কাজী অফিস তালাক আইনের নিয়ম ও পদ্ধতি মেনেই তালাক নামা প্রেরণ করে থাকে, তাই ইসলামী শরীয়ত মতে এই তালাক শুদ্ধ হয়েছে। আপনার এবং আপনার স্বামীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। এখন আপনাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। ইদ্দত শেষে আপনি অন্যত্র বিবাহ করতে পারবেন।
বিঃদ্রঃ স্ত্রী নিজের উপর তালাক নিতে পারে, স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। কাজেই তালাক নামার যেই কাগজ প্রেরণ করা হয়েছে, সেই কাগজ আবার যাচাই-বাচাই করে নিবেন, যদি সেখানে স্বামীকে তালাক দেয়া হয়, তাহলে সংশোধন করে কাগজটি দ্বিতীয়বার প্রেরণ করে নিবেন। এবং সেখানে লিখে দিবেন যে, স্ত্রী নিজের উপর তালাক নিতে চাচ্ছে, স্বামীর অনুমতি কামনা করা হচ্ছে।
والله أعلم بالصواب