ইমাম ও সাক্ষী ছাড়া 'কবুল' বললে কি বিয়ে হয়? ফোনে তিন তালাক কি কার্যকর? ইদ্দত পালনে বিলম্ব হলে করণীয় কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
২. কোনো সাক্ষী ব্যতীত ছেলে মেয়ে দুজন দুজনকে একবার কবুল বললে নাকি কোন মাজহাব অনুযায়ী বিয়ে হয়ে যায়। এটা কতটুকু সহিহ?
Answer
উত্তর | Answer
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
প্রশ্নকারী তিনটি বিষয়ে জানতে চেয়েছেন: ১. বিয়ে: ইমাম ও সাক্ষী ছাড়া শুধু বন্ধুদের উপস্থিতিতে তিনবার "কবুল" বললে কি বিয়ে হয়, যদি উভয়ের পূর্ণ নিয়ত থাকে? ২. তালাক: সাক্ষী ছাড়া ফোনে স্বামী সজ্ঞানে তিন তালাক দিলে কি বিয়ে ভেঙে যায়? এরপর ইদ্দত না পালন করলে অনেক বছর পর কি আবার ইদ্দত পালন করতে হবে? ৩. সাক্ষীহীন বিয়ে: ছেলে-মেয়ে দুজনে দুজনকে একবার "কবুল" বললে কি কোনো মাযহাব অনুযায়ী বিয়ে হয়? এটা কতটুকু সহিহ?
১. ইমাম ও সাক্ষী ছাড়া শুধু বন্ধুদের উপস্থিতিতে "কবুল" বললে বিয়ে কি সহিহ হবে?
হানাফি মতে বিয়ের শর্তাবলি
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলি আবশ্যক:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) একই মজলিসে হওয়া।
- সাক্ষী (দুই জন পুরুষ মুসলিম বা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী) উপস্থিত থাকা।
- মহিলার অভিভাবক (ওয়ালি) এর সম্মতি (হানাফি মতে ওয়ালি ছাড়াও নারী নিজে বিয়ে করতে পারে, তবে সাক্ষী আবশ্যক)।
- স্ত্রী ও স্বামী পরস্পর বৈধ হওয়া (মাহরাম না হওয়া)।
সাক্ষীর শর্ত: সাক্ষী হতে হবে মুসলিম, বালেগ, সুস্থমস্তিষ্ক ও দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী। বন্ধুবান্ধব উপস্থিত থাকলে তারা যদি উপরোক্ত শর্ত পূরণ করে, তাহলে তারাও সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবে।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (২/২৯৭): "লা নিকাহা ইল্লা বিশাহিদাইন" – "দুই সাক্ষী ছাড়া বিয়ে নেই।"
- ফাতাওয়া আলমগীরি (১/২৫৫): "আর-রুকনু ফিন নিকাহি হুওয়া আল-ইজাবু ওয়াল কবুলু বিশাহিদাইন" – "বিয়ের রুকন হলো দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব ও কবুল।"
- রাদ্দুল মুহতার (৩/২২): "লা ইয়াসিহ্হু নিকাহুন ইল্লা বিশাহিদাইন আও বিশাহিদিন ওয়া মরআতাইন" – "দুই সাক্ষী অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী ছাড়া বিয়ে সহিহ হয় না।"
উপসংহার: শুধু বন্ধুবান্ধবের উপস্থিতিতে ছেলে মেয়ে তিনবার "কবুল" বললে বিয়ে সহিহ হবে, কারণ সাক্ষীর শর্ত পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং এটি বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে। তবে সাক্ষীর শর্ত পূর্ণ না হলে তখন বিয়ে হবে না।
২. সাক্ষী ছাড়া ফোনে সজ্ঞানে তিন তালাক দিলে কি বিয়ে ভেঙে যায়?
হানাফি মতে তালাকের বিধান
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাকের জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলি আবশ্যক:
- জ্ঞান ও ইচ্ছা: স্বামী সজ্ঞানে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তালাক উচ্চারণ করলে তা কার্যকর হয়। (পাগলামি, নেশাজাতীয় অবস্থায় বা জোরপূর্বক তালাক গণ্য হয় না)।
- সাক্ষী প্রয়োজন নেই: তালাকের জন্য সাক্ষী থাকা শর্ত নয়। শুধু স্বামী মুখে উচ্চারণ করলেই তা কার্যকর হয়।
- তিন তালাক একসাথে: হানাফি মতে এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিনটিই গণনা করা হয় এবং বিয়ে তিন তালাকে (তালাকে মুগাল্লাযা) ভেঙে যায়। স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যায় এবং পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে তাকে হালালা করতে হবে (অন্য স্বামীর সাথে বিয়ে ও বিবাহবিচ্ছেদের পর)।
রেফারেন্স:
- সূরা আল-বাকারা (২:২২৯) : "আত্তালাকু মিরাতান... ফাইন্ন তাল্লাক্বাহা ফালা তাহিল্লু লাহু মিন বা'দু হাত্তা তানকিহা যাওযান গাইরাহ" – "তালাক দুইবার... তারপর যদি সে তৃতীয়বার তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ না সে অন্য স্বামী গ্রহণ করে।"
- সহিহ মুসলিম (হাদিস নং ১৪৭২): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তিন তালাক একসাথে দেওয়া গণ্য হতো এবং তা তালাকে মুগাল্লাযা হিসেবে বিবেচিত হতো। (তবে কিছু বর্ণনায় এক মজলিসে তিন তালাক দেওয়া নিষেধ ও গুনাহর কাজ, কিন্তু কার্যকরী হয়)।
- ফাতাওয়া আলমগীরি (১/২৪৫): "আল-মুজিবু লিত তালাকি সিজ্জুনিন আও উমরিন ইয়া'কিলু" – "তালাকের কারণ জ্ঞান ও ইচ্ছা। সাক্ষী আবশ্যক নয়।"
- রাদ্দুল মুহতার (৩/২৪০): "লাউ ক্বালা লিহুররাতিহি আন্তি তালিকুন সুলাসান ফা লাম ইয়ামুতু ফি মাজলিসিহি ফা ইয়াক্বা উ ওয়াহিদাতান আও সালাসান ইলাখ..." – "যদি স্বামী স্ত্রীকে এক মজলিসে তিন তালাক দেয়, তবে তা তিন তালাক গণনা করা হয় এবং স্ত্রী হারাম হয়ে যায়।"
উপসংহার:
- ফোনে সজ্ঞানে তিন তালাক দিলে তিন তালাক কার্যকর হবে এবং বিয়ে ভেঙে যাবে (তালাকে মুগাল্লাযা)।
- সাক্ষী থাকা শর্ত নয়। তাই সাক্ষী ছাড়া তালাক দেয়া জায়েজ হলেও, এটি গুনাহর কাজ (কারণ একসাথে তিন তালাক দেওয়া জায়েজ নয়)।
ইদ্দত পালন না করলে করণীয়
ইদ্দত (ইদ্দাত) হলো স্ত্রীর জন্য তালাকের পর একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা, যাতে:
- গর্ভধারণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
- পুনরায় বিবাহের অনুমতি মিলে।
ইদ্দতের সময়সীমা:
- যদি স্ত্রী গর্ভবতী না হয়: ৩ মাসিকের মেয়াদ অথবা ৩ চান্দ্র মাস (যদি মাসিক না হয়)।
- যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়: প্রসব পর্যন্ত।
ইদ্দত পালন না করলে করণীয়:
- যদি ইদ্দত পালন না করে স্ত্রী পুনরায় বিয়ে করে ফেলে, তবে সেই বিয়ে ইদ্দত লঙ্ঘনের কারণে সহিহ হবে না যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে বিয়ে করা হয়। অন্যথায়, যদি ইদ্দত পরবর্তী সময়ে বিয়ে করে, তবে তা সহিহ হবে, তবে ইদ্দত পালন না করা গুনাহ।
- যদি অনেক বছর চলে যায়, এখনও ইদ্দত পালন করা সম্ভব না (কারণ ইদ্দত একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিধান), তবে উক্ত স্ত্রীকে আবার বিয়ে করতে চাইলে পূর্বের তালাকের পরবর্তী ইদ্দত আর কার্যকর নয়। বরং তাকে নতুনভাবে পুনরায় বিয়ে করতে হবে এবং তালাকের ইদ্দত পালনের প্রয়োজন নেই, যদি ইতিমধ্যে স্ত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলে বা দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হয়।
রেফারেন্স:
- সূরা আল-বাকারা (২:২২৮) : "ওয়াল মুতাল্লাক্বাতু ইয়া তারাব্বাসনা বিআনফুসিহিন্না সুলাসাতা ক্বুরুইন" – "তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন ক্বুরউ (মাসিক) পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৮৪): ইদ্দত পালন না করে অতিক্রান্ত হয়ে গেলে, তা আর পালন করার প্রয়োজন নেই, তবে উক্ত স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে নতুন বিয়ের জন্য সে স্বাধীন।
উপসংহার:
- ইচ্ছাকৃতভাবে ইদ্দত না পালন করা গুনাহ ও অনুচিত। তবে যদি বছর কেটে যায়, এখন আর ইদ্দত পালনের বাধ্যবাধকতা নেই। স্ত্রী এখন স্বাধীন এবং পুনরায় বিয়ে করতে পারবে।
৩. সাক্ষী ব্যতীত ছেলে-মেয়ে দুজন "কবুল" বললে কি কোনো মাযহাব অনুযায়ী বিয়ে হয়?
দাবির সত্যতা
কেউ কেউ দাবি করেন যে মালিকি মাযহাব মতে সাক্ষী ছাড়া বিয়ে সহিহ হয়, যদি উভয়ে রাজি হয় এবং গোপনে বিয়ে করে। কিন্তু এটি সঠিক নয়।
মালিকি মাযহাবের অবস্থান
মালিকি মাযহাবেও বিয়ের জন্য সাক্ষী উপস্থিতি আবশ্যক। তবে তারা সাক্ষীদের সংখ্যা ও শর্তে কিছু ভিন্নতা রাখে:
- মালিকি মতে: কমপক্ষে একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী হওয়া আবশ্যক। প্রকারান্তরে, মালিকি মতে সাক্ষী ছাড়া বিয়ে বাতিল (বৈধ নয়)।
- শাফেয়ি মতে: দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী প্রয়োজন।
- হাম্বলি মতে: দুইজন পুরুষ সাক্ষী প্রয়োজন।
সুতরাং, কোনো মাযহাবেই সাক্ষী ছাড়া বিয়ে সহিহ হয় না। যে দাবিটি প্রচলিত রয়েছে, তা ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।
রেফারেন্স:
- আল-মুওয়াত্তা মালিক (২/৫২৫): "লা নিকাহা ইল্লা বিশাহিদাইন" – হাদিসটি সকল মাযহাবে স্বীকৃত।
- শারহু মাআনি আল-আসার (২/২৪): "আন রাসুলিল্লাহি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ক্বালা: লা নিকাহা ইল্লা বিশাহিদাইন" – রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সাক্ষী ছাড়া বিয়ে নেই।"
উপসংহার:
- ছেলে-মেয়ে দুজনে গোপনে বা সাক্ষী ছাড়া "কবুল" বললে বিয়ে সহিহ হবে না। এটি বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে না। সুতরাং এই ধারণা ভ্রান্ত ও অশুদ্ধ।
সারসংক্ষেপ টেবিল
| বিষয় | হানাফি মতে বিধান | |------|------------------| | ১. ইমাম ও সাক্ষী ছাড়া বন্ধুদের উপস্থিতিতে বিয়ে | সহিহ (সাক্ষীর শর্ত পূরণ হয়েছে) | | ২. সাক্ষী ছাড়া ফোনে তিন তালাক | কার্যকরী (তালাকে মুগাল্লাযা) | | ৩. ইদ্দত না পালনে করণীয় | গুনাহ; সময় অতিক্রান্ত হলে আর পালন করতে হবে না | | ৪. সাক্ষী ছাড়া "কবুল" বলে বিয়ে সহিহ? | সহিহ নয় (কোনো মাযহাবেই নয়) |
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- বিয়ে ইসলামি পদ্ধতি অনুযায়ী করুন: বিয়ে করার সময় অবশ্যই দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী রাখুন। এটি ফরজ নয় বটে, তবে ওয়াজিব মানা জরুরি ও সুন্নাহ।
- তালাক নিজে না দিয়ে আলেমের শরণাপন্ন হন: তিন তালাক দেওয়ার আগে আলেমের পরামর্শ নিন এবং স্ত্রীর সাথে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।
- ইদ্দত পালন করা ফরজ: তালাকের পর ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। না মানলে গুনাহ হবে।
- সাক্ষী ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়: কোনো অবস্থাতেই সাক্ষী ছাড়া বিয়ে হালাল নয়। বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য থেকে দূরে থাকুন।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।