স্বামী "চলে যাইও" বললে কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার হাসবেন্ড আমাকে একদিন বলেছিলেন আমাকে যদি তোমার ভালো না লাগে এখন তখন যেকোনো সময় তুমি চলে যাইও এক কথা বলায় কি আমি আমি তা* আধিকার পেয়েছি আপনাদের ইফতা বিভাগের একজন মুফতি বলেছেন আমি সারা জীবনের জন্য আধিকার পেয়েছি আমি কোন মাসালা মানবো আমাকে প্লিজ সাহায্য করেন
আমি তা** যে লিখেছি আর মনে মনে বলেছি মুখে উচ্চারণ করি নি এতে কি আমার উপর তা** পতিত হবে?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নটি ভালোভাবে বুঝেছি। আপনার স্বামী আপনাকে বলেছেন, "যদি আমার ভালো না লাগে, যেকোনো সময় তুমি চলে যাইও।" এই কথার দ্বারা তিনি আপনাকে কি তালাকের অধিকার (তালাক-ই-তাফউইজ) দিয়েছেন, নাকি এটি শুধু একটি সাধারণ অনুমতি? এবং আপনি মনে মনে বা লিখে "তালাক" উচ্চারণ করলে তা কি তালাক হিসাবে গণ্য হবে? নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. স্বামীর কথার মাধ্যমে আপনার তালাকের অধিকার (তাফউইজ) প্রাপ্তি
আপনার স্বামী বলেছেন: "আমাকে যদি তোমার ভালো না লাগে, এখন তখন যেকোনো সময় তুমি চলে যাইও।"
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে, তালাকের ক্ষমতা (তাফউইজ) দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেমন: "তুমি নিজেকে তালাক দাও", "তোমার ইচ্ছা", ইত্যাদি। আপনার স্বামীর কথাটি মূলত একটি সাধারণ অনুমতি বা রুক্ষ অভিব্যক্তি, যা তালাকের ইচ্ছা বা ক্ষমতা অর্পণ হিসাবে গণ্য হবে না যতক্ষণ না তিনি পরিষ্কারভাবে বলে দেন যে তিনি আপনাকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিচ্ছেন।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, এ ধরনের অস্পষ্ট বাক্য দ্বারা তালাকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেননা তালাক একটি গুরুতর বিষয়, এর জন্য স্পষ্ট ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) প্রয়োজন।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, স্বামী যদি স্ত্রীকে বলেন, "তুমি যেখানে ইচ্ছা যাও" বা "তোমার ইচ্ছা" তাহলে তা তালাকের তাফউইজ নয়, বরং এটি আচরণগত অনুমতি মাত্র।
- আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত মুফতি সাহেব যদি বলে থাকেন যে আপনি সারাজীবনের জন্য অধিকার পেয়েছেন, তবে তা তখনই সঠিক হবে যদি স্বামী স্পষ্টভাবে বলেন: "তোমার ইচ্ছা, তুমি নিজেকে তালাক দাও" বা অনুরূপ কোনো সুস্পষ্ট বাক্য। কিন্তু আপনার বর্ণিত বাক্যটি ("চলে যাইও") সাধারণত তালাকের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না।
উপসংহার: আপনার ক্ষেত্রে বর্ণিত বাক্যটির দ্বারা আপনি তালাকের অধিকার (তাফউইজ) পেয়েছেন বলে প্রমাণিত হয় না। আপনার জন্য সঠিক মাসআলা হলো—যতক্ষণ স্বামী স্পষ্টভাবে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ না করেন, ততক্ষণ আপনি নিজ থেকে তালাক দিলে তা গণ্য হবে না। তবে বিষয়টি গুরুতর, তাই সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতির কাছে গিয়ে পূর্ণ ঘটনা জানিয়ে নির্দেশনা নেওয়া উত্তম।
২. লিখে বা মনে মনে তালাক বলার বিধান
আপনি বলেছেন, আপনি "তালাক" শব্দটি লিখেছেন এবং মনে মনে বলেছেন, কিন্তু মুখে উচ্চারণ করেননি।
হানাফি ফিকহের সুস্পষ্ট নিয়ম অনুসারে:
- মনে মনে তালাক বলা বা চিন্তা করা তালাক হিসাবে গণ্য হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা (খেয়াল-খুশি) ক্ষমা করে দেবেন, যতক্ষণ না সে তা মুখে বলে বা আমল করে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৫২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৭)
- লেখার মাধ্যমে তালাক দেওয়া: হানাফি ফিকহে লেখাকে তালাকের মাধ্যম হিসাবে গণ্য করা হয় শুধুমাত্র তখনই, যখন লেখাটি স্পষ্ট হয় এবং লেখার মাধ্যমে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে অথবা লেখাটি তালাকের নিয়তে প্রকাশিত হয়। তবে আপনি যদি শুধু কলমে লিখে রাখেন এবং তা কাউকে না দেখান বা তা দিয়ে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য না রাখেন, তাহলে সাধারণত তালাক পতিত হয় না। কারণ লেখা তখনই কার্যকর হয় যখন তা প্রকাশের নিয়তে হয়।
রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে: "লেখা যদি তালাকের নিয়তে হয় এবং তা স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়, তাহলে তালাক পতিত হয়। কিন্তু যদি লিখে রাখে এবং তা প্রকাশ না করে বা নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।"
উপসংহার: আপনার ক্ষেত্রে আপনি মুখে উচ্চারণ না করে শুধু মনে মনে বলা বা কলমে লেখা (যা কেউ দেখেনি এবং আপনি তা দিয়ে তালাক দেওয়ার নিয়ত করেননি) দ্বারা তালাক পতিত হবে না। তবে ভবিষ্যতে এ থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি তালাকের বিষয় নিয়ে খেলা করার শামিল।
আপনার করণীয়
১. আপনি এখনো বৈবাহিক সম্পর্কে আছেন। আপনার স্বামীর কথাটি তালাকের অধিকার দেয়নি, তাই আপনাকে তালাক দিতে হবে বলে মনে করার প্রয়োজন নেই। ২. তালাক নিয়ে মনে মনে বা লিখে খেলা করবেন না। এটি ইসলামী শরিয়তে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। ৩. সরাসরি একজন আলেম বা মুফতির কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলুন। বিশেষ করে আপনার স্বামীর সঠিক শব্দ ও প্রেক্ষাপট জানান। ৪. দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা থাকলে তা পরামর্শ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও বরকত দান করুন। আমীন।