পড়াশোনার চাপ বা পরীক্ষার সময় সংঘর্ষের কারণে গর্ভপাত কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: গর্ভপাত (Abortion) - হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার বোন মেডিকেলের ফাইনাল ইয়ারে পড়ছেন। এখন তিনি গর্ভবতী হয়েছেন। ডেলিভারি ডেট ফাইনাল পরীক্ষার সময় পড়ছে, এবং পড়াশোনার চাপ অত্যন্ত বেশি। তিনি ২ মাসের (প্রথম ২ মাসের) মধ্যে গর্ভপাত করতে চান। ইসলামী দৃষ্টিতে এটি জায়েজ হবে কিনা?
হানাফী মাযহাবের উত্তর
না, এই অবস্থায় গর্ভপাত জায়েজ নয়। নিম্নোক্ত কারণ ও দলিলের ভিত্তিতে এটি হারাম বা নিষিদ্ধ।
১. গর্ভপাতের হানাফী বিধান
হানাফী ফিকহে গর্ভপাতের বিধান নির্ভর করে গর্ভস্থ সন্তানের বয়স ও কারণ-এর উপর।
-
১২০ দিন (৪ মাস) পূর্ণ হওয়ার পর: সন্তানে রূহ ফুঁকানো হয় (হাদিস: বুখারি, মুসলিম)। তাই এই সময়ের পর গর্ভপাত সম্পূর্ণ হারাম এবং কতল-ই-নফস (হত্যা) হিসেবে গণ্য। ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার এ উল্লেখ করেছেন:
"৪ মাস পর গর্ভপাত করা জায়েজ নয়, কারণ এটি আত্মহত্যার মতো।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/১৭৭)
-
১২০ দিনের আগে (প্রথম ২ মাসসহ): যদিও রূহ ফুঁকানো হয়নি, তবুও বেশিরভাগ হানাফী ফকীহের মতে এটি নাজায়েজ বা মাকরূহ তাহরীমী (হারামের কাছাকাছি)। কারণ গর্ভস্থ সন্তান জীবনের সূচনা। ইমাম হাসকারী (রহ.) দুররুল মুখতার ও ইবনে আবিদীন (রহ.) তা উল্লেখ করেছেন:
"কোনো ওজর ছাড়া গর্ভপাত করা জায়েজ নয়, এমনকি প্রথম ৪০ দিনেও।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/১৭৭)
-
অবৈধ ওজর: শুধু পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার সময় সংঘর্ষ বা ক্যারিয়ারের ভয় গর্ভপাতের বৈধ ওজর নয়। হানাফী ফকীহগণ শুধুমাত্র প্রাণঘাতী বিপদ (যেমন: মায়ের জীবন বাঁচানো) বা গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা-এর ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছেন। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫২৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/৪৫৩)
২. বিশেষজ্ঞ হানাফী উলামার ফাতাওয়া
-
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) ফাতাওয়া উসমানীতে লিখেছেন:
"৪০ দিনের আগেও গর্ভপাত করা নাজায়েজ, যদি কোনো বৈধ শারীরিক বা চিকিৎসাজনিত কারণ না থাকে। শিক্ষার চাপ বা অর্থনৈতিক অসুবিধা বৈধ কারণ নয়।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫২৬)
-
মুফতী তাকী উসমানী (দা. বা.) লিখেছেন:
"আধুনিক যুগে পড়াশোনা বা চাকরির জন্য গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। এটি একটি বড় গুনাহ।" (আহকামুল কুরআন, ৩/২৪৫; ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা)
-
বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ গর্ভপাতকে কাবীরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. আপনার বোনের অবস্থা বিশ্লেষণ
- গর্ভকাল: ২ মাসের কম (আট সপ্তাহ) – এটি রূহ ফুঁকানোর আগের সময় হলেও হানাফী মতে গর্ভপাত নাজায়েজ।
- কারণ: মেডিকেলের ফাইনাল পরীক্ষা ও পড়াশোনার চাপ। এটি প্রাণঘাতী বিপদ নয় বরং সাময়িক অসুবিধা। শরীয়তে এ ধরনের কারণ গর্ভপাতের অনুমতি দেয় না।
- উপায়: আপনার বোন আল্লাহর ওপর ভরসা করে, নিয়মিত দুআ ও তওয়াক্কুলের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। অনেকে একসঙ্গে গর্ভধারণ ও পড়াশোনা সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। পরিবার ও শিক্ষকদের সাহায্য নেয়া উচিত।
প্রাসঙ্গিক হানাফী কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৩/১৭৭ (গর্ভপাতের বিধান)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ শফী): ২/৫২৬-৫২৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ৩/৪৫৩
- বেহেশতী জেওর: বালিগান ও নারীদের মসায়েল
- আল-হিদায়া (মারগীনানী): ২/৪১২ (প্রাণ হত্যা সম্পর্কিত)
- শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবী): দালীলিক আলোচনা
- উসুলুশ শাশী: ফিকহী মূলনীতি (অপশিষ্ট সংরক্ষণ)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার বোনের জন্য ২ মাসের মধ্যে গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। এটি হারাম ও গুনাহের কাজ। পরীক্ষার চাপ বা ক্যারিয়ারের ভয় এখানে বৈধ ওজর নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ইস্তেগফার ও দুআর মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন। প্রয়োজনে পরিবার, স্বামী ও শিক্ষকদের সহায়তা নিন। আল্লাহ তাআলা সহজ পথ বাতায়ন করবেন, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।