স্ত্রীর ভুল সংশোধনের ইসলামী পদ্ধতি কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 1845
Questioner: Sazzad Al Haque
Question Asked: 20 Jun 2026, 05:58 PM
Reviewed & Published: 20 Jun 2026, 06:04 PM
Views: 54
Tokens: 4,646
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্ত্রীর ভুলের ক্ষেত্রে তার সাথে আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ? কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী স্ত্রীর ভুল সংশোধনের পদ্ধতি কি?

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্ন: স্ত্রীর ভুলের ক্ষেত্রে তার সাথে আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ? কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী স্ত্রীর ভুল সংশোধনের পদ্ধতি কি?

উত্তর:
স্ত্রীর ভুলের ক্ষেত্রে ইসলাম একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী স্ত্রীর ভুল সংশোধনের পদ্ধতি হলো ধাপে ধাপে, সহনশীলতা ও নম্রতার সাথে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সাধারণ নীতি: দয়া ও সহনশীলতা

ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে “আল্লাহর নিদর্শন” বলে অভিহিত করেছে (সূরা রূম, ৩০:২১)। আল্লাহ বলেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” (তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫; ইবনু মাজাহ, হাদীস: ১৯৭৭)

সুতরাং স্ত্রীর ভুলের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমা প্রদর্শন করা। রাসূল ﷺ কখনও স্ত্রীদের উপর রাগ করে মারধর করেননি। (বুখারী, হাদীস: ৬০১৮)

২. ভুল সংশোধনের কুরআনি ধাপসমূহ

আল্লাহ তাআলা সূরা নিসা (৪:৩৪) এ স্ত্রীর অবাধ্যতা (নুশূয) মোকাবিলায় তিনটি ধাপ নির্দেশ করেছেন:

وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ
“আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদেরকে উপদেশ দাও, শয্যা ত্যাগ কর এবং (শেষে) প্রহার কর।”

তবে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হানাফী ফিকাহবিদগণ ও অধিকাংশ মুফাস্সির বলেছেন: এ প্রহার অবশ্যই অ-আঘাতজনিত, হালকা ও প্রতীকী হতে হবে, যেমন মিসওয়াক বা কাপড়ের দ্বারা। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, প্রহারের অর্থ মুখমণ্ডল এড়িয়ে এমনভাবে চাপড়ানো যাতে শরীরে দাগ না লাগে বা হাড় ভাঙে না। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৪৬২; ফাতাওয়া আ’লামগীরী, ২/২৪৯)

ধাপসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

  1. উপদেশ দেওয়া (وعظ): প্রথমে নরম ভাষায় বোঝানো এবং ভুলের পরিণতি স্মরণ করানো।
  2. শয্যা পৃথক করা (هجر): যদি উপদেশ কাজ না করে, তবে কিছু সময় স্ত্রীর সাথে এক বিছানায় না শোয়া। তবে ঘর থেকে বের করে দেওয়া বা একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।
  3. হালকা প্রহার (ضرب): এটি শেষ ও শর্তযুক্ত পদক্ষেপ। শর্তসমূহ:
    • প্রহার অত্যন্ত হালকা ও বেদনাহীন হতে হবে (যেমন কাপড়ের গিট দিয়ে বা হাতের তালু দিয়ে হালকা চাপড়)।
    • মুখমণ্ডলে প্রহার করা হারাম।
    • হাড় ভাঙা, কালশিরে পড়া বা দাগ পড়া নিষিদ্ধ।
    • এ প্রহার কখনোই রাগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং সংশোধনের জন্য।
    • যদি ভুলের গুরুত্ব অল্প হয়, তবে প্রহার সম্পূর্ণরূপে পরিহার করাই উত্তম।

হাদীসের আলোকে প্রহারের ব্যাপারে সাবধানতা:
রাসূল ﷺ বলেছেন:

لَا يَجْلِدُ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ، ثُمَّ يُجَامِعُهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ
“তোমাদের কেউ যেন দাসীকে প্রহারের মতো নিজ স্ত্রীকে প্রহার না করে, অতঃপর দিনের শেষে তার সাথে (বৈবাহিক) সম্পর্ক স্থাপন করে।” (বুখারী, হাদীস: ৫২০৪)

ইমাম আহমাদ ও আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে:

لَا يَضْرِبُ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ إِلَّا كَضَرْبِ الْعَبْدِ
“তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে কেবল দাসীর মতো প্রহার না করে (অর্থাৎ অবমাননাকর প্রহার নিষিদ্ধ)।”

৩. হানাফী ফিকাহের নির্দেশনা

  • আল-হিদায়া-তে বলা হয়েছে: স্ত্রীর অসদাচরণের ক্ষেত্রে প্রথমে উপদেশ, তারপর শয্যা পৃথক, তারপর হালকা প্রহার (যাতে হাড় না ভাঙে ও দাগ না পড়ে) জায়েয। তবে উত্তম হলো প্রহার না করা। (আল-হিদায়া, ২/৩৪৪)
  • রদ্দুল মুহতার-এ ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "যে প্রহারে লালচে ভাব বা দাগ পড়ে, তা নাজায়েয; এক্ষেত্রে স্ত্রীর দিয়াত (ক্ষতিপূরণ) দিতে হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৪৬২)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম) তে উল্লেখ আছে: "আধুনিক যুগে স্ত্রীকে হাত তোলা খুবই নিন্দনীয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে। বরং আলোচনা ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে সমাধান করাই উত্তম।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৫৬)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে:
স্ত্রী যদি ঘর থেকে অনুমতি ছাড়া বের হয় বা ফরয আমলে অবহেলা করে, তবে তাকে মৃদু হাতে (যাতে অস্বস্তি হয় না) সতর্ক করা জায়েয। তবে সাধারণ ভুলের জন্য কখনো মারধর করা উচিত নয়। (আলমাবসূত, সারাখসী, ৫/১৭৭)

৪. স্ত্রীর সাথে আচরণের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

  • রাসূল ﷺ বলেছেন:

اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا فَإِنَّهُنَّ خُلِقْنَ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ
“তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার কর। নিশ্চয় তারা পাঁজরের হাড়ের মতো সৃষ্টি। পাঁজরের হাড়ের সবচেয়ে বাঁকা অংশ তার উপরের দিক। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি তা ছেড়ে দাও, তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে।” (বুখারী, হাদীস: ৫১৮৬; মুসলিম, হাদীস: ১৪৬৮)
এ হাদীসে স্ত্রীদের স্বাভাবিক দুর্বলতা ও ভুল-ত্রুটির প্রতি ধৈর্যের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

  • রাসূল ﷺ আরও বলেন:

لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً؛ إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
“কোনো মুমিন ব্যক্তি যেন মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি তার কোনো স্বভাব অপছন্দ করে, তবে অন্য কোনো স্বভাব তো পছন্দ হবে।” (মুসলিম, হাদীস: ১৪৬৯)

৫. যখন স্ত্রীর ভুল গুরুতর নয়

অধিকাংশ ভুলই তুচ্ছ ও মার্জনীয়। তখন কেবল ধৈর্য ও ক্ষমা করাই উত্তম। রাসূল ﷺ কখনো স্ত্রীদের রান্নায় ত্রুটি বা সামান্য ভুলের জন্য রাগান্বিত হননি। (বুখারী, হাদীস: ৫২২৩)

৬. দম্পতি পরামর্শ ও মধ্যস্থতা

যদি সংশোধন না হয়, তবে পরিবারের পক্ষ থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি মধ্যস্থতা করতে পারেন (সূরা নিসা, ৪:৩৫)। হানাফী ফিকাহে এটাই পছন্দনীয় পদ্ধতি।

উপসংহার

ইসলামে স্ত্রীর ভুল সংশোধনের মূলমন্ত্র হলো প্রথমে ধৈর্য, তারপর ক্রমান্বয়ে নরম উপদেশ ও কিছুটা দূরত্ব। কঠোর শাস্তি বা মারধর কখনোই ইসলামের শিক্ষা নয়। কুরআনের বর্ণিত শেষ ধাপ "প্রহার" শুধুমাত্র চরম অবস্থায় এবং অত্যন্ত হালকা ও প্রতীকী হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বামীদের জন্য উত্তম হলো সবসময় সংলাপ, উদারতা ও দয়ার মাধ্যমে স্ত্রীকে বোঝানো। যেমনটি রাসূল ﷺ-এর সুন্নত ছিল।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও সৌহার্দ্য দান করুন। আমীন।

গ্রন্থসূত্র:

  • কুরআন: সূরা নিসা ৪:৩৪, সূরা রূম ৩০:২১
  • বুখারী: হাদীস ৫২০৪, ৫১৮৬, ৬০১৮
  • মুসলিম: হাদীস ১৪৬৮, ১৪৬৯
  • তিরমিযী: হাদীস ৩৮৯৫
  • রদ্দুল মুহতার (৪/৪৬২)
  • আল-হিদায়া (২/৩৪৪)
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/৩৫৬)
  • ফাতাওয়া আ’লামগীরী (২/২৪৯)
  • বেহেশতি জেওর (পর্ব ২, পৃষ্ঠা ৩০-৩১)
  • মা‘আরিফুল কুরআন (সূরা নিসা ৪:৩৪-এর তাফসীর)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.