বিয়ের সময় মোহর নির্ধারণের সঠিক পদ্ধতি ও তালাকের শব্দে নিয়তের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমাদের বিয়ে পড়ানোর সময় আমার ভাসুর আমাকে বলেন ৭লক্ষ ১টাকা কাবিনে রাজি আছি কিনা
আর আমার হাসবেন্ডকে বলা হয় ৭লক্ষ টাকা কাবিনে রাজি আছে কিনা
১টাকা উল্লেখ করেনি তখন, এতে কি কোনো সমস্যা হবে?
২. তালাকের নিয়ত ছাড়া মুখে যাই বলুক, তালাক কি হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথম প্রশ্নের জবাব:
বিয়ে পড়ানোর সময় ইজাব-কবুলের মজলিসে মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে আপনার বর্ণিত ঘটনায় কিছুটা স্পষ্টীকরণ দরকার:
- আপনার ভাসুর আপনাকে (স্ত্রীকে) জিজ্ঞাসা করেছেন: "৭ লক্ষ ১ টাকা কাবিনে রাজি আছি কিনা?"
- অন্যদিকে আপনার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে: "৭ লক্ষ টাকা কাবিনে রাজি আছে কিনা?"
এখানে সমস্যা হলো, ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) একই মজলিসে সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও মোহরের পরিমাণের মধ্যে ১ টাকার পার্থক্য রয়েছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, ইজাব-কবুলের সময় মোহরের পরিমাণ উভয় পক্ষের নিকট একই হওয়া জরুরি নয়; বরং মূল বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার জন্য শুধু ইজাব ও কবুলের মিল হলেই যথেষ্ট। মোহর যদি নির্ধারিত হয়, তবে তা বিবাহের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু ইজাব-কবুলের সময় তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা সুন্নাত হলেও শর্ত নয়।
তবে এখানে যেহেতু স্ত্রীকে মোহর হিসেবে ৭ লক্ষ ১ টাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু স্বামী ৭ লক্ষ টাকাতেই রাজি হয়েছে, তাই প্রকৃতপক্ষে মোহর হবে ৭ লক্ষ টাকা, কারণ স্ত্রী এই পরিমাণের ওপর রাজি আছে। আর স্বামী ৭ লক্ষ ১ টাকা বললেও, স্ত্রী কর্তৃক ৭ লক্ষ টাকা কবুল করায় চুক্তিটি ৭ লক্ষ টাকার ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে। ১ টাকার অতিরিক্ত অংশ স্ত্রী দাবি করতে পারে না, কিন্তু স্বামী যদি স্বেচ্ছায় দেয় তবে তা হাদিয়া বলে গণ্য হবে।
সুতরাং এতে বিবাহের বৈধতার কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য ইজাব-কবুলের সময় মোহরের পরিমাণ উভয় পক্ষের কাছে স্পষ্ট ও অভিন্ন রাখা উত্তম।
দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব:
তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব শব্দের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:
-
সরীহ (স্পষ্ট) তালাকের শব্দ (যেমন: "তুমি তালাক", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম", "তালাক" ইত্যাদি) – এগুলো উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হবে, যদিও নিয়ত না থাকে। কারণ এসব শব্দের অর্থ স্পষ্ট এবং শরিয়তে এগুলোর ব্যবহার তালাকের জন্যই নির্ধারিত। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৪/৪৫৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭০)
-
কিনায়াহ (অস্পষ্ট) তালাকের শব্দ (যেমন: "তুমি আমার জন্য হারাম", "তুমি মুক্ত", "তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও" ইত্যাদি) – এগুলোর মাধ্যমে তালাক পতিত হতে হলে তালাকের নিয়ত থাকা আবশ্যক। নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হবে না, বরং শব্দের প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য বিবেচনা করা হবে। (সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৪৬; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪১৫)
সারমর্ম:
- আপনি যদি সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ ব্যবহার করেন, তবে নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হবে।
- আপনি যদি কিনায়াহ (অস্পষ্ট) শব্দ ব্যবহার করেন, তবে তালাকের নিয়ত ছাড়া তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৪/৪৫৭-৪৫৮, ৪/৪৭২)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৭০-৩৭১)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১৫-৪১৬)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৪৬-২৪৭)
(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)