তালাক দেওয়ার পর স্বামী স্ত্রী একই বাড়িতে মিলন ছাড়া থাকলে গুনাহ হবে কি না

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 1836
Questioner: Sajon Ahmed (Jack)
Question Asked: 20 Jun 2026, 12:38 PM
Reviewed & Published: 20 Jun 2026, 12:45 PM
Views: 160
Tokens: 7,743
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী পরকিয়া করে, স্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে যথেষ্ট প্রমাণ পেলেও, লোকদের কাছে এ ব্যাপারে প্রমাণ দিতে ব্যার্থ হয়।

এ নিয়ে স্বামীর সাথে ঝগড়ার এক পর্যায়ে স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয় বা বলে ফেলে।

এখন তারা একই বাড়িতে অবস্থান করছেন। যেহেতু স্ত্রীর অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই এবং সন্তান-সন্ততিরা বড় হয়ে গিয়েছেন, বিয়ে-শাদির দেওয়া হয়ে গিয়েছে।

তাই একই বাড়িতে অবস্থান করছেন

তারা আলাদাভাবেই ঘুমাই এখন। যদিও দীর্ঘদিন থেকে আলাদাভাবে শুয়ে থাকে, পরকিয়া ও মন মালিন্য এর কারনে।


স্বামী সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাদের মাঝে কোন ধরনের শারীরিক সম্পর্ক হয় না বা করে না। স্ত্রীর অভিযোগ, স্বামী তার পুত্র বধূর সাথে পরকিয়ায় লিপ্ত। পরকিয়া ও এই ব্যাপারে ঝগড়ার একপর্যায়ে তিন তালাক দিয়ে দেয় তার স্বামী।

উল্লেখ্য কোন একটা সংসারে কাজের জন্য, (ধান পাহারা দেওয়ার জন্য) একই বিছানায় একসাথে ঘুমাই তারা, স্বামী একদিকে কাত হয়ে ঘুমিয়ে ছিল এবং স্ত্রী অন্য দিকে কাত হয়ে ঘুমিয়ে ছিল।


এখন স্ত্রী জানতে চাচ্ছে, এতে বা একসাথে একই বাড়িতে থাকার কারণে কোন গুনাহ হচ্ছে কিনা?

লোকেরা স্ত্রীকে, খ্রিস্টান বা এ ধরনের ভাষায় অপমানিত করছে। তাই স্ত্রী এ ব্যাপারে জানতে চাচ্ছে।

Answer

উত্তর: তালাকের পর একই বাড়িতে অবস্থান ও শরয়ী বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
স্বামী পরকিয়ায় লিপ্ত এবং স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার একপর্যায়ে তিন তালাক দিয়ে দেয়। স্ত্রীর অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় এবং সন্তান-সন্ততি বড় হওয়ায় তারা একই বাড়িতে আলাদাভাবে বসবাস করছেন। শারীরিক সম্পর্ক নেই, তবে ধান পাহাড়ার জন্য একই বিছানায় কাত হয়ে শুয়েছিলেন। এখন লোকেরা স্ত্রীকে অপমান করছে। স্ত্রী জানতে চান, এভাবে একই বাড়িতে থাকায় কোনো গুনাহ হচ্ছে কিনা?


১. তিন তালাকের পরিশেষ ও আইনগত অবস্থা

তিন তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই বিবাহ বিলকুল শেষ (বায়েন) হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য হারাম (অজ্ঞাত) হয়ে যান। (সূরা আল-বাকারা: ২৩০; রদ্দুল মুহতার, ৩/৩২৬; আল-হিদায়া, ২/২৫৬)

এ অবস্থায় তারা পরস্পর বৈধ নয় – যেমন দুই অমুসলিম নর-নারীর মধ্যে কোনো বৈধ সম্পর্ক নেই।


২. তালাকের পর ইদ্দত পালন ও বাসস্থান

তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত (তিন মাসিক বা তিন মাস) পালন করা ফরজ। ইদ্দতকালে তার জন্য স্বামীর গৃহে থাকা জায়েয এবং স্বামীর দায়িত্ব তাকে বাসস্থান দেওয়া। (সূরা আত-তালাক: ১; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৩৩)

ইদ্দত শেষ হওয়ার পর স্ত্রীর জন্য স্বামীর গৃহে থাকা জায়েয নয়। কারণ, তখন তারা সম্পূর্ণ পরস্পর অননুমোদিত (নন-মাহরাম) হয়ে যান। (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/২৮৯; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/১২৫)

তবে যদি স্ত্রীর অন্য কোনো বাসস্থান না থাকে এবং যাওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে প্রয়োজনে ইদ্দতের পরও একই বাড়িতে থাকা জায়েয হতে পারে, তবে শর্তসাপেক্ষে – পূর্ণ পর্দা, পৃথক কক্ষ, কখনো একাকী মিলিত না হওয়া ইত্যাদি। (বাহিশতী জেওর, ৮/২৫৬; ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১/৫২৪)


৩. একই বিছানায় শোয়া – কঠিন গুনাহ

প্রশ্নে উল্লেখিত ঘটনা: ধান পাহাড়ার জন্য একই বিছানায় কাত হয়ে শুয়েছিলেন। এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তালাকের পর তারা যেমন সম্পূর্ণ অপরিচিত, তেমনি খালওয়াত (একাকী মিলন) হারাম। একই বিছানায় শোয়া খালওয়াতের শামিল।

হাদীস: কোনো পুরুষ যদি কোনো বেগানা নারীর সাথে একাকী থাকে, তবে তৃতীয় জন শয়তান। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২১৬৫)

শরহে মাআনিল আসার (২/২২৮) এবং উসুলুশ শাশী (১/৮৫) উল্লেখ করে যে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে একাকী মিলন বা এক বিছানায় শোয়া স্পষ্ট হারাম।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যদি ইদ্দতের পরও একই গৃহে থাকে, তাহলে তার জন্য স্বামীর (সাবেক স্বামী) সাথে কোনো অবস্থায় একাকী মিলন জায়েয নয়। (ফতোয়ায়ে কাযীখান, ২/৪৫৫; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/১৬৩)


৪. একই বাড়িতে অবস্থানের বিধান ও গুনাহের বিবরণ

একই বাড়িতে থাকায় নিম্নলিখিত গুনাহ হতে পারে:

  • পর্দার লঙ্ঘন: তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী সাবেক স্বামীর জন্য পর্দা করা বাধ্যতামূলক। যদি তারা সহজে দেখা-সাক্ষাৎ করে বা একই কক্ষে থাকে, তবে গুনাহ।
  • খালওয়াতের আশঙ্কা: দীর্ঘদিন একই বাড়িতে থাকলে খালওয়াত বা গোপন মিলনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
  • লোকলজ্জার অপবাদ: এতে সমাজে অশ্লীলতার ধারণা জন্মায়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

কেননা, শরীয়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: তালাকের পর নারী-পুরুষকে সম্পূর্ণ পৃথক জীবনযাপন করতে হবে। একই ছাদের নিচে বসবাসকালে যদি পৃথক কক্ষ, পর্দা এবং একাকী মিলনের সুযোগ না থাকে, তবে তা হারাম ও গুনাহ।

রদ্দুল মুহতার (৩/৫৪০)-এ বলা হয়েছে: তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দত শেষে স্বামীর গৃহে থাকলে তাকে ‘খলয়াত’ ও ‘হরাম’ থেকে বিরত থাকতে হবে; অন্যথায় গুনাহ।


৫. স্ত্রীকে ‘খ্রিস্টান’ বলে অপমানের জবাব

লোকেরা স্ত্রীকে ‘খ্রিস্টান’ বা অন্য অপমানসূচক ভাষায় ডাকছে, এটি নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। আল্লাহ বলেন:

“হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর সম্প্রদায়কে উপহাস না করে…” (সূরা হুজুরাত: ১১)

তবে স্ত্রীর উচিত নিজের অবস্থা সংশোধন করা এবং লোকদের কথা উপেক্ষা করা। তিনি যদি একান্ত বাধ্য হয়ে একই বাড়িতে থাকেন, তবে অন্তত পূর্ণ পর্দা ও পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করুন এবং একাকী মিলন থেকে বিরত থাকুন।


৬. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ

| বিষয় | বিধান | |--------|--------| | তিন তালাকের পর বিবাহ শেষ | হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ | | ইদ্দতকালে স্বামীর গৃহে থাকা | জায়েয | | ইদ্দত শেষে একই ঘরে থাকা | জায়েয নয়। | একই বিছানায় শোয়া | স্পষ্ট হারাম ও গুনাহ | | পর্দা না করা ও খালওয়াত | গুনাহ | | লোকের অপবাদ | নাজায়েয, স্ত্রীকে নিরুৎসাহিত হতে হবে |

শেষ পরামর্শ:
স্ত্রী যদি সামর্থ্যবান হন, তবে দ্রুত অন্য বাসস্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। যদি না পারেন, তাহলে সন্তান বা অন্য মাহরামের উপস্থিতিতে পৃথক কক্ষে অবস্থান করুন, সম্পূর্ণ পর্দা মেনে চলুন এবং একাকী মিলন থেকে বিরত থাকুন। স্ত্রীকে অপমান করার অধিকার কারো নেই, বরং তাকে সাহায্য ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা সহজ পথ দেখান।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.