জন্মনিয়ন্ত্রণের বৈধ ও অবৈধ পদ্ধতি
Family Life · Hanafi
Question
(পরবর্তীতে অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্ছাদানি ঠিক করা যাবে)। অর্থ্যাৎ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাচ্ছা নেওয়া হবে না। যেহেতু ডাক্তার সিজারের মাধ্যমে ০৩ টার বেশি বাচ্ছা নিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এখন ০৩ নাম্বার বাচ্ছার জন্য সিজার হবে।
Answer
উত্তর: জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য টিউবাল লিগেশন (বাচ্চাদানি বন্ধ) করা
প্রশ্নের সারমর্ম:
প্রশ্নকারী জানতে চান, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তৃতীয় সিজার সন্তানের পর জরায়ু বা ডিম্বনালী (বাচ্চাদানি) স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখা (টিউবাল লিগেশন) কি পাপ হবে? উল্লেখ্য, পরবর্তীতে অপারেশন করে এটি পুনরায় ঠিক করা যাবে।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইসলামে সন্তান ধারণ ও প্রজনন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং নবী করীম (সা.)-এর সুন্নত। তবে কিছু বৈধ কারণে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (যেমন: আযল বা কণ্ডোম ব্যবহার) জায়েয, বিশেষত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে এবং চিকিৎসাগত প্রয়োজনে। কিন্তু স্থায়ীভাবে বন্ধ্যাকরণ (টিউবাল লিগেশন বা ভ্যাসেকটমি) সাধারণত নিষিদ্ধ, কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করার শামিল এবং সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। তবে যদি প্রাণঘাতী চিকিৎসাগত কারণ থাকে (যেমন: বারবার সিজার হতে মায়ের জীবন বিপন্ন হওয়া), তাহলে স্থায়ী বন্ধ্যাকরণও কিছু হানাফি ফকীহের মতে জায়েয হতে পারে, বিশেষত যদি পরবর্তীতে পুনরায় ঠিক করার সুযোগ থাকে।
নির্দিষ্ট ফতোয়া:
১. তৃতীয় সিজারের পর টিউবাল লিগেশন:
- ডাক্তার যদি স্পষ্ট বলেন যে, তৃতীয় সিজারের পর আরেকটি সিজার করলে মায়ের জীবনের জন্য ভয়ানক ঝুঁকি আছে, তাহলে এই চিকিৎসাগত প্রয়োজন বৈধ কারণ হিসেবে গণ্য হবে।
- তবে শর্ত হলো: এটি স্থায়ী না হয়ে অপারেশনের মাধ্যমে পুনরায় ঠিক করার সুযোগ রাখা। যেহেতু প্রশ্নে উল্লেখ আছে “পরবর্তীতে অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চাদানি ঠিক করা যাবে”, তাই এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নয়, বরং একটি অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
- হানাফি ফতোয়া: মুফতি তাকি উসমানি, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) প্রমুখের মতে, যদি গর্ভধারণে মায়ের মৃত্যুঝুঁকি থাকে বা গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টিউবাল লিগেশন জায়েয। কিন্তু সাধারণ স্বাচ্ছন্দ্য বা অতিরিক্ত সন্তানের ভয়ে এটি করা নাজায়েয।
২. প্রমাণ ও রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/৫৬৪): স্থায়ী বন্ধ্যাকরণকে আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন বলে নিষেধ করা হয়েছে, তবে প্রয়োজনীয় অবস্থায় (যেমন: গর্ভধারণ প্রাণনাশক হলে) জায়েয বলেছেন।
- ফতোয়া উসমানি (২/৪০১): মুফতি তাকি উসমানি লিখেছেন, “যদি ডাক্তার নিশ্চিত বলেন যে, আরেকটি সন্তান নিলে মায়ের জীবন বিপন্ন হবে, তাহলে স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ জায়েয, তবে এটি অপারেশনের মাধ্যমে পুনরায় খোলা যায় এমন হওয়া ভালো।”
- ইমদাদুল ফতোয়া (৪/২২৩): আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন, “প্রাণনাশক অসুস্থতা বা সন্তানের জটিলতা থাকলে চিকিৎসার জন্য বন্ধ্যাকরণ জায়েয হতে পারে।”
- বেহেশতি জেওর (বিবাহ ও স্ত্রী-সম্পর্ক অধ্যায়): স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নাজায়েয, কিন্তু চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে জায়েযের সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. শর্ত ও সতর্কতা:
- শুধুমাত্র ডাক্তারের পরামর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং দুইজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ডাক্তার নিশ্চিত করুন যে আরেকটি সিজার মায়ের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
- স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতি আবশ্যক।
- টিউবাল লিগেশন অপারেশন পুনরায় ঠিক করার সুযোগ রাখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে সন্তান নেওয়া সম্ভব হয়।
- যদি পরবর্তীতে অপারেশন করে ঠিক করা যায়, তাহলে এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নয়, বরং একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা ‘আযল’ (গর্ভধারণ প্রতিরোধের একটি পদ্ধতি)-এর মতোই গণ্য হবে।
সারসংক্ষেপ:
- সাধারণ অবস্থায় বাচ্চাদানি বন্ধ করা (টিউবাল লিগেশন) হারাম ও গুনাহর কাজ, কারণ এটি প্রজননের সুন্নত পরিত্যাগ এবং আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন।
- কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ডাক্তার তৃতীয় সিজারের পর আরেকটি সিজার কঠোরভাবে নিষেধ করছেন, যা মায়ের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি। সেক্ষেত্রে এটি চিকিৎসাগত প্রয়োজন হিসেবে গণ্য হবে। যদি অপারেশনটি পুনরায় ঠিক করার সুযোগ থাকে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সম্মত হন, তাহলে এটি জায়েয বলে ফতোয়া দেওয়া যায়।
পরামর্শ:
- সরাসরি কোনো স্বীকৃত মুফতির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করে ব্যক্তিগত ফতোয়া নিন, কারণ ডাক্তারি রিপোর্ট ও পরিবেশ ভেদে ফতোয়া পরিবর্তিত হতে পারে।
- তৃতীয় সিজারের পর টিউবাল লিগেশন করার আগে দ্বিতীয় বা তৃতীয় চিকিৎসকের মতামত নিন।
- আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখুন এবং দোয়া করুন যাতে আপনার জন্য যা কল্যাণকর তা সহজ হয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।