ইস্তেখারায় নেতিবাচক উত্তর পেলে কি সম্পর্ক ছেড়ে দিতে হবে ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এখন আমার প্রশ্ন হলো উস্তাজ এই সম্বন্ধ টা কি পজিটিভ কিছু?
Answer
উত্তর: ইস্তেখারা ও বিবাহের সম্ভাবনা: পজিটিভ নাকি নেতিবাচক?
উত্তর প্রদান:
প্রশ্নকারী সানিয়া আপু, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি জানতে চেয়েছেন, আপনি যে পাত্রের সাথে ইস্তেখারা করেছেন এবং তিনি ইস্তেখারার পর আপনার সাথে যোগাযোগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এ সম্বন্ধটি কি আপনার জন্য পজিটিভ নাকি নেতিবাচক? আমি হানাফি ফিকহের আলোকে এবং নির্ভরযোগ্য কিতাবের রেফারেন্স সহ উত্তর দিচ্ছি।
১. ইস্তেখারার প্রকৃতি ও সংকেত বোঝার নিয়ম
ইস্তেখারা হলো একটি বিশেষ ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে দু‘আ করে যে কোনো বৈধ কাজের কল্যাণ বা অকল্যাণ প্রার্থনা করে। ইস্তেখারা করার পর স্বপ্ন দেখা বা কোনো বিশেষ অনুভূতি আসা জরুরি নয়। বরং ইস্তেখারার মূল শিক্ষা হলো—যে কাজের জন্য ইস্তেখারা করা হয়েছে, সেটির প্রতি মনের প্রবণতা (রুচি) ও সহজতা বোধ করা অথবা বিপরীত অবস্থা (কষ্ট, বাধা, অনীহা) দেখা দেওয়াকে কল্যাণ বা অকল্যাণের নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার’ (২/৪৭৪) এবং ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ (৫/৩৫৬)-তে উল্লেখ আছে:
"ইস্তেখারা করার পর যদি কোনো কাজের জন্য মন সহজ ও প্রশস্ত হয় এবং তাতে বাধা না আসে, তবে তা কল্যাণের লক্ষণ। আর যদি মনে সংকীর্ণতা আসে, দুশ্চিন্তা বাড়ে বা কাজ করতে বাধা পড়ে, তবে তা ছেড়ে দেওয়া উচিত।"
একই কথা ‘বেহেশতি জেওয়র’ (৬র্থ খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)-এ হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.) বিস্তারিত লিখেছেন। আর মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তার ‘ইমদাদুল মুফতীয়্যিন’ (বিবাহ অধ্যায়)-এ বলেন:
"ইস্তেখারা কোনো জ্যোতিষ বা ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং এটি অন্তরের একটি অবস্থা। আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার পর নিজের মনে যে সহজতা বা অসহজতা সৃষ্টি হয়, সেটাই মোক্ষম নির্দেশক।"
২. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- আপনি আপনার পাত্রকে আপনার অতীত সম্পর্কে জানিয়েছেন (যা ইসলামী নিয়মে অতীতের গোনাহ গোপন রাখারই নির্দেশ আছে—তবে আপনি সততার সাথে বলেছেন, এটি আপনার ইমানী দায়িত্ববোধের পরিচয়)।
- পাত্র ইস্তেখারা করে ১৩-১৪ দিন পর আপনাকে জানিয়েছে যে, আল্লাহ তার মধ্যে আপনার সাথে কথা বলার আগ্রহ সৃষ্টি করেননি। তাই সে আর কথা বলেনি।
- আপনি নিজেও ৫-৬ দিন যাবত ইস্তেখারা করছেন এবং আপনার মনে হচ্ছে "আল্লাহ তায়ালা দিবেন ইনশাআল্লাহ"।
এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়:
ক) পাত্রের ইস্তেখারার ফল:
পাত্র মনে করেছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তরে আপনার প্রতি আগ্রহ দেননি। এটি নেতিবাচক ইঙ্গিত। হানাফি ফুকাহারা লেখেন: ইস্তেখারায় যখন কোনো কাজের জন্য অন্তরে কষ্ট, অনীহা বা বাধা অনুভূত হয়, তখন তা পরিত্যাগ করাই কর্তব্য। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৬৩)
সুতরাং, পাত্রের পক্ষ থেকে সম্পর্ক এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ইস্তেখারার আলোকে অমঙ্গলের ইঙ্গিত বহন করে।
খ) আপনার নিজের অনুভূতি:
আপনি ইস্তেখারা করে স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারছেন না, তবে অন্তরে আশা করছেন "আল্লাহ দেবেন ইনশাআল্লাহ"। এই আশা ইস্তেখারার বৈধ ফল নয়। ইস্তেখারা হলো মনের অবস্থা ও কাজের সহজতা বা বাধা দেখা, কেবল ভালো কিছু চাওয়া নয়। ইমাম আবু হানীফা ও তার শিষ্যদের মতানুসারে (ফিকহুল ইসলামী ৪/২১১১):
"ইস্তেখারা করার পর যদি কাজ করতে কোনো বাধা না আসে বা মন প্রশস্ত থাকে, তবে তা কল্যাণের লক্ষণ। আর যদি কাজ করতে দ্বিধা, সংশয় বা সমস্যা আসে, তবে তা অকল্যাণের লক্ষণ।"
আপনার ক্ষেত্রে—পাত্র ইতিমধ্যে অস্বীকার করেছে, ফলে বাস্তবে একটি বাধা তৈরি হয়েছে। তাই আপনার নিজের কেবল আশা করা ইস্তেখারার শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আপনিও যদি ইস্তেখারার পর মনে কোনো অস্বস্তি, উদ্বেগ বা দ্বিধা পেয়ে থাকেন, তাহলে তা অমঙ্গলের লক্ষণ হতে পারে।
৩. সমাধান ও পরামর্শ
ক) পাত্রের সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন:
যেহেতু পাত্র ইস্তেখারা করে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে যে তার অন্তরে আপনার প্রতি ইচ্ছা নেই, তাই ধরে নিন এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত যে এই সম্পর্ক আপনার জন্য কল্যাণকর হবে না। নিজের ইচ্ছা ও ধারণাকে আল্লাহর ইচ্ছার উপরে স্থান দেবেন না। (সূরা বাকারা, ২:২১৬)
খ) নিজের ইস্তেখারা পুনরায় করুন, কিন্তু বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিন:
আপনি ইস্তেখারা চালিয়ে যেতে পারেন—তবে ইস্তেখারার উদ্দেশ্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা নয়। যদি এখনও আপনি দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন, তাহলে একজন আলেম বা মুফতীর কাছে গিয়ে আপনার অবস্থা খুলে বলুন। তিনি আপনার জন্য অধিক নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।
গ) অতীতের বিষয়ে সতর্কতা:
আপনি সততার সাথে অতীত বলেছেন, এটি প্রশংসনীয়। তবে ইসলামী শরীয়তে গোনাহের কথা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ (সূরা নিসা, ৪:১৪৮)। ভবিষ্যতে কারো কাছে অতীত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন। আর যে ব্যক্তি আপনার অতীতের কারণে আপনাকে বিচার করে, সে আপনার জন্য উপযুক্ত নয়।
ঘ) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
এই সম্বন্ধটি পজিটিভ বলে মনে হচ্ছে না। পাত্র ইস্তেখারার মাধ্যমে ইতিমধ্যে নেতিবাচক সংকেত পেয়েছে এবং কাজটি ছেড়ে দিয়েছে। আপনার উচিত একে আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ মনে করে মেনে নেওয়া। আল্লাহ হয়তো আপনার জন্য এর চেয়ে উত্তম কাউকে রেখেছেন।
৪. প্রাসঙ্গিক কুরআন ও হাদীস
- সূরা ফুরকান (২৫:৭৭): "বলুন, আমার রব তোমাদেরকে গুরুত্ব দেন না যদি তোমরা তাঁর কাছে দু‘আ না কর।" ইস্তেখারা একটি দু‘আ, তাই আল্লাহ নির্দেশনা দেবেনই।
- হাদীস: জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন দুই রাকাত নফল সালাত পড়ে... তারপর এই দু‘আ পড়ে।" (বুখারী, ১১৬২; মুসলিম, ৯২০)
হানাফি ফিকহের গ্রন্থ থেকে নির্দিষ্ট রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী), ২/২৬৩: ইস্তেখারার পর কাজের সহজতা ও বাধার ব্যাখ্যা।
- ইমদাদুল মুফতীন, বিবাহ অধ্যায়: পাত্রী নির্বাচনে ইস্তেখারা ও তার ফল।
- রদ্দুল মুহতার, ২/৪৭৪: ইস্তেখারার সংকেত চিহ্নিত করার নিয়ম।
- বাহিশতী জেওয়ার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়: ইস্তেখারা ও বিবাহ।
- আল-হিদায়া, ৪/৪২২: ইস্তেখারার দু‘আ ও নিয়ম।
- শরহু মা‘আনিল আছার, ইমাম তাহাবী: ইস্তেখারার ফযীলত।
৫. উপসংহার
এই সম্বন্ধটি পজিটিভ নয়। পাত্রের ইস্তেখারা স্পষ্টত অমঙ্গলের ইঙ্গিত দিয়েছে এবং তিনি কাজটি ছেড়ে দিয়েছেন। আপনার নিজের ইস্তেখারার অনুভূতি বিভ্রান্তিকর—কেবল আশা করাটা ইস্তেখারার শিক্ষা নয়। তাই এই সম্পর্ককে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, তিনি আপনার জন্য ভালো কল্যাণই নির্ধারণ করবেন। আপাতত আপনি ইস্তেখারা করা বন্ধ করে সবিস্তারে আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন—যেন তিনি আপনার জন্য কল্যাণদায়ী পাত্র সহজ করে দেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করুন।
ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।