স্বামী অবহেলা করলে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমি কি বেশি আবেগ এর জন্য কষ্ট পাচ্ছি ? তিনি যে আমার প্রতি এত অবহেলা ব্যস্ততা দেখায় বা অনেক টা দায় ঠেকে করছে জিনিস গুলো এরকম কিছু নাকি ছেলে দের মন মানসিক এমনি থাকে? আমার কি করণীয়? আমি কিভাবে আমার স্বামীর মন এ জায়গা করে নিব
Answer
উত্তর: আপনার স্বামীর আচরণ ও করণীয় সম্পর্কে ইসলামি দিকনির্দেশনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনার বিয়ে হয়েছে ৭ মাস। আপনার স্বামী একজন ইন্টার্ন ডাক্তার, দূরে থাকেন। বিয়ের পর থেকে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে দূরে থাকছেন – খুব কম যোগাযোগ, কখনো কল বা ভিডিও করেন না, আপনার খোঁজ নেন না, ছুটিতে এলে শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী নন। আপনি চিন্তিত, নিজেকে দোষী মনে করছেন এবং জানতে চান এটি কি পুরুষের স্বাভাবিক আচরণ, নাকি আপনার অতিরিক্ত আবেগের কারণে কষ্ট হচ্ছে? এবং কীভাবে তাঁর মন জয় করবেন?
১. ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য
ইসলামে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য শান্তির পোশাকস্বরূপ। আল্লাহ বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রুম: ২১)
স্বামীর উপর স্ত্রীর কিছু অবশ্য কর্তব্য রয়েছে, যার মধ্যে সদ্ব্যবহার, সান্ত্বনা, আর্থিক ভরণপোষণ এবং শারীরিক চাহিদা পূরণ অন্যতম। হাদিসে এসেছে:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ
“ঈমানদারদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে সচ্চরিত্র। আর তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা নিজ স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
তাই আপনার স্বামীর আচরণ (অবহেলা, যোগাযোগহীনতা, শারীরিক সম্পর্কে অনীহা) ইসলামের আদর্শের বিপরীত এবং এটি আপনার প্রতি তাঁর দায়িত্বে ঘাটতি নির্দেশ করে।
২. এটি কি পুরুষের স্বাভাবিক মন-মানসিকতা? আপনি কি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ?
আপনি জিজ্ঞাসা করছেন, “ছেলেদের মন-মানসিক কি এমনই থাকে?”
উত্তর: না, এটি সব পুরুষের স্বাভাবিক বা সাধারণ বৈশিষ্ট্য নয়। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে কিছু পুরুষ কাজের চাপ, মানসিক অবসাদ, বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে না। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
- পেশাগত চাপ: একজন ইন্টার্ন ডাক্তার অনেক চাপ ও ক্লান্তির মধ্যে থাকেন। তবে এটা শারীরিক সম্পর্কে অনীহা এবং আপনার প্রতি খোঁজ না রাখার অজুহাত হতে পারে না। তিনি যদি সত্যিই ক্লান্ত হন, তবে তার উচিত আপনাকে জানিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া।
- মনস্তাত্ত্বিক কারণ: কারো কারো মধ্যে কমিটমেন্ট ফোবিয়া, দায়িত্ব নেওয়ার ভয়, বা পূর্বের কোনো ট্রমা থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এটি তার ব্যক্তিগত সমস্যা, যা আপনার দোষ নয়।
- আপনার আবেগ স্বাভাবিক: আপনি একজন স্ত্রী, স্বামীর ভালোবাসা, যত্ন ও শারীরিক সম্পর্ক চান – এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ইসলামসম্মত ইচ্ছা। আপনি ‘অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ’ নন; বরং আপনি নিজের হক (অধিকার) আদায় করতে চাচ্ছেন।
৩. আপনার করণীয় – ধাপে ধাপে ইসলামি নির্দেশনা
(ক) ধৈর্য ও ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী করুন
আপনার জন্য প্রথম কাজ হলো সবর (ধৈর্য) ও তাওয়াক্কুল। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
“হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারা: ১৫৩)
নিয়মিত নামাজ, তাহাজ্জুদ, দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াত করুন। আপনার জন্য নিচের দোয়াটি বিশেষ উপকারী:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
“হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ করুন।” (সূরা ফুরকান: ৭৪)
(খ) তাঁর সাথে নরম ও হিকমতপূর্ণ আলোচনা করুন
তিনি দূরে থাকলেও ম্যাসেঞ্জারে একটি চিঠি বা দীর্ঘ বার্তা পাঠান, যেখানে আপনার মনের কথা ব্যক্ত করুন। তবে দোষারোপ বা অভিযোগের ভাষায় নয়; বরং আপনার ভালোবাসা, তাঁর অনুপস্থিতিতে আপনার কষ্ট, এবং ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
“নিশ্চয় নম্রতা যখন কোনো বিষয়ে থাকে, তাকে সুশোভিত করে; আর যখন তা থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়, তাকে কলুষিত করে।” (মুসলিম)
তিনি যদি কল করতে না চান, তাহলে তাকে লিখুন যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কথা বলার ইচ্ছা। তাকে আপনার ভালোবাসা ও তাঁর হক (অধিকার) সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিন। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরামর্শ ও খোলা আলোচনা জরুরি।
(গ) পরিবার ও পরামর্শকের সাহায্য নিন
যদি সরাসরি কথায় কাজ না হয়, তাহলে আপনার বা তাঁর পরিবারের কোনো বিজ্ঞ ও ন্যায়পরায়ণ সদস্য এর মাধ্যমে আলোচনার ব্যবস্থা করুন। ইসলামে পারিবারিক সমস্যা সমাধানে সুপারিশের পদ্ধতি রয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا
“আর যদি তোমরা তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর।” (সূরা নিসা: ৩৫)
(ঘ) স্বামীর সম্ভাব্য মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন
ডাক্তারি পেশায় অনেক সময় চাপ, অনিয়মিত ঘুম ও হতাশা থাকে। আপনার স্বামী বিষণ্ণতা বা উদ্বেগে ভুগতে পারেন, যার কারণে তিনি শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী নন বা যোগাযোগে অনীহা দেখান। সেক্ষেত্রে তাকে কোনো ইসলামি পদ্ধতিতে চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং এর পরামর্শ দিন। নিজেও তাকে সময় দিন এবং তার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন।
(ঙ) নিজের প্রতি যত্নশীল হোন এবং ঘরের পরিবেশ আকর্ষণীয় রাখুন
তিনি যখন ছুটিতে আসেন, তখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সুগন্ধিযুক্ত ও মনোরম পরিবেশ তৈরি করুন। রাসূল ﷺ নিজে স্ত্রীদের সাথে কৌতুক করতেন ও আদর-স্নেহ করতেন। আপনি তাঁর জন্য সুন্দরভাবে সাজগোজ করুন, প্রিয় খাবার রান্না করুন, এবং বিনয় ও স্নেহের সাথে কথা বলুন। কষ্ট হলেও তাকে দোষারোপ না করে ভালোবাসার ভাষায় জায়গা করে নিন।
(চ) শারীরিক সম্পর্কের হক চাওয়া বৈধ
যদি তিনি ছুটিতে এসেও শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী না হন, তবে এটি আপনার ওপর অন্যায়। ইসলামী ফিকাহ অনুসারে, স্ত্রীর বৈধ শারীরিক চাহিদা পূরণ করা স্বামীর ওপর ফরজ (যদি কোনো বৈধ ওযর না থাকে)। ইবন আবেদিন (রহ.) বলেন:
إذا لم يطأها زوجها مدة طويلة بلا عذر شرعي، فللمرأة رفع الأمر إلى القاضي ليفسخ النكاح أو يجبره على الطلاق
“যদি স্বামী কোনো বৈধ কারণ ছাড়া দীর্ঘদিন স্ত্রীর সাথে সহবাস না করে, তাহলে স্ত্রী বিচারকের কাছে গিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ দাবি করতে পারে অথবা স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করা যেতে পারে।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৭২)
তবে বিচ্ছেদই সর্বপ্রথম সমাধান নয়। আগে উপরোক্ত ধাপগুলো অনুসরণ করুন। যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে আপনি খোলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিনিময়ে বিবাহ বিচ্ছেদ) বা তালাক চেয়ে পরিবার ও আলেমের সাহায্য নিতে পারেন।
৪. কিছু গুরুত্বপূর্ণ হানাফি ফাতাওয়া ও উক্তি
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৩৫৩): স্বামীর উপর স্ত্রীর হক হলো তাকে সুন্দরভাবে রাখা, তার সাথে হাসিমুখে কথা বলা, ও তার বৈধ চাহিদা পূরণ করা।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১২৩): যদি স্বামী স্ত্রীকে অবহেলা করে এবং তার অধিকার হরণ করে, তবে স্ত্রী আলেমের মাধ্যমে তাকে সতর্ক করতে পারে। চরম ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ জায়েয।
- বাহিশতী জেওর (ভলিউম ২, বিবাহ অধ্যায়): স্বামী-স্ত্রীর উচিত একে অপরের সাথে স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করা। স্ত্রীর আবেগ ও কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া স্বামীর কর্তব্য।
৫. উপসংহার ও মানসিক পরামর্শ
আপনি নিজেকে দোষারোপ করবেন না। আপনার আবেগ স্বাভাবিক এবং আপনার হক (অধিকার) আদায়ের ইচ্ছা সম্পূর্ণ ইসলামসম্মত। তবে তার প্রতি অবিচল, নম্র ও ধৈর্যশীল থাকুন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনি তাকে ভালোবাসেন এবং তাঁর সঙ্গ ও স্নেহ চান। একই সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
যদি দীর্ঘদিনেও তাঁর আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে এবং আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তাহলে পরিবার ও কোনো বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিন। বিবাহ অটুট রাখা ভালো, তবে নিজের সম্মান ও অধিকার বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
আল্লাহ আপনার ধৈর্যকে শক্তি দিন এবং আপনার স্বামীর মনকে আপনার দিকে ফিরিয়ে দেন। (আমিন)