ইসলামের দৃষ্টিতে তাবিজ পানিতে ডুবিয়ে পানি পান করার বিধান কী?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আমার আব্বু আমাকে রুকইয়াহ করানোর জন্য বাসায় একজন হুজুর নিয়ে এসেছিলেন। হুজুর বলেছিলেন যে তিনি কুরআনের আয়াত লিখে একটি তাবিজ দেবেন এবং সেটি ব্যবহার করা যাবে। আমি এতে রাজি হইনি।
এখন আবার বলা হচ্ছে যে হুজুর রুকইয়াহর পানি এবং একটি তাবিজ দেবেন। আমাকে বলা হয়েছে তাবিজটি পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি পান করতে।
আমি জানতে চাই, ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কতটুকু যৌক্তিক ও শরিয়তসম্মত? এ বিষয়ে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে দয়া করে জানাবেন।
Answer
উত্তর দেওয়া হচ্ছে: “তাবিজ পানিতে ডুবিয়ে পানি পান করা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি”
প্রশ্নের সারমর্ম:
প্রশ্নকারী জানতে চান, কুরআনের আয়াত লিখে তৈরি তাবিজ পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি পান করা কি শরিয়তসম্মত ও যৌক্তিক? তাঁর পিতা একজন হুজুর এনে রুকইয়াহ করানোর ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু তিনি এতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। তিনি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জানতে চান।
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নকারীকে প্রথমে ধন্যবাদ যে তিনি দ্বীনের বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক। ইসলাম মানবকল্যাণ ও শারীরিক-মানসিক রোগের চিকিৎসার অনুমতি দেয়, তবে শর্ত হলো তা যেন শিরক, বিদ‘আত বা কুসংস্কারমুক্ত হয়।
নিচে তাবিজ ও তার পানি পান করার বিধান কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে উল্লেখ করা হলো।
১. তাবিজ ব্যবহারের সাধারণ বিধান (হানাফি মতে):
হানাফি মাযহাবে কুরআনের আয়াত বা সহিহ দো‘আ লিখে তৈরি তাবিজ ব্যবহার করা জায়েয, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- তাবিজে শুধুমাত্র কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, বা সহিহ হাদিসের দো‘আ লেখা হয়।
- তাবিজে কোনো শিরকি চিহ্ন, অস্পষ্ট প্রতীক বা অশ্লীল বাক্য না থাকে।
- ব্যবহারকারীর বিশ্বাস হয় যে, আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ; তাবিজ শুধু একটি মাধ্যম।
- তাবিজ পরিধান বা ব্যবহার করা হয় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের সাথে।
প্রমাণ:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যগণ (আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ) কুরআনের আয়াতসমৃদ্ধ তাবিজকে রুখসত (অনুমোদিত) বলেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৪)
- ইমাম ত্বহাবি (রহ.) বলেছেন: “কুরআনের আয়াত লিখে রোগীর গলায় ঝুলানো বা পান করানো জায়েয।” (শরহু মা‘আনিল আসার, ৪/৩১৫)
- বাহিশতি জেওয়ারে (আশরাফ আলী থানভী, রহ.) তাবিজের অনুমতি দিয়ে শর্ত উল্লেখ করেছেন।
২. তাবিজ পানিতে ডুবিয়ে পানি পান করা:
এটি ‘শারবাতুত তাবিজ’ বা ‘তাবিজের পানি’ নামে পরিচিত। অনেক সাহাবি ও তাবে‘য়ি এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।
প্রমাণ:
- ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি কুরআনের আয়াত লিখে সেই লেখা ধুয়ে রোগীকে পান করতে দিতেন। (সুনানে সাঈদ ইবনু মানসুর, ২/৪১১)
- ইমাম মালিক (রহ.) ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর একটি মতেও এটি জায়েয।
- হানাফি ফিকহে ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) ‘যাফরান’ বা পবিত্র কালি দিয়ে কুরআনের আয়াত লিখে সেই কাগজ ধুয়ে পানি পান করানোকে বৈধ বলেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৪)
শর্তাবলী:
- তাবিজটি কুরআনের আয়াত বা সহিহ দো‘আ দিয়ে লেখা হতে হবে।
- কালি হিসেবে পবিত্র বস্তু (যেমন: যাফরান, গোলাপজল, পানি) ব্যবহার করতে হবে।
- পানি পান করার সময় মনে রাখতে হবে যে, আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ।
- তাবিজে ‘ত্বলসমাহ’ বা ‘অলৌকিক চিহ্ন’ জাতীয় কিছু না থাকে।
৩. আপত্তির কারণ ও সতর্কতা:
প্রশ্নকারী যদি কোনো কারণে তাবিজ বা এই পদ্ধতি নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করেন, তাহলে তা ব্যবহার করতে বাধ্য নন। বরং ইসলাম চিকিৎসার অন্যান্য বৈধ পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করে, যেমন:
- কুরআন তিলাওয়াত করে দম করা (রুকইয়া)
- মধু, কালোজিরা, জাম-জাম পানি ইত্যাদি ব্যবহার করা
- চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া
সতর্কতা:
- কোনো তাবিজ বা পানিকে ‘স্বয়ংক্রিয় আরোগ্যকারী’ মনে করা শিরক।
- যদি তাবিজে অস্পষ্ট অক্ষর, জ্যোতিষচিহ্ন বা অমুসলিম প্রতীক থাকে, তবে তা হারাম।
- কোনো ‘হুজুর’ বা ‘পীর’ যদি তাবিজকে নিজের কুদরতের মাধ্যম বলে দাবি করেন, তবে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৪. কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর দলিল:
কুরআন:
- “আর আমি কুরআনে এমন জিনিস নাযিল করি যা মুমিনের জন্য শিফা ও রহমত।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৮২)
- এই আয়াত দেখায় যে কুরআনের আয়াত শারীরিক ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার মাধ্যম হতে পারে।
হাদিস:
- হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে দো‘আ লিখে কোনো ব্যক্তিকে দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৯৫)
- ইমাম বুখারি (রহ.) ‘কিতাবুত তিব্ব’-এ ‘তাবিজ লিখে দেওয়া’ অধ্যায় রচনা করেছেন।
৫. হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য:
- আল্লামা ইবনু আবেদিন শামি (রহ.) বলেন: “তাবিজে কুরআনের আয়াত ও সহিহ দো‘আ লিখে তা ব্যবহার করা জায়েয, যদি শিরকি নাম বা কালিমা না থাকে।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৪)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: “কুরআনের আয়াত লিখে ধুয়ে পানি পান করা জায়েয, তবে তাবিজকে নিজে আরোগ্যকারী মনে করা যাবে না।” (মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা ইউনুসের তাফসির)
- মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: “তাবিজ ব্যবহার জায়েয, কিন্তু বর্তমানে এর অপব্যবহার বেশি হওয়ায় সতর্কতা জরুরি।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/২২২)
প্রশ্নকারীর করণীয়:
১. আপনি যদি কোনো ‘হুজুর’ এর পদ্ধতি নিয়ে সন্দিহান হন, তাহলে সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করুন যে তাবিজে কী লেখা হচ্ছে।
২. শুধুমাত্র কুরআনের আয়াত বা সহিহ দো‘আ থাকলে এবং আপনার বিশ্বাস আল্লাহর ওপর দৃঢ় থাকলে আপনি তা ব্যবহার করতে পারেন।
৩. তবে আপনি যদি মনে করেন এতে আপনার দ্বীনের ব্যাপারে কোনো দুর্বলতা বা শিরকের আশঙ্কা আছে, তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করুন। ইসলাম আপনাকে জোর করে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য করে না।
৪. আপনি চাইলে সরাসরি কুরআন তিলাওয়াত করে দম করতে পারেন (যেমন: সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, চার কুল) – এটাই সর্বোত্তম রুকইয়া।
সারসংক্ষেপ:
- জায়েয: কুরআনের আয়াত লিখে তাবিজ বানিয়ে তা পানি ডুবিয়ে পানি পান করা জায়েয, যদি উপরোক্ত শর্তাবলি পালন করা হয়। এটি সাহাবা ও তাবে‘য়ি থেকে প্রমাণিত।
- মাকরূহ/হারাম: যদি তাবিজে শিরকি বাণী, অস্পষ্ট প্রতীক বা অমুসলিম রীতিনীতি থাকে, অথবা তাবিজকে নিজে আরোগ্যকারী মনে করা হয়, তবে তা নাজায়েয।
- ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত: প্রশ্নকারী তাঁর ইমানি সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে এ পদ্ধতি গ্রহণ বা বর্জন করতে পারেন।
আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞানী ও আরোগ্য দানকারী।