নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে ইসালে সওয়াবের জন্য দাওয়াত ও যিয়াফতের বিধান ।
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
একটি শরয়ী বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধানের জন্য আপনাদের শরণাপন্ন হয়েছি। বিষয়টি নিচে উপস্থাপন করা হলো:
আমাদের এলাকায় এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন যিনি আমার স্ত্রীর পক্ষের আত্মীয়। তাঁর (মরহুমের পরিবার তথা উপার্জন সক্ষম সন্তানেরা) শরীয়া পরিপন্থী মনে করে প্রচলিত 'মিলাদ' বা ৩ দিন, ৭ দিন, ৪০ দিন ইত্যাদি অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন। তবে তারা মৃত্যুর পর দিন-ক্ষণ হিসাব না করে সামনের শুক্রবার ১৯ তারিখে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।
উক্ত নির্দিষ্ট দিনে তারা গরিব-মিসকিন, আত্মীয়-স্বজন, মাদরাসার ছাত্র, মসজিদের মুসল্লি এবং এলাকার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে দাওয়াত করেছেন। সেখানে প্রথমে সমষ্টিগত দুয়া এবং দুয়া শেষে বড় পরিসরে খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে আমাকেও দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
১. মৃত ব্যক্তির ইসালে সওয়াবের নিয়তে এভাবে নির্দিষ্ট দিন বা বার নির্ধারণ করে সর্বস্তরের মানুষকে ডেকে দুয়া ও যিয়াফতের আয়োজন করার শরয়ী বিধান কী? এটি কি বিদআত?
২. এই ধরনের সুনির্দিষ্ট দিনের সামাজিক প্রথা বা দাওয়াতে একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে আমার অংশগ্রহণ করা এবং সেখানে খাবার খাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবে কি না?
৩. যদি দাওয়াত বর্জন করলে উক্ত পরিবারের সাথে আত্মীয়তা বা সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?
৪. সুন্নাহসম্মত উপায়ে মৃত ব্যক্তির জন্য ইসালে সওয়াব বা দান-সদকাহ করার সঠিক পদ্ধতিটি কী?
জানালে অনেক মুনাসিব হতো!
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে নিচে ক্রমান্বয়ে উত্তর প্রদান করা হলো।
১. নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে ইসালে সওয়াবের জন্য দাওয়াত ও যিয়াফতের বিধান
মৃত ব্যক্তির জন্য ইসালে সওয়াবের নিয়তে নির্দিষ্ট কোনো দিন (যেমন ৩য়, ৭ম, ৪০তম বা এখানে ১৯ তারিখ) নির্ধারণ করে ব্যাপক দাওয়াত ও খাওয়ার আয়োজন করা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। কারণ সাহাবা ও তাবি‘ঈনদের যুগে এ ধরনের কোনো রীতি ছিল না। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, এমন আয়োজন যদি শরী‘আতসম্মত কোনো দলীল ছাড়া নির্দিষ্ট দিনের সাথে জড়িত করা হয় তবে তা নাজায়েয ও বিদ‘আত। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৪২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৬৬)
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় (৪/২১৬-২১৭) স্পষ্টভাবে বলেন:
“মৃতের জন্য ৩য়, ৭ম, ৪০তম ইত্যাদি নির্দিষ্ট দিনে খানা ও দো‘আর আয়োজন করা বিদ‘আত। এমনকি যদি শুধু দো‘আর জন্যও মানুষ জমা করা হয়, তাও বিদ‘আত।”
এখানে প্রশ্নকর্তার বর্ণনায় পরিবারটি প্রচলিত ‘মিলাদ’ বা ৩/৭/৪০ দিন বর্জন করলেও তারা আরেকটি নির্দিষ্ট দিন (১৯ তারিখ) ঠিক করে ব্যাপক দাওয়াত দিচ্ছেন। এটিও মূলত একই শ্রেণীর আচরণ, কারণ নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণের কোন শার‘ঈ ভিত্তি নেই। তবে যদি তারা শুধু সাদকা বা খানা দেওয়ার জন্য লোক ডাকে এবং তাতে দো‘আ ও খাওয়া হয়, কিন্তু দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তা বিদ‘আত হবে না; কিন্তু ‘ইসালে সওয়াবের জন্য নির্দিষ্ট দিন’ বলে মনে করলে বিদ‘আত হয়ে যায়। (বেহেশতী জেওর, ১/২৪৫-২৪৬; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৩)
★তবে অনেক ইসলামী স্কলারগন বলেন যে, এক্ষেত্রে যেহেতু মাইয়্যিতের আত্মীয়রা প্রচলিত 'মিলাদ' বা ৩ দিন, ৭ দিন, ৪০ দিন ইত্যাদি অনুষ্ঠান বর্জন করে তারা মৃত্যুর পর দিন-ক্ষণ হিসাব না করে সামনের শুক্রবার ১৯ তারিখে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন,সুতরাং এটিকে দ্বীনের অংশ মনে না করলে ও আবশ্যকীয় মনে না করলে এটি জায়েজ। সেক্ষেত্রে এটি বিদ'আত হবেনা।
২. উক্ত আয়োজনে অংশগ্রহণ ও খাবার খাওয়ার বিধান
যদি সেই আয়োজনে অন্য কোনো শার‘ঈ খারাবি (যেমন গান-বাজনা, বেহায়াপনা, জিনা ইত্যাদি) না থাকে, শুধু দো‘আ ও খানা হয়, তাহলে শরী‘আতের দৃষ্টিতে অংশগ্রহণ করা এবং খাবার খাওয়া জায়েয হবে।
তবে কেহ কেহ বলেন বিদ‘আতী আয়োজন বলে জেনে অংশগ্রহণ করা মাকরূহ হতে পারে, যদি না তা শার‘ঈভাবে জরুরী হয়।
ইমদাদুল ফাতাওয়ায় (৪/২২০) বলা হয়েছে:
“এ ধরনের মাজলিসে যদি বিদ‘আতের আকীদা না থাকে এবং শুধু খানা ও দো‘আ হয়, তবে তাতে শরীক হওয়া জায়েয, তবে বিদ‘আতকে উৎসাহিত করার নিয়ত না করা।”
আপনার যদি সন্দেহ থাকে যে অংশগ্রহণ করলে তাদের বিদ‘আতী রীতিকে সমর্থন করা হবে, তাহলে না যাওয়া উত্তম। কিন্তু যদি পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে শুধু খাওয়া-দাওয়ার জন্য যাওয়া এবং পরে নরমভাবে তাদের সঠিক পদ্ধতি বোঝানো কর্তব্য।
৩. দাওয়াত বর্জন করলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে করণীয়
পরিবারের সাথে আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দাওয়াত বর্জন করলে সম্পর্ক নষ্ট হয় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী কাটাছিড়ির কারণ হয়, তাহলে শরী‘আত সম্পর্ক রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়—তবে শর্ত হলো, তাতে বিদ‘আতী কাজে অংশগ্রহণ বা তার সমর্থন না করা।
হানাফী ফিকহের নীতি:
الضرورات تبیح المحظورات (প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে অনুমতি দেয়), কিন্তু শুধু সামাজিক চাপ বা লজ্জা ‘প্রয়োজন’ হিসেবে গণ্য নয়। তবে যদি রক্তসম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন হওয়ার সীমায় পৌঁছে, তাহলে বিদ‘আতী মাজলিসে গিয়ে শুধু খাবার খেয়ে আসা জায়েয, তবে দো‘আতে শরীক হওয়া বা বিদ‘আতকে উৎসাহ দেয়া যাবে না। (আল-হিদায়া, ৪/৩৫৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮)
করণীয়:
- দাওয়াতে সাড়া দিন, কিন্তু বিদ‘আতী কার্যক্রম থেকে নিজেকে আলাদা রাখুন।
- শুধু খাওয়া শেষ করে চলে আসুন।
- পরে সুযোগ বুঝে তাদেরকে কিতাব ও হাদীসের আলোকে সঠিক পদ্ধতি বোঝাবেন।
৪. সুন্নাহসম্মত উপায়ে ইসালে সওয়াবের পদ্ধতি
মৃত ব্যক্তির জন্য ইসালে সওয়াবের অনেক সুন্নাহসম্মত উপায় আছে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট দিন-তারিখের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিম্নের কাজগুলো কোনো দিন নির্ধারণ না করেই সর্বদা করা যায়:
(ক) দান-সদকা করা—মৃতের পক্ষ থেকে গরিব-মিসকিনকে খাবার, টাকা-পয়সা, কাপড় ইত্যাদি দান করা। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৭৭০)
(খ) কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব দান করা—এটি জায়েয, তবে সম্মিলিত গোলকিরূপে নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে তিলাওয়াত করে দো‘আ করা। (ফাতাওয়া শামী, ৬/৪২৪)
(গ) মৃতের জন্য দু‘আ ও ইস্তিগফার করা—রাসূল (সা.) বলেছেন: “মৃত ব্যক্তির জন্য তার সন্তানের দু‘আ ও ইস্তিগফার উপকারে আসে।” (সহীহ মুসলিম)
(ঘ) নফল রোযা, নামায বা হজ্জ, উমরাহ—এসব ইবাদতের সওয়াব মৃতকে পৌঁছানো যায়। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯৫২)
(ঙ) এতেকাফ বা অন্য নেক কাজের সওয়াব দান—মৃতের জন্য সর্বোত্তম সাদকা হলো সাদকায়ে জারিয়া (যেমন মসজিদ নির্মাণ, কূপ খনন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)।
উল্লেখ্য: এই সব কাজে নির্দিষ্ট দিন, তারিখ বা বার ধার্য করা নবী করীম (সা.)-এর যুগে ছিল না। তাই কোনো দিন নির্ধারণ না করে ইচ্ছামত সময়ে করা উত্তম।
উপরোক্ত আলোচনার আলোকে আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. হ্যাঁ, নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে ইসালে সওয়াবের জন্য ব্যাপক দাওয়াত দেওয়া বিদ‘আত।
২. অংশগ্রহণ ও খাওয়া জায়েয যদি বিদ‘আতকে সমর্থন না করা হয়, তবে মাকরূহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্পর্কের তাগিদে যেতে পারেন, কিন্তু বিদ‘আতী কার্যক্রম থেকে দূরে থাকবেন।
৩. সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে দাওয়াত গ্রহণ করুন, পরে নরমভাবে বুঝানোর চেষ্টা করুন।
৪. সুন্নাহসম্মত উপায়: নির্দিষ্ট দিন ছাড়া যে কোনো সময় ব্যক্তিগতভাবে কুরআন তিলাওয়াত, দু‘আ, দান-সদকা ইত্যাদি করা এবং সওয়াব মৃতের দিকে দান করা।
والله تعالى أعلم بالصواب