স্বপ্নে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো সম্পর্কে

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3284
Questioner: Farha Sabrin
Question Asked: 31 Jul 2026, 09:44 AM
Reviewed & Published: 31 Jul 2026, 10:08 AM
Views: 33
Tokens: 5,414
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটা বিবাহিত মেয়ে বাচ্চা হচ্ছে না সে প্রায়সময় স্বপ্নে দেখে তার কোলে একটা বাচ্চা, সে বাচ্চাকে নিজের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে আদর করছে।এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কি?

Answer

স্বপ্নের ব্যাখ্যা: সন্তানহীন বিবাহিত নারীর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর স্বপ্ন

ভূমিকা

প্রশ্নকারিণী একজন বিবাহিত নারী যিনি সন্তান না হওয়ায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি প্রায়ই স্বপ্নে দেখেন যে তাঁর কোলে একটি শিশু রয়েছে এবং তিনি তাকে নিজের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন ও আদর করছেন। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন।

ইসলামী দৃষ্টিতে স্বপ্নের প্রকারভেদ

রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বপ্নকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন:

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله ﷺ: «الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: فَبُشْرَى مِنَ اللهِ، وَحَدِيثُ النَّفْسِ، وَتَخْوِيفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ»

"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) মনের কল্পনা (যা মানুষ নিজে চিন্তা করে), (৩) শয়তানের ভয় দেখানো।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২২৬৩; সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৯৮৬)

প্রশ্নের স্বপ্নের ব্যাখ্যা

যেহেতু প্রশ্নকারিণী সন্তান না হওয়ার কারণে মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং সন্তান লাভের গভীর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন, তাই এই স্বপ্নটি "হাদীসুন নাফস" (মনের কল্পনা) হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, যিনি কোনো বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তিত থাকেন, তাঁর মনে সেই বিষয়টিই স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন:

"যদি কোনো ব্যক্তি জাগ্রত অবস্থায় কোনো বিষয়ে ব্যস্ত থাকে, তবে সে তার স্বপ্নে তা-ই দেখে থাকে।" (তাফসীরুল আহলাম, ইবনে সীরীন)

তবে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদও হতে পারে। স্বপ্নে শিশুকে দুধ খাওয়ানো সাধারণত সন্তান লাভের সুসংবাদ, জীবিকার প্রাচুর্য, অথবা কোনো কল্যাণের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন:

"স্বপ্নে বুকের দুধ খাওয়ানো দেখা সন্তান লাভের ইঙ্গিত এবং জীবিকা ও কল্যাণের প্রতীক।" (তাফসীরুল আহলাম, ইবনে সীরীন; মুনতাখাবুল কালাম ফী তাফসীরিল আহলাম)

কুরআন ও হাদীসের আলোকে ধৈর্য ও আল্লাহর উপর ভরসা

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

﴿وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً﴾

"আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রূম: ২১)

আরও বলেন:

﴿لِّلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاءُ الذُّكُورَ﴾

"আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।" (সূরা আশ-শূরা: ৪৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে খাদীজা (রা.)-এর পর থেকে বহু বছর সন্তান না হওয়া নারীদের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা ছিল। আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা দেন না। এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ: إِمَّا أَنْ تُعَجَّلَ لَهُ دَعْوَتُهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَصْرِفَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا»

"যে মুসলিম এমন দোয়া করে যাতে কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের একটি দেন: হয় তার দোয়াটি তৎক্ষণাৎ কবুল করেন, অথবা তা তার জন্য আখিরাতে সঞ্চিত রাখেন, অথবা তার সমপরিমাণ কষ্ট দূর করে দেন।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং: ১০৭৩৩; মু'আত্তা মালিক, হাদীস নং: ৩৭৩)

হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফতোয়া আলমগীরী (ফতোয়া হিন্দিয়া)-তে স্বপ্ন সম্পর্কে বলা হয়েছে:

"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ — এটি প্রশংসনীয়, (২) মনের কল্পনা — এটি কোনো অর্থ বহন করে না, (৩) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো — এটি থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত।" (ফতোয়া আলমগীরী, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫৪)

রদ্দুল মুহতার-এ ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) স্বপ্ন সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নে ভালো কিছু দেখলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ মনে করা উচিত এবং মন্দ কিছু দেখলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে বলে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তবে ভালো স্বপ্ন দেখলে আশাবাদী হওয়া উচিত।

ইমদাদুল ফতোয়া-তে মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন:

"স্বপ্ন কোনো অবস্থাতেই শরীয়তের বিধান নির্ধারণের উৎস নয়। তবে ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর রহমতের আশা করা যেতে পারে।"

ফতোয়া উসমানী-তে মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

"সন্তান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি নেয়ামত। সন্তান না হলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকতে হবে। স্বপ্নে সন্তান দেখা ভালো লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, তবে এর উপর নির্ভর করা উচিত নয়।"

বেহেশতী জেওর-এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্বপ্ন প্রসঙ্গে লিখেছেন:

"যদি কেউ স্বপ্নে ভালো কিছু দেখে, তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ মনে করা উচিত এবং আশা করা উচিত যে আল্লাহ তা পূরণ করবেন। কিন্তু স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিত নয়, তাই স্বপ্নের উপর ভরসা না করে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা উচিত।"

মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) সূরা আশ-শূরা ৪৯ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন:

"সন্তান দান আল্লাহর ইচ্ছাধীন। অনেক সময় মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ে, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা উত্তম। ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমেই সন্তান লাভ করা যায়।"

ইসলামী নির্দেশনা ও উপদেশ

১. ধৈর্য ধারণ করা: সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নেয়ামত। প্রতিটি জিনিসের একটি নির্ধারিত সময় আছে। ধৈর্য ধারণ করা ইসলামের শিক্ষা।

২. দোয়া করা: হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়ার কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

﴿رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ﴾

"হে আমার রব! আমাকে একাকী রেখো না, তুমিই তো সর্বোত্তম ওয়ারিস।" (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯)

৩. আল্লাহর উপর ভরসা রাখা: আল্লাহ বলেন:

﴿وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾

"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)

৪. হতাশ না হওয়া: আল্লাহ বলেন:

﴿لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ﴾

"তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

উপসংহার

উক্ত স্বপ্নটি মূলত প্রশ্নকারিণীর মনের গভীর আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ, যা সন্তান লাভের তীব্র ইচ্ছা থেকে উদ্ভূত। তবে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদও হতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিত নয়, তবে ভালো স্বপ্ন দেখলে আশাবাদী হওয়া জায়েয। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি দান এবং এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তাই ধৈর্য ধারণ করা, দোয়া করা এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা কর্তব্য। এই স্বপ্নকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তান লাভের সুসংবাদ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা প্রশ্নকারিণীকে ধৈর্য ও সন্তান দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.