অফিস কলিগের সাথে পূর্বের সম্পর্ক, বিয়ে, ঋণ ও চাকরি ছাড়া নিয়ে ইসলামী ফিকহী সমাধান।
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রিয় বোন, আপনার বর্তমান অবস্থা ও মানসিক সংকট বুঝতে পারছি। আপনি আল্লাহমুখী হতে চান, তাওবা করতে চান, কিন্তু অতীতের সম্পর্ক ও বর্তমান অফিসের পরিবেশ আপনার জন্য কঠিন করে তুলেছে। নিচে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার প্রশ্নের উত্তর এবং পথনির্দেশনা দেওয়া হলো—
১. অতীতের সম্পর্ক ও বর্তমান অবস্থা
যে ছেলেটির সাথে আপনার সম্পর্ক ছিল, সে বিয়ে করে ফেলেছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে-পূর্ব প্রেমের সম্পর্ক সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহ। আপনি যদি ইতিমধ্যে এজন্য তাওবা করে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তা কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে মনে রাখবেন, তাওবা করার পর সেই সম্পর্কের স্মৃতি বা ভালোবাসা দীর্ঘদিন থাকতে পারে, কিন্তু এটাকে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে না। আল্লাহ বলেন,
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
২. অফিসে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলা
আপনি বলছেন, ওই ব্যক্তি আপনার সাথে নরমালি কথা বলে, যা আপনার ভালো লাগে না। ইসলামে বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যে অনর্থক কথা বলা, দেখা-সাক্ষাৎ করা বা সম্পর্ক রাখা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"তোমাদের মধ্যে কেউ যেন কোনো বেগানা নারীর সাথে একান্তে দেখা না করে। কারণ তৃতীয়জন থাকে শয়তান।" (সুনানে তিরমিযী: ২১৬৫)
অতএব, আপনার জন্য অফিসে ওই ছেলের সাথে কোনো অনাবশ্যক কথা বলা, নরমালি আলাপ করা বা দেখা-সাক্ষাৎ করা জায়েজ নয়। আপনি যদি এগুলো বন্ধ করতে না পারেন, তাহলে এর গুনাহ থেকে বাঁচতে চাকরি পরিবর্তনের কথা ভাবা উচিত।
৩. চাকরি ছাড়া না চালিয়ে যাওয়া?
আপনি চাকরি ছাড়তে চান, কিন্তু ব্যক্তিগত ঋণের কারণে পারছেন না। এখানে ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন—
১. ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা:
ইসলামে ঋণ পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরজ দায়িত্ব। ঋণগ্রস্ত অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নয়, যদি না অন্য কোনো বৈধ উপায়ে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ) নিয়ে তা আদায় করার ইচ্ছা রাখে, আল্লাহ তা আদায় করে দেন। আর যে তা নষ্ট করার ইচ্ছা রাখে, আল্লাহ তার সম্পদ ধ্বংস করে দেন।" (সহীহ বুখারী: ২৩৮৭)
২. চাকরি ছাড়ার আগে করণীয়:
আপনি যদি ঋণ মুক্ত হওয়ার জন্য চাকরি চালিয়ে যান, কিন্তু অফিসে ওই ব্যক্তির সাথে অনিবার্যভাবে দেখা হয়, তাহলে আপনাকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে—
- সীমা নির্ধারণ করে দিন: ওই ব্যক্তির সাথে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় অফিসিয়াল কথাবার্তা বলুন। ব্যক্তিগত আলাপ, নরমালি সরল কথোপকথন বন্ধ করুন। ইচ্ছাকৃতভাবে একান্তে কথা বলা, চোখে চোখ রাখা বা দেখা-সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলুন।
- পর্দা মেনে চলুন: অফিসে পূর্ণ পর্দা যথাযথভাবে মেনে চলুন। নিচু দৃষ্টি রাখুন। আল্লাহ বলেন,
"মু'মিন মহিলাদের বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
৩. চাকরি পরিবর্তনের পরিকল্পনা:
যদি সম্ভব হয়, ঋণ পরিশোধ শেষ করার পর বা সমান্তরালে অন্য চাকরির খোঁজ করুন। এমন পরিবেশে চাকরি করুন যেখানে এই ব্যক্তির সাথে দেখা না হয় অথবা পূর্ণ পর্দা বজায় রাখা সহজ হয়।
৪. হানাফী কিতাবের নির্দেশনা
হানাফী ফিকহের মূল কিতাব রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া শামী-তে এসেছে— বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যে এমনকি স্পর্শ বা দেখা-সাক্ষাৎও যে ফিতনার কারণ হয়, তা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব। আর ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বলা হয়েছে, চাকরি বা ব্যবসায় যদি হারাম কাজ লিপ্ত হতে হয় অথবা দ্বীনী আমল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটি ছেড়ে দিয়ে হালাল রিজিকের সন্ধান করা কর্তব্য, তবে যথাযথ পরিবর্তন ও তদবির করে।
৫. বিয়ে ও জীবনসঙ্গী সম্পর্কে চিন্তা
আপনি বলছেন, অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতে পারেন না, বিয়েতে ভালো লাগে না। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। একজন মুমিনের জন্য বিয়ে করা সুন্নত এবং নফল ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"বিয়ে আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৬)
অতএব, আপনি তাওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং বিয়ের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করুন। উপযুক্ত দ্বীনদার ও চরিত্রবান পুরুষের সাথে বিয়ে করলে আপনার মনের এই জড়তা কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।
৬. আল্লাহমুখী হওয়ার উপায়
আপনি যেহেতু আল্লাহমুখী হতে চান, তাই নিম্নোক্ত আমলগুলো করুন—
- তাওবা ও ইস্তিগফার: প্রতিদিন বেশি বেশি করে "আস্তাগফিরুল্লাহ" ও "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পড়ুন। নফল নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। সেই ব্যক্তির ভালোবাসা ও স্মৃতি থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে কাঁদুন ও দোয়া করুন।
- নিজেকে ব্যস্ত রাখুন: দ্বীনী ইলম অর্জন, ইসলামিক বই-পুস্তক পড়া, নফল ইবাদত এবং সৎকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
- সৎ সাথী নির্বাচন করুন: এমন দ্বীনদার বান্ধবী বা সাথী বানান যারা আপনাকে আল্লাহর পথে সাহায্য করবে, গুনাহ থেকে বিরত রাখবে।
সিদ্ধান্ত:
- ঋণ থাকা অবস্থায় চাকরি ছাড়বেন না। তবে চাকরিতে থাকলে ওই ব্যক্তির সাথে পর্দা মেনে চলুন, দেখা-সাক্ষাৎ ও অনর্থক কথাবার্তা বন্ধ করুন।
- ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করুন এবং ধীরে ধীরে অন্য চাকরির সন্ধান করুন, যেখানে আপনি নিরাপদ ও পবিত্র পরিবেশে কাজ করতে পারেন।
- বিয়ে ও জীবনসঙ্গী সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করুন এবং তাওবার পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। দ্বীনদার চাকরিরত স্বামী পেলে পরে আপনি পরিবার ও দ্বীন উভয় ক্ষেত্রেই সফল হবেন ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার ঋণ মুক্তি ও তাওবা কবুল করুন। আমীন।