ইস্তেখারার স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাই
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি একজনকে পছন্দ করতাম। তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এটা হারাম, আর হারাম সম্পর্কে থাকলে কোন নামাজ বা ইবাদত কবুল হয় না। এইজন্য আমরা দুজনেই হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছি এবং দুজনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা একে অপরকে আল্লাহর কাছে চাইবো এবং আমরা যদি একে অপরের জন্য কল্যাণকর হয় তবে আল্লাহ আমাদেরকে এক করে দিবেন। যদি আল্লাহ আমাদেরকে এক করে না দেন তাহলে ভেবে নিব আমরা একে অপরের জন্য কল্যাণকর ছিলাম না। আমার জন্য এখন অনেক বিয়ের প্রপোজাল আসছে। কিন্তু আমি যাকে পছন্দ করতাম তাকে ছাড়া আমি অন্য কারো সাথে বিয়ে করতে চাইছি না। তাই আমি এই পর্যন্ত ৫-৬ বার ইস্তেখারার নামাজ পড়ে দোয়া করেছি কোন পথটি আমার জন্য উত্তম জানার জন্য। কিন্তু কখনো কোন স্বপ্ন দেখি নি। কিন্তু গতকাল রাতে আবার ইস্তেখারার নামাজ পড়ে দোয়া করে ঘুমিয়েছি। সকালের দিকে একটা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নটা ততটা স্পষ্ট নয়। দেখি যাকে আমি পছন্দ করি সেই ছেলেটা নিচের ফ্লোরের সিঁরিতে দাঁড়িয়ে আছে সাদা টি-শার্ট পরে এবং আমি উপরের সিঁড়ি থেকে তাকে বকা দিয়ে দিয়ে নিচে নামছিলাম । তার সাথে আমি কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলাম সম্ভবত। আমি তাকে বকা দিচ্ছিলাম, আর সে আমাকে বলছিল, "চলো চলো "।এইটুকুই স্বপ্ন দেখেছি।
আজ সন্ধায় হঠাৎ তার সাথে আমার রাস্তায় দেখা হয় অনেক মাস পর কুয়েনসিডেন্সলি। আমি রাতে খেয়াল করলাম যে, যখন আমি তাকে আজকে রাস্তায় দেখেছিলাম তখনো সে সাদা টি-শার্ট পরা ছিল স্বপ্নে যেরকম দেখেছিলাম ঐরকম। কিন্তু সে সাদা টি-শার্ট খুব কমই পড়তো কিন্তু আজকে পড়াছিল। আমি এখন বুঝতে পারছি না স্বপ্নটার মিনিং কি? স্বপ্নটা পজিটিভ নাকি নেগেটিভ?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনাকে জানিয়ে দিতে চাই, আপনি হারাম সম্পর্ক থেকে তওবা করে বেরিয়ে এসেছেন এবং আল্লাহর কাছে হালাল পথে বিবাহের জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছেন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তাদের পথ দেখান। আপনার ইস্তেখারা করার প্রক্রিয়াটি সঠিক হয়েছে, এবং স্বপ্ন সম্পর্কে আপনার উদ্বেগ বোধগম্য।
ইস্তেখারার স্বপ্নের ব্যাখ্যা:
ইস্তেখারা করার পর স্বপ্ন দেখা জরুরি নয়। স্বপ্ন ইস্তেখারার ফলাফল নির্ধারণের জন্য আবশ্যকীয় শর্ত নয়। অনেক সময় স্বপ্ন না দেখেই অন্তরে একটি প্রবণতা বা স্পষ্টতা তৈরি হয়। আপনি যেমন বলেছেন, ৫-৬ বার ইস্তেখারা করেও কোনো স্বপ্ন দেখেননি, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে শেষবার যে স্বপ্নটি দেখেছেন, তার ব্যাখ্যা আমরা হানাফি ফিকহ ও ইসলামি মনোবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করছি।
স্বপ্নের বিবরণ: আপনি তাকে (ছেলেটিকে) নিচের ফ্লোরের সিঁড়িতে সাদা টি-শার্টে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন, আপনি উপরের সিঁড়ি থেকে তাকে বকা দিচ্ছেন এবং তিনি আপনাকে "চলো চলো" বলছেন। বাস্তবেও ঐ দিন তাকে সাদা টি-শার্টে দেখেছেন, যা খুব কমই পড়ে।
বিশ্লেষণ:
১. সাদা রং: সাদা সাধারণত পবিত্রতা, শান্তি ও ভালো কিছুর প্রতীক। কিন্তু স্বপ্নের প্রসঙ্গ ও আপনার আবেগের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।
২. উপর থেকে নিচে নামা (বকা দেওয়া + নামা): আপনি তাকে বকা দিচ্ছেন এবং নিচে নামছেন — এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে আপনার মধ্যে পূর্বের সম্পর্কের কারণে কিছু মানসিক দ্বন্দ্ব বা অভিমান এখনও রয়ে গেছে। বকা দেওয়া সাধারণত নেতিবাচক আবেগ প্রকাশ করে। তবে "চলো চলো" বলা তার পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার ইঙ্গিত।
৩. বাস্তবের সাথে মিল: স্বপ্নে তাকে সাদা টি-শার্টে দেখার পর বাস্তবেও ঐ দিন তাকে একই পোশাকে দেখা — এটি একটি সামঞ্জস্য। কিন্তু এটি স্বপ্নের ফলাফল নির্ধারণ করে না, বরং আপনার মনের সাথে বাস্তবের মিল মাত্র।
শেষ সিদ্ধান্ত: স্বপ্নটিকে সরাসরি পজিটিভ বা নেগেটিভ বলা কঠিন। কারণ ইস্তেখারার স্বপ্ন কখনো কখনো স্পষ্ট হয়, কখনো অস্পষ্ট। তবে হানাফি ফিকহের আলোকে, ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখলেও তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বরং আপনার অন্তরের প্রবণতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত। ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন, ইস্তেখারার ফলাফল প্রায়শই দিলের সাকিনা (অন্তরের প্রশান্তি) বা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, কিন্তু স্বপ্ন না দেখলেও অন্তরের প্রবণতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৮)
আপনার করণীয়:
১. আরও ইস্তেখারা করুন: অন্তর পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ইস্তেখারা চালিয়ে যান। তবে ইস্তেখারার সংখ্যা বা সময় নির্দিষ্ট নয় — সাতবার, পনেরবার বা চল্লিশ দিন পর্যন্ত করার বিধান হাদিসে নেই। বরং যতক্ষণ না অন্তর প্রশান্ত হয়, ততক্ষণ করতে পারেন।
২. পাত্রের দীনদারি ও চরিত্র দেখুন: আপনি তাকে পছন্দ করলেও বিয়ের জন্য তার দ্বীনদারি, আমানতদারি ও চরিত্রকে প্রাধান্য দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পাত্রী বাছাই করো দীনদারির ভিত্তিতে, নইলে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" (বুখারি, ৫০৯০)
৩. অভিভাবকের পরামর্শ নিন: আপনার ও তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলুন। বিয়ে কেবল দুজনের বিষয় নয়, বরং দুটি পরিবারের মিলন। শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ পথে বিয়ে সম্পন্ন করতে অভিভাবকের অনুমতি ও উপস্থিতি জরুরি।
৪. স্বপ্নের ওপর নির্ভর না করে অন্তরের প্রশান্তি দেখুন: স্বপ্নের ইতিবাচক বা নেতিবাচক ব্যাখ্যা না দিয়ে বরং আপনি যখন তার সঙ্গে বিয়ের কথা ভাবেন, আপনার অন্তর কি শান্তি পায়? নাকি অস্থিরতা অনুভব করেন? ইস্তেখারার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া, এবং এর ফল হয় অন্তরের প্রবণতা ও বাস্তব সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে।
সংক্ষিপ্ত জবাব:
আপনার স্বপ্নটি স্পষ্টভাবে পজিটিভ বা নেগেটিভ বলা যাচ্ছে না — এতে মিশ্র ইঙ্গিত রয়েছে। বকা দেওয়া (নেতিবাচক আবেগ) এবং "চলো চলো" (সহযোগিতা) একসাথে থাকায় বিষয়টি পরিষ্কার নয়। বাস্তবে তার সাদা টি-শার্ট পড়া একটি কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে। তাই এখন আপনার উচিত:
- ইস্তেখারা অব্যাহত রাখা।
- নিজের অন্তরের প্রবণতা যাচাই করা।
- তার দ্বীনদারি ও চরিত্র মূল্যায়ন করা।
- পরিবারের পরামর্শ নেওয়া।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণকর পথ উন্মুক্ত করুন এবং আপনার তওবা কবুল করুন। আমিন।
সূত্র:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ২য় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী), ২য় খণ্ড
- বাহিশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী), বিবাহ অধ্যায়
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন), ২/৪৬৮
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৯০