সেলোয়ার-কামিজ ও শাড়ীর রিসেলিং করা যাবে কি

Business and Job · Hanafi

Question No: 1481
Questioner: Tanzim Nova
Question Asked: 11 Jun 2026, 03:03 AM
Reviewed & Published: 11 Jun 2026, 04:57 AM
Views: 53
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
অনেক বিজনেস অনার তাদের শাড়ীর ও সেলোয়ার-কামিজ এর ছবি দিয়ে বলেন যে,,,
কেউ যদি উনার পেইজের শাড়ীও জামার ছবি অর্ডার আনতে পারে
মানে রিসেলিং করে তাহলে
যে বিক্রি করে দিলো কমিশন দিবে

এটা কি হালাল হবে

Answer

উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রশ্নটির সারমর্ম হলো: একজন ব্যবসায়ী তার পেইজে শাড়ি, সেলোয়ার-কামিজের ছবি দিয়ে ঘোষণা দেয় যে, কেউ যদি তার পেইজের ছবি শেয়ার করে অর্ডার আনতে পারে (অর্থাৎ রিসেলিং বা এজেন্টের মতো কাজ করে), তাহলে সে একটি নির্দিষ্ট কমিশন পাবে। এই পদ্ধতি ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বৈধ (হালাল) হবে কিনা।

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। নিম্নে হানাফি মাযহাবের দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান পেশ করা হলো।

শারঈ রায় ও দলিল

আপনার বর্ণিত পদ্ধতিটি ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে নিম্নলিখিত শর্তাবলী সাপেক্ষে জায়েয (বৈধ) ও হালাল হবে।

১. মৌলিক নীতি: জু'আলাহ (Commission/Ju'alah) ও সিমসারাহ (Brokerage)

ইসলামী ফিকহে "জু'আলাহ" বা পুরস্কারের বিনিময়ে কাজ করানোর একটি স্বীকৃত চুক্তি রয়েছে। আপনি যে পদ্ধতির কথা বলছেন, তা মূলত এজেন্সি বা দালালি (Simsarah) -এর অন্তর্ভুক্ত। কেউ যদি কোনো পণ্য বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে দেয় বা অর্ডার করিয়ে দেয়, তাহলে তার জন্য পরিশ্রমের বিনিময়ে নির্ধারিত কমিশন গ্রহণ করা জায়েয।

  • **ইবনে আবেদিন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার’-এ বলেছেন: "দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর জন্য তার মধ্যস্থতার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/১১১)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে বলা হয়েছে: "কেউ যদি বলে, 'যে ব্যক্তি আমার এই পণ্যটি বিক্রি করবে, সে এর জন্য এত পরিমাণ পাবে', তাহলে তা জায়েয।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৪/৩৮৮)

অতএব, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র পেইজের ছবি দেখিয়ে ক্রেতাকে অর্ডার করতে রাজি করাবে এবং বিক্রয়টি সম্পন্ন করবে, সে মধ্যস্থতাকারী (দালাল) হিসেবে গণ্য হবে এবং তার প্রাপ্য কমিশন নেওয়া হালাল।

২. প্রয়োজনীয় শর্তাবলী

এই পদ্ধতি হালাল হওয়ার জন্য নিচের শর্তগুলো পূরণ করা জরুরি:

ক) পণ্যের বৈধতা (Halal Product): যে পণ্যের ছবি শেয়ার করে অর্ডার আনা হচ্ছে, সেই পণ্যটি নিজে শরীয়তসম্মত হতে হবে। প্রশ্নে শাড়ি ও সেলোয়ার-কামিজের কথা বলা হয়েছে। যদি এই পোশাকগুলো শরীয়তের পর্দার নিয়ম অনুযায়ী পরিপন্থী তথা আঁটসাঁট, পাতলা, বা অশ্লীল না হয়, তাহলে তা বৈধ পণ্য। কিন্তু যদি পোশাকটি ফিট, ট্রান্সপারেন্ট বা ফ্যাশনের নামে নাজায়েয হয়, তাহলে তা বিক্রি করা এবং তার এজেন্ট হওয়াও নাজায়েয হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৩)

খ) স্পষ্ট ও নির্ধারিত কমিশন (Clear & Fixed Commission): কারো জন্য অর্ডার আনার বিনিময়ে কমিশনের পরিমাণ পূর্বেই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হবে (যেমন: বিক্রির ১০% বা প্রতি পিসে ২০০ টাকা)। কমিশনের পরিমাণে যদি কোনো অনিশ্চয়তা (Gharar) বা জুয়ার (Maysir) উপাদান থাকে, তাহলে তা নাজায়েয হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৬)

গ) মিথ্যা ও প্রতারণা পরিহার (No Deception): যে ব্যক্তি অর্ডার আনছে, সে অবশ্যই সততা বজায় রাখবে। সে পণ্যের ছবি সম্পর্কে মিথ্যা বলবে না, অলঙ্কৃত কথা বলে ক্রেতাকে ধোঁকা দেবে না। যদি পণ্যের কোনো ত্রুটি থাকে, সেটি গোপন করবে না। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আর একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে যে ব্যবসা কর তা ভিন্ন।” (সূরা আন-নিসা, ৪:২৯)

ঘ) মালিকানার হস্তান্তর (Transfer of Ownership): দালালি বা কমিশন নেওয়ার জন্য শর্ত হলো, মালিকের কাছ থেকে সম্পূর্ণ মালিকানা ও দখল ক্রেতার কাছে হস্তান্তরিত হতে হবে। আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে যেহেতু সরাসরি অর্ডার কোম্পানির কাছে যায় এবং পণ্য কোম্পানি ডেলিভারি দেয়, তাই এই শর্ত পূরণ হয়।

৩. হানাফি ফিকহের আলোকে সাবধানতা

  • শর্তহীন ইজারা: আপনার বর্ণনায় বলা হয়েছে "যে বিক্রি করে দিলো কমিশন দিবে"। এটি একটি Ju'alah (কর্ম সম্পাদনের শর্তে পুরস্কার) -এর মতো। যদি কেউ অন্যের পেইজের ছবি টেনে এনে নিজের পেইজে শেয়ার করে বা অন্যদের দেখায় এবং এর মাধ্যমে কোম্পানি বিক্রয় সম্পন্ন করে, তাহলে সে কমিশনের হকদার হবে। কোম্পানির জন্য এটি চুক্তির অংশ হিসেবে বাধ্যতামূলক।
  • উভয় পক্ষের সম্মতি: কমিশনের হার এবং শর্তাবলী উভয় পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য ও পরিষ্কার হতে হবে। কোম্পানি যদি ঝগড়া করে বা পরে কমিশন দিতে অস্বীকার করে, তাহলে সেটি জুলুম হবে।

সারসংক্ষেপ ও ফাতাওয়া

আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ করলে এটাকে হালাল ও জায়েয বলে গণ্য করা হবে। শর্তগুলো পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি:

  1. পণ্যটি (শাড়ি/সেলোয়ার-কামিজ) নিজে শরীয়তসম্মত হতে হবে (পর্দার হুকুম মেনে চলতে হবে)।
  2. কমিশনের পরিমাণ পূর্বে নির্ধারিত ও স্পষ্ট হতে হবে।
  3. কোনো ধরনের প্রতারণা, মিথ্যা বলার সুযোগ নেওয়া যাবে না।
  4. ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পণ্যের প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর নিশ্চিত হবে।

উল্লেখ্য: বর্তমানে অনলাইন মার্কেটিং এবং অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং (Affiliate Marketing) বা এজেন্টশিপ (Agency) আধুনিক ফিকহের পরিভাষায় "জু’আলাহ" বা "সিমসারাহ" (দালালি)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা নিম্নোক্ত ফাতাওয়ায় স্বীকৃত:

  • আহকামুল কুরআন (জাসাস) ও শরহু মা'আনিল আছার (তাহাবী) -এ দালালি ও কমিশনের বৈধতা পাওয়া যায়।
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এবং মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) -এর ফাতাওয়ায় আধুনিক যুগের অনলাইন কমিশনভিত্তিক ব্যবসাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, তবে পূর্বোক্ত শর্তাবলী পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানী, ইসলামী অর্থনীতি ও ফিকহুল বুয়ু’)

পরামর্শ: যেহেতু পোশাকের ব্যাপারটি নারীদের পর্দার সাথে জড়িত, তাই ব্যবসায়ী ও এজেন্ট উভয়েরই নিশ্চিত হওয়া উচিত যে তারা যে পোশাকের প্রচার ও বিক্রি করছে, তা পর্দার নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। একটি নাজায়েয পোশাকের বিপণন করে কমিশন করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

(والله أعلم بالصواب)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.