ইসলামের আলোকে নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার বিধান।
Business and Job · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তর:
নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া জায়েজ কি না, তা নির্ভর করে শরিয়তের শর্তাবলী পূর্ণ করার উপর। সাধারণভাবে, শরিয়ত নারীদের জন্য বিদেশ ভ্রমণকে কঠোরভাবে শর্তযুক্ত করেছে, বিশেষত যদি তা মাহরাম ছাড়া হয়। নিচে বিশদ আলোচনা দেওয়া হলো:
১. মাহরাম ছাড়া ভ্রমণ:
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"لاَ تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلاَّ مَعَ ذِي مَحْرَمٍ"
"কোনো নারী এক দিন ও এক রাতের দূরত্বে (প্রায় ৮০ কিমি) সফর করবে না, যদি না তার সাথে মাহরাম (পুরুষ অভিভাবক) থাকে।" (বুখারি: ১০৮৮, মুসলিম: ১৩৩৯)
অন্য হাদিসে এসেছে:
"لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ، وَلَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ"
"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, যদি না তার সাথে মাহরাম থাকে। আর কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।" (বুখারি: ১৮৬২, মুসলিম: ১৩৪১)
শাইখ ইবন বাজ (রহ.) বলেছেন:
"মাহরাম ছাড়া নারীর জন্য বিদেশ ভ্রমণ জায়েজ নয়, যদিও তা শিক্ষার জন্য হয়। কারণ মাহরাম ছাড়া ভ্রমণ ফিতনার দ্বার উন্মুক্ত করে এবং হাদিসে তা নিষিদ্ধ।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ৯/২৬৪)
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেছেন:
"শিক্ষার জন্য মাহরাম ছাড়া নারীর বিদেশ ভ্রমণ কখনোই জায়েজ নয়, কারণ এতে দীন ও ইজ্জত হারানোর আশংকা থাকে।" (সিলসিলা সহিহা: ১/২৮৬)
২. অন্যান্য শর্ত:
যদি মাহরাম (স্বামী, পিতা, ভাই, পুত্র ইত্যাদি) সাথে যান এবং নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ হয়, তবে বিদেশ ভ্রমণ জায়েজ হতে পারে:
- পূর্ণ পর্দা (হিজাব ও জিলবাব) পরিধান করা।
- নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া (যেমন: কোনো ফিতনা বা ধর্ষণের আশংকা না থাকা)।
- ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর করা (যেমন: ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া) এবং দুনিয়াবি শিক্ষার চেয়ে দীনের প্রয়োজনীয়তা বেশি মনে করা।
তবে অধিকাংশ সালাফি আলেম (যেমন: শাইখ ইবন উসাইমিন, শাইখ সালেহ আল-ফাওজান) বলেছেন:
"আধুনিক সময়ে নারীদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাহরাম থাকলেও অমুসলিম দেশে ফিতনা ও দীনহানির আশংকা থাকে। তাই ইসলামি দেশগুলিতেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।"
৩. মুসলিম দেশে যাওয়ার শর্ত:
যদি মুসলিম দেশে (যেমন: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া) যাওয়া প্রয়োজন হয়, তবে নিম্নোক্ত শর্ত মানতে হবে:
- মাহরাম সঙ্গী থাকতে হবে (মা-বোনের মতো সাথে যেতে পারবে না)।
- পর্দা ও লজ্জাস্থান রক্ষা করতে হবে।
- ফিতনা মুক্ত পরিবেশ থাকতে হবে (যেমন: মিশ্র শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকা)।
শাইখ ইবন উসাইমিন (রহ.) বলেছেন:
"যেসব ইসলামি দেশে পর্দা ও শালীনতার প্রতি যত্ন নেওয়া হয় এবং মিশ্র শিক্ষার অনুমতি নেই, সে দেশে মাহরামসহ যাওয়া জায়েজ হতে পারে। তবে অমুসলিম দেশে যাওয়া অনুমোদিত নয়।" (লিকাউল বাব আল-মাফতুহ: ২/২৫৬)
সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশে শুধুমাত্র নারীদের জন্য কলেজ বা ইউনিভার্সিটি (যেমন: প্রিন্সেস নওরাহ ইউনিভার্সিটি) থাকলে তা উত্তম।
৪. অমুসলিম দেশে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা:
অমুসলিম দেশে (যেমন: যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, কানাডা) যাওয়া সাধারণত নিষেধ, কারণ:
- পর্দা ও হিজাবের ব্যাপক লঙ্ঘন।
- মিশ্র শিক্ষার ফিতনা।
- ইসলামি পরিবেশ ও ইবাদতের ব্যাঘাত।
শাইখ ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেছেন:
"মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস করা অতি নিকৃষ্ট, কারণ সেখানে দীন ও চরিত্র ধ্বংস হওয়ার আশংকা বেশি।" (মাজমু' আল-ফাতাওয়া: ২২/১৯)
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেছেন:
"পশ্চিমা দেশে নারীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা জায়েজ নয়, যদি না তা দীন রক্ষার জন্য অপরিহার্য হয় এবং মাহরাম ও পর্দার শর্ত পূর্ণ হয়।" (সিলসিলা হুদা ওয়া নূর: ২৮৪)
বিকল্প প্রস্তাবনা:
- দেশে শিক্ষা গ্রহণ: নিজ দেশের ইসলামি প্রতিষ্ঠান বা অনলাইন কোর্স (যেমন: আল-আযহার, মদিনা ইউনিভার্সিটির অনলাইন) ব্যবহার করা।
- মাহরামসহ বিদেশ: যদি অত্যন্ত প্রয়োজন হয়, তাহলে মাহরাম (স্বামী/পিতা) সাথে নিয়ে মুসলিম দেশে (যেমন: মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া) যাওয়ার অনুমতি আছে।
- শুধু প্রয়োজনীয় জ্ঞান: দুনিয়াবি জ্ঞানের চেয়ে দ্বীনি জ্ঞান অগ্রাধিকার দেওয়া।
সংক্ষেপে উত্তর:
- নারীদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ (যে কোনো শিক্ষার জন্য) জায়েজ নয়, যদি না মাহরাম সঙ্গী থাকে এবং পূর্ণ পর্দা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
- শুধু মুসলিম দেশে (যেমন: সৌদি আরব, মালয়েশিয়া) যাওয়া উত্তম, তবে মাহরাম ও পর্দা শর্ত।
- অমুসলিম দেশে যাওয়া অধিকাংশ আলেমের মতে নিষেধ, বিশেষত পর্দা ও ফিতনার কারণে।
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।