হানাফি ফিকহ অনুসরণকারী ব্যক্তির জন্য আকীদায় সরাসরি কুরআন-হাদীস গ্রহণ কি জায়েজ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
এতে কি জায়েজ হবে।
যেমন :আল্লাহ হাতে আছে কেমন তা জানি না,খারাপ কাজে ঈমান বাড়ে কমে
Answer
উত্তর
প্রিয় প্রশ্নকারী,
আপনি হানাফি ফিকহ অনুসরণ করেন এবং আকীদার ক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন ও সহীহ হাদীসকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এটি একটি উত্তম প্রবণতা, তবে কিছু বিষয় বিস্তারিত বোঝা জরুরি। নিম্নে আপনার উদাহরণসহ বিশদ আলোচনা পেশ করছি।
১. সরাসরি কুরআন-হাদীস গ্রহণের বৈধতা
আকীদার মূল উৎস কুরআন ও সহীহ হাদীস। এ বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-সহ সালাফে সালেহীনের অবস্থান হলো—আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) কুরআন ও হাদীসে যেভাবে এসেছে, সেভাবে বিশ্বাস করা, তার প্রকৃতি সম্পর্কে অতিরিক্ত প্রশ্ন না করা (বিলা কাইফ) এবং তাশবীহ (সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য) থেকে বিরত থাকা। এটি হানাফি মাতুরিদী আকীদারও মূলনীতি। তাই আপনার এই পদ্ধতি জায়েজ এবং প্রশংসনীয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি সাহাবী ও সালাফের বুঝের বিপরীত না যান।
ইমাম তাহাবী (রহ.) তার বিখ্যাত আকীদা গ্রন্থে বলেন:
«وَلَا تُحَدُّ صِفَاتُهُ تَعَالَى عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ، وَلَا تُكَيَّفُ، وَلَا تُشَبَّهُ بِخَلْقِهِ»
(আল্লাহর গুণাবলি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বর্ণনা করা যায় না, তার অবস্থা কল্পনা করা যায় না এবং সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা যায় না।)
(শরহু আকীদাতিত তাহাবিয়া, ১/২২-২৩)
তবে ‘কারো মত গ্রহণ না করা’ বলতে যদি আপনি ইমাম বা মুজতাহিদের গৃহীত নীতিকে সম্পূর্ণ বর্জন করতে চান, তাহলে তা ঠিক নয়। কারণ সাহাবী, তাবেঈন ও ইমামগণের সমষ্টিগত বুঝ (ইজমা) আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আপনি সরাসরি কুরআন-হাদীস নেবেন, কিন্তু তাদের বুঝের আলোকে নেবেন—এটাই সালাফের পদ্ধতি।
২. আপনার প্রথম উদাহরণ: ‘আল্লাহর হাত আছে, কেমন তা জানি না’
এটি সম্পূর্ণ হানাফি আকীদার অনুরূপ। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
«لَهُ يَدٌ وَوَجْهٌ وَنَفْسٌ، كَمَا ذَكَرَ فِي الْقُرْآنِ، هِيَ صِفَاتُهُ بِغَيْرِ كَيْفٍ»
(আল্লাহর হাত, মুখমণ্ডল ও আত্মা আছে, যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে—এগুলো তাঁর গুণাবলি, তবে কোনো অবস্থা কল্পনা না করে।)
(আল-ফিকহুল আকবার, ১/৩০২)
এটি ‘ইসবাতুন বিলা তাশবীহ’ (সাদৃশ্য ছাড়া সাব্যস্ত করা) এবং ‘তাফবীদ’ (অবস্থা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা)-এর নীতি। সুতরাং আপনার বিশ্বাস শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য।
৩. আপনার দ্বিতীয় উদাহরণ: ‘খারাপ কাজে ঈমান বাড়ে-কমে’
হানাফি মাযহাবের মূল অবস্থান হলো—ঈমানের মূল (আসল) বাড়ে না কমে না; ঈমান এক এবং অপরিবর্তনীয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) আল-ফিকহুল আকবারে বলেন:
«الْإِيمَانُ لَا يَزِيدُ وَلَا يَنْقُصُ»
(ঈমান বাড়ে না, কমে না।)
(আল-ফিকহুল আকবার, ১/২৫)
তবে ইমাম তাহাবী (রহ.)-সহ অনেক হানাফি ইমাম বলেন, ঈমানের দৃঢ়তা (ইয়াকীন) ও আমল বাড়ে-কমে। অর্থাৎ, ভালো কাজে ঈমানের আলো ও দৃঢ়তা বাড়ে, পাপে তা কমে যায়। কিন্তু মৌলিক বিশ্বাস (তাসদীক) সর্বদা একই থাকে।
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
«وَلَا نَقُولُ إِنَّ الْإِيمَانَ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ، بَلْ نَقُولُ إِنَّ الْإِيمَانَ يَزِيدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ»
(আমরা বলি না যে, ঈমান বাড়ে-কমে; বরং বলি, আনুগত্যে ঈমান বাড়ে এবং পাপে কমে।)
(তাবইনুল আদিল্লা, পৃষ্ঠা ২৮)
সাধারণ মানুষের ভাষায় ‘ঈমান বাড়ে-কমে’ বললে তা দোষণীয় নয়, যদি এর অর্থ বুঝানো হয় যে, আমলের মাধ্যমে ঈমানের প্রভাব ও দৃঢ়তা বাড়ে-কমে। কিন্তু শাস্ত্রীয় হানাফি বক্তব্য হলো—ঈমানের মূল (তাসদীক) অপরিবর্তনীয়। আপনার উক্তি ‘খারাপ কাজে ঈমান বাড়ে-কমে’ কিছুটা অস্পষ্ট। ভালো কাজে ঈমানের নূর ও ইয়াকীন বাড়ে, পাপে তা কমে—এটি সালাফের অনেকের মতে গ্রহণযোগ্য। তবে হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ অনুযায়ী বললে, ঈমানের আসল বৃদ্ধি-হ্রাস হয় না; বরং পূর্ণতা ও দুর্বলতা ভিন্ন।
চূড়ান্ত সুপারিশ
আপনার ভাবনা ও পদ্ধতি মৌলিকভাবে সঠিক। তবে কয়েকটি বিষয় মনে রাখবেন:
- আকীদার ক্ষেত্রে শুধু কুরআন-হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলেই হবে না; সাহাবী, তাবেঈন ও ইমামগণের ব্যাখ্যা ও ইজমা (সর্বসম্মত মত) অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
- হানাফি ফিকহ ও হানাফি আকীদা একে অপরের পরিপূরক। হানাফি আকীদা (মাতুরিদি) কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার ওপর ভিত্তিশীল। তাই সরাসরি কুরআন-হাদীস নেওয়া এবং হানাফি ফিকহ অনুসরণ করা—দুটিই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ‘কারো মত গ্রহণ না করা’ বলতে আপনি যদি ইমামদের ইজতিহাদ ও দলিলভিত্তিক সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করেন, তবে তা সঠিক নয়। ইমামগণ দলিলের মাধ্যমেই মত দিয়েছেন। তাদের মতকে বুঝে গ্রহণ করা জরুরি, বিশেষ করে যেসব বিষয়ে কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই।
সারকথা: আপনার আকীদা গ্রহণের মূলনীতি জায়েজ, তবে উদাহরণ হিসেবে ‘খারাপ কাজে ঈমান বাড়ে-কমে’—এই বাক্যটি পরিষ্কার করে বলা দরকার যে, ঈমানের দৃঢ়তা ও আমল বাড়ে-কমে, কিন্তু ঈমানের আসল (তাসদীক) বাড়ে না কমে না। বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার (১/৪৮) এবং মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৭৫) দ্রষ্টব্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক আকীদা ও আমলের তাওফিক দিন।