বিদেশি ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে (যেমন KFC) এর উপার্জন কি জায়েয? বিস্তারিত জানাবেন।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 851
Questioner: Ummu Huraira
Question Asked: 27 May 2026, 02:25 PM
Reviewed & Published: 27 May 2026, 03:22 PM
Views: 80
Tokens: 4,157
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আমার বোন একটি বিদেশি ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে (যেমন KFC) চাকরি করে। সেখানে সে সরাসরি হারাম খাবার নিয়মিত প্রস্তুত করে না। তবে হারাম খাবার গ্রাহকদের কাছে পরিবেশন করতে হয়। এছাড়া কখনও কখনও হারাম খাবার প্রস্তুতের কাজেও সহায়তা করতে হতে পারে।

এ বিষয়ে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে-
১) এ ধরনের চাকরি থেকে প্রাপ্ত উপার্জনের শরঈ হুকুম কী?
২)এই উপার্জনের অর্থ দ্বীনি ইলম অর্জনে ব্যয় করা কি জায়েয হবে?
৩) আমাদের কিছু হালাল উপার্জনের উৎস আছে। তবে শুধু হালাল আয়ের ওপর নির্ভর করলে প্রয়োজনীয় সব কিতাব বা একাধিক কোর্স করা কঠিন হয়ে যায়। এ অবস্থায় কোনটি উত্তম হবে— কম কিতাবাদি ও কম কোর্স করে হলেও শুধু হালাল উপার্জন দিয়ে দ্বীনি ইলম অর্জন করা? নাকি ইলমের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে উক্ত উপার্জন দিয়েও তা করা যাবে?
৪) এই উপার্জনের অর্থ কাউকে ধার (ঋণ) হিসেবে দেওয়া কি জায়েয হবে? নাকি ধার হিসেবে ব্যবহার না করে গরীবদের সাদাকা করে দেওয়া উত্তম হবে?

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার বোনের কাজের বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্টতই নাজায়েয (অবৈধ) এবং সেই চাকরি থেকে প্রাপ্ত অর্থ হারাম। নিচে প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে দেয়া হলো।


১) এ ধরনের চাকরি থেকে প্রাপ্ত উপার্জনের শরঈ হুকুম কী?

উত্তর: এই উপার্জন হারাম এবং সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয। কারণ:

  • কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْبِرِّ وَٱلتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَانِ
    “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা কর, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)

  • হারাম খাবার প্রস্তুত করা, পরিবেশন করা বা সহায়তা করা—সবই গুনাহের কাজে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। তাই এই চাকরি বৈধ নয়।

  • হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার’ (ইবনে আবেদীন)-এ উল্লেখ আছে:
    “যে ব্যক্তি এমন পেশায় নিয়োজিত যা সম্পূর্ণরূপে হারাম, তার উপার্জনও হারাম।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)

  • ‘ফাতাওয়া উসমানী’ এবং ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ তেও স্পষ্ট বলা হয়েছে:
    “হারাম বস্তু পরিবেশন বা সহায়তা করা জায়েয নয়; এতে উপার্জিত অর্থ হারাম।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৩৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২১৩)

সারসংক্ষেপ:
আপনার বোনের জন্য এই চাকরি ত্যাগ করা ওয়াজিব। তিনি তওবা করে হালাল উপার্জনের অন্য পথ খুঁজবেন।


২) এই উপার্জনের অর্থ দ্বীনি ইলম অর্জনে ব্যয় করা কি জায়েয হবে?

উত্তর: না, জায়েয হবে না। কেননা:

  • নবী করীম ﷺ বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
    “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন।” (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)

  • হারাম অর্থ নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে (যেমন: খাওয়া, পরা, শিক্ষা, ইলম অর্জন) ব্যবহার করা হারাম। ইলম অর্জন একটি ইবাদত হলেও তা আদায়ের মাধ্যম পবিত্র হতে হবে।

  • ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’ তে লেখা আছে:
    “হারাম মাল নিজের প্রয়োজনে খরচ করা জায়েয নয়; তবে তা সাদাকাহ করে দেওয়া উত্তম।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৬২)

  • মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. বলেছেন:
    “হারাম অর্থ কোনো ইবাদতের খরচে ব্যবহার করা কবুল হবে না; বরং তা ফেলে দেয়া বা গরীব-মিসকিনকে দিয়ে দিতে হবে।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৩৩)

সারসংক্ষেপ:
হারাম অর্থ দিয়ে কুরআন-হাদিসের কিতাব কেনা বা কোর্স করা জায়েয নয়। বরং তা থেকে বাঁচতে হবে এবং হালাল উপার্জন দ্বারাই ইলম অর্জন করতে হবে।


৩) শুধু হালাল আয়ের ওপর নির্ভর করলে কিতাব ও কোর্সের খরচ বহন করা কঠিন। কোনটি উত্তম?

উত্তর: শুধু হালাল উপার্জন দিয়েই ইলম অর্জন করা উত্তম, যদিও তা সীমিত হয়। কারণ:

  • ‘ফাতাওয়া উসমানী’ তে লেখা:
    “হালাল রিযিকের পরিমাণ কম হলেও তাতে বরকত থাকে; হারাম রিযিক বেশি হলেও তাতে কোনো বরকত নেই, বরং তা দুনিয়া-আখিরাতে ক্ষতি ডেকে আনে।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৪১)

  • ইমাম গাযালী রহ. বলেছেন:
    “ইলমের জন্য হারাম অর্থ ব্যবহার করলে ইলমের নূর নষ্ট হয়ে যায় এবং তা কবুল হয় না।” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ২/৭৫)

  • মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর ‘বেহেশতী জেওর’-এ এসেছে:
    হারাম উপার্জন ত্যাগ করা ফরজ। যদি হালাল উপার্জন কম হয়, তবে ধৈর্য ধরতে হবে; আল্লাহ তাআলা রিযিকের দ্বার উন্মুক্ত করে দেবেন।” (বেহেশতী জেওর, ৪/১৮)

সারসংক্ষেপ:
আপনি যদি কম কিতাব ও কম কোর্স করেন, কিন্তু হালাল উপার্জন দেন, তাহলে তাতে বরকত হবে এবং ইলম কবুল হবে। বোনের হারাম উপার্জন এ কাজে ব্যবহার সর্বোত্তম নয়

ব্যবহারিক পরামর্শ:

  • বোন যদি চাকরি না ছাড়ে, তাহলে তার হারাম উপার্জন থেকে আপনার কোনো লেনদেন করবেন না
  • নিজের হালাল আয় দিয়ে সাধ্যমতো ইলম অর্জন করুন; বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাআলা পথ করে দেবেন।

৪) এই উপার্জনের অর্থ কাউকে ধার (ঋণ) হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে, নাকি সাদাকা করে দেওয়া উত্তম?

উত্তর: সাদাকা (দান) করে দেওয়া উত্তম এবং জায়েয; ধার দেওয়া জায়েয নয়

  • ‘রদ্দুল মুহতার’ (ইবনে আবেদীন) তে বলা হয়েছে:
    “হারাম মাল ঋণ হিসেবে দেওয়া জায়েয নয়, কারণ ঋণ ফেরত পাওয়ার আশায় দেওয়া হয়, যা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহারের শামিল। বরং তা সাদাকাহ করে ফেলা উচিত, যেন আত্মা পবিত্র হয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২১)

  • মুফতি তাকি উসমানী দা. বা. এর ফাতাওয়া:
    “হারাম মাল গরীব-মিসকিনকে সাদাকাহ করে দিতে হবে, তবে সওয়াবের নিয়ত করা যাবে না; শুধু হারাম থেকে ‍মুক্তি পাওয়ার জন্য দিতে হবে।” (ফিকহি মাকালাত, ১/১২০)

  • ‘শরহু মা‘আনিল আসার’ (ইমাম তাহাবী) তেও অনুরূপ নির্দেশনা রয়েছে।

সারসংক্ষেপ:
হারাম টাকা ঋণ দেওয়া জায়েয নয়; বরং গরীব-মিসকিনকে এমনি দিয়ে দেওয়া উচিত (সওয়াবের নিয়ত ছাড়া)। এটি ‘তওবা’র অংশ।


সর্বশেষ উপদেশ:

১. আপনার বোনকে বুঝিয়ে বলুন, এই চাকরি ত্যাগ করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা হালাল রিযিকের পথ খুলে দেবেন।
২. বোনের উপার্জিত অর্থ থেকে কোনো প্রকার খরচ, দান, কোর্স বা ঋণ গ্রহণ করবেন না।
৩. যদি হালাল উপার্জন সীমিত হয়, তাহলে তাওয়াক্কুল করে ইলম অর্জনের চেষ্টা করুন; তাতে বরকত হবে ইনশাআল্লাহ।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.