“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে বা তাঁর নামে কুরবানী করা কি শরীয়ত সম্মত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা: কুরআন, হাদীস ও হানাফি মাযহাবের আলোকে
প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে:
হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে বা তাঁর নামে কুরবানী করা শরীয়তসম্মত ও মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। এটি একটি নফল ইবাদত, যা সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত এবং হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম এটাকে জায়েজ ও সওয়াবের কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এটি ওয়াজিব বা সুন্নতে মুওয়াক্কাদা নয়।
কুরআনের দলিল:
কুরআনে পাক ইরশাদ হয়েছে:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব, আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।”
(সূরা আল-কাউসার, ১০৮:২)
এই আয়াতে শুধু আল্লাহর নামেই কুরবানী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি যদি রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে আল্লাহর নামেই কুরবানী করে, তবে তা এই আয়াতের আওতাভুক্ত হবে। এখানে রাসুল (সা.)-এর নাম শুধু নিয়ত বা সওয়াব পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
হাদীসের দলিল:
১. হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনা:
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَقُومَ عَلَى بُدْنِهِ، وَأَنْ أَتَصَدَّقَ بِلَحْمِهَا وَجُلُودِهَا وَأَجِلَّتِهَا، وَأَنْ لَا أُعْطِيَ الْجَزَّارَ مِنْهَا شَيْئًا، وَقَالَ: نَحْنُ نُعْطِيهِ مِنْ عِنْدِنَا
“রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে তার কুরবানীর উটগুলোর তত্ত্বাবধানের আদেশ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, তার গোশত, চামড়া ও জিনপাতি সদকা করে দাও এবং কসাইকে এর কিছু দিও না, বরং আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে তাকে দেব।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৭১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৭)
এই হাদীসে দেখা যায়, রাসুল (সা.) নিজের কুরবানীর জন্য আলী (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখানে প্রমাণিত হয় যে, নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েজ।
২. হযরত জাবির (রা.)-এর বর্ণনা:
ضَحَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ، فَقَالَ: إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا، وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ، وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ، عَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ
“রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি দুম্বা কুরবানী করলেন এবং বললেন: ‘আমি আমার চেহারা তার দিকে ফিরিয়েছি যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, ইবরাহীমের মিল্লাতের উপর এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজগতের রব, তার কোনো শরীক নেই। আমি এরই আদেশপ্রাপ্ত এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। হে আল্লাহ! এটি তোমার পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য। এটি মুহাম্মদ ও তার উম্মতের পক্ষ থেকে।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৭৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩১২১)
এই হাদীসে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, রাসুল (সা.) নিজের জীবদ্দশায় নিজের ও উম্মতের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা বৈধ এবং তিনি নিজেই তা করেছেন।
৩. হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ضَحَّى بِكَبْشٍ وَقَالَ: هَذَا عَمَّنْ لَمْ يُضَحِّ مِنْ أُمَّتِي
“রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি দুম্বা কুরবানী করে বললেন: ‘এটি আমার উম্মতের পক্ষ থেকে যারা কুরবানী করতে পারেনি।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদীস: ১৫২১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২৫৩২)
এই হাদীসে রাসুল (সা.) নিজের উম্মতের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন। অতএব, উম্মতের পক্ষ থেকে নবী (সা.)-এর পক্ষে কুরবানী করাও এর বিপরীত দিক থেকে বৈধ প্রমাণিত হয়।
হানাফি মাযহাবের দলিল ও মতামত:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, জীবিত ব্যক্তি যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তবে তা জায়েজ এবং সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। তবে এটি ওয়াজিব নয়, বরং নফল। রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করাও এই হুকুমের আওতাভুক্ত। কিন্তু রাসুল (সা.) জীবিত থাকাবস্থায় তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করা এবং তাঁর ওফাতের পর করা উভয়ই জায়েজ।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত:
তাঁরাও এটাকে জায়েজ বলেছেন। তবে তাঁরা বলেন, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তা ওয়াসিয়ত বা অসিয়তের মাধ্যমে করা ভালো। কিন্তু নফলভাবে করলেও তা গ্রহণযোগ্য।
ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর মত:
ইমাম তাহাবী (রহ.) তাঁর কিতাব ‘শারহু মাআনিল আসার’ -এ উল্লেখ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনগণ রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন এবং এটাকে মুস্তাহাব মনে করতেন।
ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর মত:
ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ -এ লিখেছেন:
وَيَجُوزُ التَّضْحِيَةُ عَنِ الْمَيِّتِ بِوَصِيَّةٍ وَبِغَيْرِ وَصِيَّةٍ، وَيَصِلُ ثَوَابُهَا إِلَيْهِ عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ
“মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েজ, তা অসিয়তের মাধ্যমে হোক বা অসিয়ত ছাড়াই হোক। এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে – এটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মত।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর মত:
মুফতি শফী (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআন’ -এ লিখেছেন:
“রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েজ এবং এটি মুস্তাহাব। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনগণ তা করতেন। তবে এটি কোনো ওয়াজিব কাজ নয়।”
(মাআরিফুল কুরআন, ৮/৭৬৫)
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মত:
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানী’ -তে লিখেছেন:
“রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা বৈধ এবং এর দ্বারা সওয়াব পাওয়া যায়। তবে এটি ওয়াজিব বা সুন্নতে মুওয়াক্কাদা নয়। কেউ যদি নিজের কুরবানীর পাশাপাশি নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে আলাদাভাবে কুরবানী করে, তবে তা খুবই উত্তম।”
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫১)
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে উল্লেখ আছে:
وَلَوْ ضَحَّى عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجُوزُ وَيَصِلُ ثَوَابُهَا إِلَيْهِ
“যদি কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তবে তা জায়েজ এবং এর সওয়াব তাঁর কাছে পৌঁছে।”
(ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৫/২৯৯)
শারহু মাআনিল আসার:
ইমাম তাহাবী (রহ.) তাঁর কিতাবে লিখেছেন:
وَقَدْ ضَحَّى الصَّحَابَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ وَفَاتِهِ
“সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন।”
(শারহু মাআনিল আসার, ৪/১৮৭)
হানাফি মাযহাবের ফকিহগণের বিস্তারিত মত:
| ইমাম/ফকীহ | মতামত | |---|---| | ইমাম আবু হানীফা (রহ.) | জায়েজ, নফল হিসেবে সওয়াব পৌঁছে। | | ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) | জায়েজ, অসিয়তসহ ও অসিয়ত ছাড়া উভয় অবস্থায়। | | ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) | জায়েজ, তবে নিজের ও মৃতের জন্য পৃথক কুরবানী উত্তম। | | ইমাম তাহাবী (রহ.) | সাহাবী ও তাবেঈনদের আমল দ্বারা মুস্তাহাব প্রমাণিত। | | ইবনে আবেদীন (রহ.) | জায়েজ, সওয়াব পৌঁছে আহলে সুন্নতের মত। | | মুফতি শফী (রহ.) | মুস্তাহাব, তবে ওয়াজিব নয়। | | মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) | বৈধ, উত্তম আমল। | | ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী | জায়েজ, সওয়াব পৌঁছে। |
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- নিয়ত: কুরবানী করার সময় নিয়ত করতে হবে যেন আল্লাহর নামে এবং রাসুল (সা.)-এর রূহের কাছে সওয়াব পৌঁছানোর জন্য।
- পৃথক কুরবানী: নিজের কুরবানীর পাশাপাশি নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে পৃথক কুরবানী করা উত্তম। তবে একই কুরবানীতে নিজের ও নবী (সা.)-এর নিয়ত একত্র করলে তা জায়েজ নয় বরং পৃথক পশু হতে হবে।
- ওয়াজিব নয়: এটি ওয়াজিব বা সুন্নতে মুওয়াক্কাদা নয়, বরং নফল ইবাদত। তাই কেউ না করলে গুনাহ হবে না।
- সবচেয়ে উত্তম: কেউ যদি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তারপর নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে আলাদাভাবে একটি কুরবানী করে, তবে তা খুবই সওয়াবের কাজ।
উপসংহার:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত, জায়েজ ও মুস্তাহাব। এটি সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত এবং হানাফি মাযহাবের ফুকাহায়ে কেরাম একে জায়েজ ও সওয়াবের কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এটি কোনো ওয়াজিব কাজ নয়, বরং নফল ইবাদত। তাই যদি কেউ সামর্থ্য রাখে, তবে সে নিজের কুরবানীর পাশাপাশি নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকেও একটি কুরবানী করুক। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের ইবাদত কবুল করুন।
আল্লাহু আলাম।