মাযহাব কি ও কেন ? বিস্তারিত জানতে চাই-
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
উস্তাদ আমার একজন পরিচিত ব্যক্তি বিষয় গুলো নিয়ে খুব হীনমন্যতায় ভুগছে।
১)প্রথমত তার প্রশ্ন আমরা মুসলিম এটাই তো মেইন পরিচয় তাহলে মাযহাব নিয়ে এতো কিছু কেন করা হয়?
২)মানুষকে মাযহাব কেন মানতে হবে?
৩) একেক সময় একেক মাযহাব অনুসরণ করা যাবে না কেন?
৪) সব মাযহাব যদি সঠিক হয় তাহলে ভিন্নতা কেন?৪ মাযহাব কেন আলাদা উত্তর?
৫) ৪ টার মধ্যে কেন যেকোনো একটাকে গ্রহণ করবে?
যেমন যদি বলি আমি হানাফি মাযহাব মানি, তাহলে কেন শাফিঈ মাযহাব বাদ দিলাম? তাহলে কি সেটা সঠিক না?
৬) নিদিষ্ট ভাবে কেন একটাই ফলো করতে হবে? আলাদা করতে পারবে না কেন?
আমি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করি ,তো যে আমাকে এই প্রশ্নগুলো করেছে , সে বলছে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়ে কেন আমরা আবার চার ভাগ হলাম এমন ভাবে বুঝাচ্ছে, এর উত্তর আমি কিছু বলতে পারছি না ।তাই আপনি যদি মাযহাব সম্পর্কে পরিপূর্ণ ভাবে একটু বিষয় গুলো ক্লিয়ার করেন উপকৃত হবো।
এছাড়া,
সবে বরাতে একদল হালুয়া রুটি খায়, এ কারণে নাকি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম যুদ্ধ করার সময় তার দাঁত মোবারক ভাঙ্গে গিয়েছিলো এই জন্য তিনি হালুয়া রুটি খেয়েছে?.আবার এক দল খায় না। যে দল খায় তারা কি কোনো মাযহাব এর অনুসরণ করে খায় না? নাকি ভ্রান্ত দলের অনুসারী? এটাও তার প্রশ্নের অংশ?
جَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার আগে একটি মূল কথা বলা জরুরি: মাযহাব মানে ‘পথ’ বা ‘পদ্ধতি’। ইসলামের মূল বিষয়ে (আকীদা, ফরয-হারাম) সব মাযহাব একমত; পার্থক্য শুধু ফিকহী (আমলী) মাসআলায়। সাহাবায়ে কেরাম থেকেও ইজতিহাদী পার্থক্য ছিল। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «إذا اجتهد الحاكم فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد» (যখন কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তার জন্য দুই নেকি; আর ভুল করলে এক নেকি) – (বুখারী, মুসলিম)। চার ইমামের মাযহাবই এই ইজতিহাদের ফসল, এবং তারা নিজেদের মতকে চূড়ান্ত সত্য বলে দাবি করেননি বরং বলেছেন: «رأيي صواب يحتمل الخطأ، ورأي غيري خطأ يحتمل الصواب» (আমার অভিমত সঠিক কিন্তু তাতে ভুলের সম্ভাবনা আছে, অন্যদের অভিমত ভুল কিন্তু তাতে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে)।
নিচে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো—
১. আমরা মুসলিম—এটাই তো প্রধান পরিচয়, তাহলে মাযহাব নিয়ে এত জোর কেন?
হ্যাঁ, প্রধান পরিচয় ‘মুসলিম’। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ইসলামের বিধানাবলী বোঝার জন্য কোনো পদ্ধতি লাগবে না। কুরআন ও হাদীস থেকে সরাসরি মাসআলা বের করার জন্য ইজতিহাদী যোগ্যতা (গভীর জ্ঞান, আরবী ভাষা, নসখ ও নাসিখ-মানসূখ, ইলমে রিজাল ইত্যাদি) আবশ্যক। এ যোগ্যতা না থাকলে অন্ধভাবে কুরআন-হাদীস পড়লেই হবে না; বরং আল্লাহ বলেন: «فاسألوا أهل الذكر إن كنتم لا تعلمون» (তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো) – (সূরা নাহল ৪৩)। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতো মুজতাহিদই হলেন ‘আহলুয যিকর’। তাই সাধারণ মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য মাযহাব অনুসরণ করা ফরযের সমতুল্য।
তথ্যসূত্র: ফাতাওয়া উসমানী (১/২৮), ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৩৬), আল-হিদায়া (মু্ক্বাদ্দিমা)
২. মানুষকে মাযহাব কেন মানতে হবে?
কারণ কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা একেকজন একেকভাবে বুঝতে পারেন। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও দেখা যায়, একই হাদীসের ভিন্ন ব্যাখ্যা করে তারা ভিন্ন মাসআলা পালন করতেন। যেমন, তায়াম্মুমের আয়াতের (সূরা মায়েদা ৬) ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন ‘মাসাহ’ (হাত মুছা) আর আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলতেন ‘গোসল’ (ধৌত করা)। উভয়ই সহীহ। মাযহাব এই ইজতিহাদী বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করেছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য একটি সুসংহত, সুশৃঙ্খল পদ্ধতি তৈরি করেছে। যিনি ইজতিহাদের জ্ঞান রাখেন না, তার জন্য ওলামায়ে কেরাম বলেন: «علی العامی أن یقلد أحد المذاهب الأربعة» (সাধারণ মানুষ চার মাযহাবের যেকোনো একটি তাকলীদ করবে-) – (রদ্দুল মুহতার ১/৪৫) চার মাযহাবের কোনো একটি অনুসরণ করা অত্যাবশ্যকীয়।
৩. একেক সময় একেক মাযহাব অনুসরণ করা যায় না কেন ?
একই ইবাদতে একেক রুকন একেক মাযহাব থেকে নেওয়া নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ (ইত্তিবাউল হাওয়া) হয়। তাছাড়া এতেকরে মাযহাবের মূলনীতির পরস্পরবিরোধিতা সৃষ্টি হয়। ইমাম শাতিবী (রহ.) বলেন: «من تتبع رخص المذاهب فقد تزندق» (যে মাযহাবগুলোর সহজতার পিছু নেয় সে যেন যিন্দিক হয়ে গেল) – (আল-ই‘তিসাম ১/১৩৬)। তবে জরুরতবশত অন্য মাযাহাবের বিশেষ কোনো মাস’আলার উপর নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের আলোকে আমল করা যায়। যাকে গ্রহণযোগ্য হিলা বলা হয়। শর্ত হল, নির্ভরযোগ্য একদল উলামায়ে কেরামের সম্মতি থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৪২, ২/২৩০), ফাতাওয়া উসমানী (১/৩৪)
৪. সব মাযহাব যদি সঠিক হয় তাহলে ভিন্নতা কেন?
সব মাযহাবই ইসলামের ভিত্তি (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস) থেকে উদ্ভূত। ভিন্নতা আসে মাসআলার দ্বান্দ্বিক (تعارض) বা হাদীসের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড (যেমন, কিছু হাদীস একজন ইমামের কাছে সহীহ, অপরের কাছে জয়ীফ) অথবা কিয়াসের নিয়মের পার্থক্য থেকে। যেমন, অল্প রক্ত বের হলে হানাফীরা অযু ভাঙ্গে (কারণ হাদীস: «من قاء أو رعف فلیتوضأ») আর শাফিঈরা ভাঙ্গে না (কারণ রক্ত নাপাক নয়, শুধু নাপাক স্থান থেকে বের হলেই অযু ভঙ্গ)। উভয় দলই দলীলভিত্তিক। ইমাম আবু হানীফা বলেছেন: «أخبرنا عن كتاب الله، ثم سنة رسوله، ثم عن أقاويل الصحابة» (প্রথমে কিতাবুল্লাহ, তারপর সুন্নাহ, তারপর সাহাবীদের বক্তব্য) – (কিতাবুল আসার)
তথ্যসূত্র: মাআরিফুল কুরআন (২/৪৫), উসুলুশ শাশী (৫২-৫৫)
৫. চারটির মধ্যে কেন যেকোনো একটাকে গ্রহণ করবে? যদি হানাফী বলি, তাহলে শাফিঈ বাদ দিলাম? – সেটা কি ভুল?
বাদ দেওয়া মানে এই নয় যে শাফিঈ মাযহাব ভুল বা অপছন্দ। বরং প্রতিটি মাযহাবই সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি। এক ইমামের নীতিকে মেনে চলাই ব্যবস্থাগত সাদৃশ্য (انسجام) রক্ষা করে। আপনি যদি একজন ডাক্তারকে ফলো করেন, আপনি তার পদ্ধতি মেনে চলেন; অন্যজন বাদ নয়, বরং আপনার পক্ষে যেটি পূর্ণাঙ্গ ও সহজ সেটি মেনে চলাই বিজ্ঞতার কাজ। ইমাম শাফিঈ (রহ.) নিজেই বলেছেন: «صحیح من المذاهب ما وافق السنة والكتاب» (মাযহাবগুলোর মধ্যে সঠিক সেটি যা কিতাব ও সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ) – আর তা চারটিতেই বিদ্যমান। আপনি হানাফী বলে শাফিঈকে ভুল প্রমাণ করতে যাবেন না, বরং তাদের প্রতি সম্মান রেখে নিজের মাযহাব যথাযথভাবে পালন করবেন।
৬. নির্দিষ্টভাবে কেন একটাই ফলো করতে হবে? আলাদা করতে পারবে না কেন?
কারণ ইজতিহাদের মূলনীতি ও সূত্রাবলী একেক ইমামের একেক রকম। তাদের নীতি ও দলীলের পদ্ধতি আলাদা। আপনি যদি এক মাসআলায় ইমাম আবু হানীফা, অন্য মাসআলায় ইমাম শাফিঈ অনুসরণ করেন, তবে কোনও সুসংগত পদ্ধতি থাকছে না, বরং আপনি নিজের পছন্দমতো তুলছেন । ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: «لا يجوز للعامي أن يخلط بين المذاهب بلا ضرورة» (সাধারণ লোকের জন্য বিনা প্রয়োজনে মাযহাব মিশ্রিত করা জায়েয নয়) – (রদ্দুল মুহতার ১/৭৩)। তবে মাযহাব পরিবর্তন (যেমন, কোনো ব্যক্তি হানাফী থেকে শাফিঈ হওয়া) জায়েয, বরং কিছু অবস্থায় উৎসাহিত (যেমন, কোনো মাসআলায় দলীলের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস হলে)। কিন্তু স্রেফ ‘সুবিধামত’ একেক জায়গায় একেক মাযহাব নেওয়া নিষেধ।
হালুয়া-রুটির প্রসঙ্গ
১০ই মুহাররাম (আশুরা) উপলক্ষে অনেকে হালুয়া-রুটি খান এই বিশ্বাসে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহুদের যুদ্ধে দাঁত ভেঙে যাওয়ার পর এটি খেয়েছিলেন। এটি ভিত্তিহীন ও জাল রেওয়ায়েত। কারণ উহুদ যুদ্ধ হয়েছিল ৩ হিজরির শাওয়াল মাসে, আর আশুরা ১০ মুহাররাম। তাছাড়া সহীহ হাদীসে আশুরায় রোজা রাখার কথা এসেছে; খাবারের কোনো বিশেষ ব্যবস্থার কথা নেই।
যারা এটি খান তারা কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসারী নন, বরং একটি বিদ‘আত বা কুসংস্কারের অনুসারী। হানাফী আলেমগণ এ জাতীয় অবান্তর কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। যেমন ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (৫/৩২২) উল্লেখ আছে: «لا بأس بأكل الحلوى في عاشوراء ما لم يعتقدها سنة» (আশুরার দিন হালুয়া খাওয়া জায়েয, যদি তা সুন্নাত না মনে করে) – তবে উল্লিখিত ‘দাঁত ভাঙার’ কারণ ভিত্তিহীন। তাই আপনার পরিচিতকে বোঝান যে, এটি ধর্মীয় কোনো মাযহাবের অংশ নয়; বরং ভিত্তিহীন একটি অনুশীলন।
সংক্ষেপে উপসংহার
- মাযহাব ইসলামের আমলী বিভাজন নয়, বরং ফিকহী ইজতিহাদের পদ্ধতি।
- চার মাযহাব সঠিক, এবং নিজের এলাকার (বিশেষ করে হানাফী) মাযহাব সহীহ সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- তালফীক করা নিষেধ, কিন্তু প্রয়োজনে অন্য মাযহাব থেকে গ্রহণ জায়েয।
- হালুয়া-রুটি খাওয়া সুন্নাহ নয়, এটি কুসংস্কারমূলক আমল থেকে বিরত থাকুন।
আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। (আমীন)
উল্লেখিত কিতাবসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মাদ শফী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- বাহিশতী জেওর (মাওলানা থানভী)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতী শফী)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- উসুলুশ শাশী