শ্বাশুড়ি তার মেয়ের স্বামী (জামাতা) ও নিজের ভাইকে যাকাত দিতে পারবেন কিনা
Zakat and Charity · Hanafi
Question
১/শ্বাশুড়ি তার নিজের মেয়ের স্বামী কে যাকাত দিতে পারবে কিনা?সেই ক্ষেত্রে নিয়ম কি হবে?
২/নিজের ভাই কে তার চোখের অপারেশন বাবদ যাকাত দিতে পারবে কিনা,যদি ভাই এর সেই মুহূর্তে টাকা না থাকে অপারেশন এর মতো?
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. শ্বাশুড়ি তার মেয়ের স্বামীকে (জামাতাকে) যাকাত দিতে পারবেন — এতে কোনো বাধা নেই; বরং এটি সওয়াবের দিক থেকে উত্তম, কারণ জামাতা "নিকট আত্মীয়" হিসেবে গণ্য। তবে শর্ত হলো—জামাতা মিসকিন/ফকির (নিসাবের মালিক নয়) হতে হবে এবং যাকাতের মালিকানায় তাকে সম্পূর্ণ স্বত্বাধিকারী বানিয়ে দিতে হবে।
২. নিজের ভাইয়ের চোখের অপারেশনের জন্য যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে — যদি ভাই নিসাবের মালিক না হয় (অর্থাৎ যাকাত গ্রহণের যোগ্য হয়)। ভাই নিকট আত্মীয় হওয়ায় এতে দ্বিগুণ সওয়াব। তবে সরাসরি হাসপাতালকে টাকা দেওয়া যাবে না; বরং ভাইকে টাকা দিতে হবে (তার মালিকানায়), এরপর সে অপারেশন করাবে। অথবা ভাইয়ের পক্ষ থেকে তার অনুমতিক্রমে হাসপাতালে পরিশোধ করা যাবে।
বিস্তারিত:
১ম মাসআলা: শ্বাশুড়ি → জামাতা
যাকাতের ৮টি খাতের মধ্যে একটি হলো "ফকির-মিসকিন"। যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—যাকে দেওয়া হচ্ছে সে যাকাতের হকদার হতে হবে এবং তাকে তামলিক (মালিকানা প্রদান) করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الصَّدَقَةَ لَا تَحِلُّ لِغَنِيٍّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٍّ» "নিশ্চয়ই সদকা (যাকাত) কোনো ধনীকে এবং শক্তিশালী সুস্থ ব্যক্তিকে হালাল নয়।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৩৩; তিরমিজি: ৬৫২)
যাকাত যাদেরকে দেওয়া জায়েয নয় তারা হলেন: উসূল, ফুরু এবং স্বামী-স্ত্রী। জামাতা এদের অন্তর্ভুক্ত নন। তাই শ্বাশুড়ি জামাতাকে যাকাত দিতে পারবেন।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, যাকাত প্রদানকারীর জন্য যেসব আত্মীয়কে যাকাত দেওয়া জায়েয, তাদের মধ্যে ভাগ্নে-ভাগ্নি, বোনের স্বামী, মেয়ের স্বামী (জামাতা) প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত—এবং এদেরকে দেওয়া অন্যদের চেয়ে উত্তম, কারণ এতে সিলাতুর রহিম (আত্মীয়তা রক্ষা) ও যাকাত—দুই সওয়াবই পাওয়া যায়। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৩৫১-৩৫২; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/১৯১)
হাদিসে এসেছে, রাসূল ﷺ বলেছেন:
«الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَعَلَى ذِي الرَّحِمِ اثْنَتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ» "মিসকিনকে সদকা করা এক সদকা; আর নিকট আত্মীয়কে সদকা করা দুইটি—সদকা ও আত্মীয়তা রক্ষা।" (সুনানে নাসাঈ: ২৫৮৩; তিরমিজি: ৬৫৮)
সতর্কতা: যদি জামাতা নিসাবের মালিক হয় (অর্থাৎ যাকাত গ্রহণের অযোগ্য হয়), তাহলে তাকে যাকাত দেওয়া জায়েয হবে না। তবে মেয়েকে যাকাত দেয়া যাবে না।
২য় মাসআলা: ভাইয়ের অপারেশনের জন্য যাকাত
ভাই নিকট আত্মীয় (যাবিল আরহাম)। তাকে যাকাত দেওয়া জায়েয এবং উত্তম—শর্ত হলো সে যাকাতের হকদার (ফকির/মিসকিন) হবে। হাদিসে নিকট আত্মীয়কে সদকা করার ফজিলত উপরোক্ত হাদিসেই বর্ণিত হয়েছে।
তামলিকের শর্ত: যাকাতের টাকা সরাসরি হাসপাতাল বা ডাক্তারকে দেওয়া যাবে না; কারণ তখন ভাই মালিকানা পায় না। বরং ভাইকে টাকা দিতে হবে—সে নিজে অপারেশন করাবে। অথবা ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে তার পক্ষ থেকে হাসপাতালে পরিশোধ করা যাবে (তখন ভাইয়ের মালিকানায় তা কবুল হয়ে তার পক্ষ থেকে পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে)।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, যাকাতের ক্ষেত্রে তামলিক (হকদারকে মালিক বানানো) শর্ত; কোনো প্রতিষ্ঠান বা ঋণ পরিশোধে সরাসরি যাকাত দেওয়া যথেষ্ট নয়, তবে হকদারের অনুমতিক্রমে তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা জায়েয। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৩৪৪-৩৪৫; ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৯৮-৪০০)
উভয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত:
- যাকাতের মালিকানা হকদারকে সম্পূর্ণভাবে প্রদান করতে হবে।
- যাকাতের টাকা দিয়ে কোনো ব্যক্তিগত ঋণ বা দায় সরাসরি মিটানো যাবে না (হকদারের অনুমতি ছাড়া)।
- নিসাব পরিমাণ মালিক হলে যাকাত গ্রহণ করা যাবে না।
উপসংহার: উভয় ক্ষেত্রেই যাকাত দেওয়া জায়েয—শর্ত হলো প্রাপক যাকাতের হকদার (ফকির/মিসকিন) হবে এবং তাকে মালিকানা প্রদান করা হবে। নিকট আত্মীয়কে দেওয়া সওয়াবের দিক থেকে উত্তম।
وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ