সদ্য বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকলে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে শরীয়াহর বিধান কী?
Family Life · Hanafi
Question
আমরা সদ্য বিবাহিত।
স্ত্রী এখন বাবার বাড়িতে আছেন। আমি প্রতি সপ্তাহে যায় ও থেকে আসি কিন্তু পারিবারিক ভাবে তুলে আনতে রাজি হচ্ছে নাহ আগামী ৬ মাস বা বছর খানেক পর্যন্ত।
এক্ষেত্রে তোহ তুলে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সন্তানের চেষ্টা করতে পারতেছি নাহ অথাৎ একসাথে থেকেও মিলিত হতে পারতেছি নাহ যা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
জন্ম নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছে কোনকালে নিয়তে ছিলো নাহ।
আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুক।
তাই সত্যি বলতে শায়েখ একসাথে থাকলেও কন্ট্রোল করতে হচ্ছে।
এক্ষেত্রে কি করতে পারি শায়েখ?
এক্ষেত্রে শরীয়াহ এর দৃষ্টিতে করণীয় কি এটা নিয়ে একটু বললে উপকৃত হতাম।
ক্ষমার সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন প্রশ্ন ভূল বলে থাকলে।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আল্লাহ তাআলা আপনার বিবাহিত জীবনকে বরকতময় করুন এবং এই পরীক্ষায় ধৈর্য ও হিকমত দান করুন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: স্ত্রী বাবার বাড়িতে আছেন, পারিবারিকভাবে তুলে আনতে ৬ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই সময়ে আপনি সপ্তাহে একবার দেখা করতে যান, কিন্তু একসাথে থাকতে পারেন না। ফলে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক (মিলন) প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না, আবার সন্তান নিয়ন্ত্রণেরও ইচ্ছা নেই। এই অবস্থায় শরীয়াহর দৃষ্টিতে করণীয় কী?
নিচে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
১. প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয়: স্ত্রীকে নিজের ঘরে আনা স্বামীর হক
ইসলামে বিবাহের অন্যতম মাকসাদ হলো স্বামী-স্ত্রীর একসাথে বসবাস করা এবং পারস্পরিক সান্ত্বনা লাভ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً "আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।" (সূরা আর-রূম: ২১)
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব আল-হিদায়াহ ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীকে নিজের ঘরে নিয়ে আসা এবং তার ভরণপোষণ (নফকা) প্রদান করা স্বামীর ওয়াজিব দায়িত্ব। তবে শর্ত হলো—মোহর পরিশোধিত হওয়া এবং স্ত্রীর জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থান থাকা। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
আপনার ক্ষেত্রে করণীয়: স্ত্রীর পরিবারের সাথে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে কথা বলুন। তাদের বাধার কারণ কী—তা বুঝুন। যদি বৈধ কোনো কারণ না থাকে, তবে শরীয়াহ অনুযায়ী স্ত্রীকে নিজের ঘরে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া আপনার হক ও দায়িত্ব। তবে জোর-জবরদস্তি নয়; বরং সদাচরণ ও হিকমতের সাথে।
২. সন্তান নিয়ন্ত্রণ (আযল) সম্পর্কে শরীয়াহর বিধান
আপনি বলেছেন—জন্ম নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা কোনোদিন ছিল না, কিন্তু বাধ্য হয়ে কন্ট্রোল করতে হচ্ছে। এখানে দুটি দিক আছে:
(ক) স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (Sterilization) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী স্থায়ীভাবে বন্ধ্যাকরণ (পুরুষের ভ্যাসেকটমি বা নারীর টিউবেকটমি) নিষিদ্ধ, কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তনের শামিল এবং ভবিষ্যতে সন্তান লাভের সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট করে। (রাদ্দুল মুহতার; ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২)
(খ) সাময়িক আযল (Coitus Interruptus) শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত
হাদীসে আযল সম্পর্কে এসেছে:
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: كُنَّا نَعْزِلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْقُرْآنُ يَنْزِلُ "জাবির (রা.) বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আযল করতাম, অথচ তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল।" (সহীহ বুখারী: ৫২০৮; সহীহ মুসলিম: ১৪৩৯)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ قَالَ: بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا... (সহীহ বুখারী: ৬৩৮৮)
হানাফী ফিকহের বিধান: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আযল করা মাকরূহ। তবে স্ত্রীর সম্মতিতে সাময়িকভাবে আযল করা জায়েয—বিশেষত যদি বৈধ কোনো ওজর থাকে (যেমন: স্ত্রীর দুর্বলতা, সন্তান লালন-পালনের কষ্ট, বা সাময়িক পারিবারিক সমস্যা)। (রাদ্দুল মুহতার; ফাতাওয়া আলমগীরী; ইমদাদুল ফাতাওয়া)
তবে সতর্কতা: আযলকে স্থায়ী অভ্যাস বানানো বা সন্তান লাভের ইসলামী গুরুত্বকে অস্বীকার করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأُمَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ "তোমরা প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান জন্মদানকারী নারীদের বিবাহ করো; কেননা আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব।" (সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০; মুসনাদে আহমাদ)
৩. আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় (ধাপে ধাপে)
ধাপ ১: স্ত্রীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন
স্ত্রীকে বুঝান যে, দাম্পত্য সম্পর্কের স্বাভাবিক অধিকার (মিলন) উভয়েরই হক। তিনি যেন তার পরিবারের সাথে কথা বলে দ্রুত আপনার কাছে আসার ব্যবস্থা করেন। হাদীসে এসেছে:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ... وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ (সহীহ মুসলিম: ১০০৬) — অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্কও সদকা, যদি নিয়ত বৈধ হয়।
ধাপ ২: স্ত্রীর পরিবারের সাথে সম্মানজনক আলোচনা
তাদের বাধার কারণ জানুন। যদি সাংস্কৃতিক বা পারিবারিক কারণে হয়, তবে ধৈর্য ধরে ধীরে ধীরে সমাধানের চেষ্টা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ "নম্রতা যেখানে থাকে তা সৌন্দর্য বাড়ায়, আর যেখান থেকে তা চলে যায় সেখানে কলঙ্ক দেখা দেয়।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৯৪)
ধাপ ৩: সাময়িকভাবে আযল (জন্মনিয়ন্ত্রণ) ব্যবহার করুন
যেহেতু আপনি সন্তান নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা রাখেন না, কিন্তু বর্তমানে বাধ্য হয়ে করছেন—এটি শরীয়াহ অনুযায়ী সাময়িক ওজরের কারণে জায়েয। তবে শর্ত:
- স্ত্রীর সম্মতি থাকতে হবে।
- এটি স্থায়ী পদ্ধতি (Sterilization) হবে না।
- ভবিষ্যতে সন্তান লাভের নিয়ত ও দুআ জারি রাখতে হবে।
ধাপ ৪: বেশি বেশি দুআ ও ইস্তিগফার করুন
আপনি লিখেছেন "আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুক"—এটি অত্যন্ত ভালো একটি অনুভূতি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
নিয়মিত এই দুআ পড়ুন:
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ بَيْنِي وَبَيْنَ زَوْجَتِي وَاجْمَعْ بَيْنَنَا فِي خَيْرٍ
এবং সন্তান লাভের জন্য হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর দুআ:
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ (সূরা আলে ইমরান: ৩৮)
ধাপ ৫: ধৈর্য ও সবর অবলম্বন করুন
এই সময়টি আপনার জন্য পরীক্ষার। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ "হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৬)
৪. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আপনি লিখেছেন—"একসাথে থাকলেও কন্ট্রোল করতে হচ্ছে।" এখানে খেয়াল রাখুন:
- আযল বা জন্মনিয়ন্ত্রণ কোনো গুনাহ নয় যদি বৈধ ওজর থাকে এবং স্ত্রীর সম্মতি থাকে।
- তবে সম্পূর্ণ বন্ধ্যাকরণ (স্থায়ী পদ্ধতি) বা গর্ভপাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- সন্তান লাভের নিয়ত ও দুআ কখনো ছাড়বেন না। আল্লাহর রিযিক ও সন্তান তাঁরই হাতে।
৫. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত পরামর্শ
| বিষয় | শরীয়াহর বিধান | |---|---| | স্ত্রীকে নিজের ঘরে আনা | স্বামীর হক ও দায়িত্ব; ধৈর্য ও হিকমতের সাথে চেষ্টা করুন | | সাময়িক আযল (জন্মনিয়ন্ত্রণ) | স্ত্রীর সম্মতিতে বৈধ ওজরে জায়েয | | স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ | নিষিদ্ধ (হারাম) | | গর্ভপাত | নিষিদ্ধ (কেবল জীবন রক্ষার চরম প্রয়োজনে ভিন্ন বিধান) | | সন্তান লাভের দুআ | সর্বদা জারি রাখুন | | স্ত্রীর পরিবারের সাথে আচরণ | নম্রতা, ধৈর্য ও সম্মানের সাথে |
পরামর্শ: আপনার সমস্যাটি মূলত সাময়িক। ইনশাআল্লাহ ৬ মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান হবে। এই সময়ে স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ, ভালোবাসা ও দুআ বজায় রাখুন। স্ত্রীর পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবেন না। আর জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সাময়িক পদ্ধতি (আযল) ব্যবহার করুন—এটি শরীয়াহসম্মত। তবে স্থায়ী পদ্ধতি থেকে বিরত থাকুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার দাম্পত্য জীবনকে সুখময়, বরকতময় ও সন্তান-সন্ততিতে পূর্ণ করুন। আমিন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সমাধান দান করুন এবং আপনার পরিবারকে বরকত দান করুন। আমিন।