একজন নারী ঘরে বসে সম্পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে হাতে তৈরি গয়না তৈরি ও বিক্রি করলে, তাঁর এই ব্যবসা কি ইসলামে জায়েজ?

Business and Job · Hanafi

Question No: 8082
Questioner: Fatema Khatun Tahsina
Question Asked: 06 Nov 2026, 09:09 PM
Reviewed & Published: 07 Nov 2026, 12:24 AM
Views: 39
Tokens: 13,752
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আমি বাসায় থেকেই একটি ছোট ব্যবসা পরিচালনা করি। ব্যবসাটি মূলত হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের গয়না নিয়ে। আমার একটি ফেসবুক বিজনেস পেজ রয়েছে, যেখানে আমি আমার তৈরি গয়নার ছবি ও ভিডিও আপলোড করি।

আমি যথাসম্ভব শরীয়তের পর্দার বিধান মেনে ব্যবসাটি পরিচালনা করি। আমার পেজে কোনো বেপর্দা নারীর ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা হয় না। এমনকি কোনো ছবিতে বা ভিডিওতে হারাম বাদ্যযন্ত্র, মিউজিক কিংবা এ ধরনের কোনো কিছু ব্যবহার করি না। আমি নিজের কণ্ঠস্বরও ব্যবহার করি না। অর্থাৎ, যতটুকু সম্ভব শরীয়তের বিধান মেনে এবং পর্দা বজায় রেখেই ব্যবসাটি পরিচালনা করছি।

কিন্তু সম্প্রতি একজন আমাকে বলেছেন, আমার এই ব্যবসাটি নাকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে অপছন্দনীয় হতে পারে। কারণ, আমি যে গয়নাগুলো তৈরি করে বিক্রি করছি, সেগুলো কোনো নারী পরিধান করে যদি পরবর্তীতে বেপর্দা অবস্থায় বাইরে বের হন কিংবা শরীয়তবিরোধী কোনো কাজে ব্যবহার করেন, তাহলে সেই গুনাহের দায়ভার কি আমার ওপরও বর্তাবে?

যদিও আমার নিজের ধারণা, একজন ক্রেতা আমার কাছ থেকে কোনো পণ্য কেনার পর সেটি কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমি তো তাঁকে বেপর্দা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করছি না কিংবা কোনো হারাম কাজে সহযোগিতাও করছি না। গয়না নারীদের স্বাভাবিক পছন্দ ও সৌন্দর্যবর্ধনের একটি উপকরণ। একজন পর্দাশীল নারী যেমন গয়না পছন্দ করেন, তেমনি একজন বেপর্দা নারীও গয়না পছন্দ করতে পারেন। সুতরাং, একজন ক্রেতা আমার কাছ থেকে গয়না কিনে সেটি কীভাবে ব্যবহার করবেন, তার দায়ভার কি কোনোভাবেই আমার ওপর বর্তাবে?

বিষয়টি নিয়ে আমার মনে আরও একটি প্রশ্ন এসেছে। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের কেনা গয়না বেপর্দা অবস্থায় পরিধান করেন এবং সেই কারণে গয়না বিক্রেতার ওপরও গুনাহের দায়ভার বর্তায়, তাহলে যারা স্বর্ণ, রুপা কিংবা অন্যান্য ধরনের অলংকার বিক্রি করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও কি একই বিধান প্রযোজ্য হবে? কারণ, তাঁদের বিক্রি করা অলংকারও তো কোনো ক্রেতা শরীয়তবিরোধীভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

তাই আমি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিষয়টির একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাই।

১. একজন নারী ঘরে বসে সম্পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে হাতে তৈরি গয়না তৈরি ও বিক্রি করলে, তাঁর এই ব্যবসা কি ইসলামে জায়েজ?

২. ক্রেতা যদি সেই গয়না পরবর্তীতে বেপর্দা অবস্থায় ব্যবহার করেন, তাহলে তার গুনাহের দায়ভার কি বিক্রেতার ওপরও বর্তাবে?

৩. এ ধরনের ব্যবসা কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে অপছন্দনীয় বা অনুত্তম হিসেবে গণ্য হবে?

৪. স্বর্ণ ও রুপার গয়না বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও কি একই বিধান প্রযোজ্য?

আমি বিষয়টি নিয়ে কোনো ভুল ধারণা রাখতে চাই না। যদি আমার ব্যবসার মধ্যে শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় থেকে থাকে, তাহলে সেটি জানতে চাই, যেন নিজেকে সংশোধন করতে পারি। আর যদি ব্যবসাটি শরীয়তসম্মত হয়, তাহলে অযথা অপরাধবোধে না ভুগে নিশ্চিন্তে হালাল উপার্জন চালিয়ে যেতে পারি।

আশা করি, কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিলসহ বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন।

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আপনার ব্যবসা সংক্রান্ত উদ্ভূত সংশয় ও ৪টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য ফাতাওয়া কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত শরঈ ফয়সালা নিচে তুলে ধরা হলো:


১. মূল শরঈ সিদ্ধান্ত (সংক্ষেপে):

  • ঘরে বসে সম্পূর্ণ পর্দা ও শরঈ বিধান মেনে হাতে তৈরি গয়না তৈরি ও বিক্রি করা ১০০% হালাল, জায়েয ও বরকতময় উপার্জন।
  • আপনার কাছ থেকে কেনা গয়না কোনো ক্রেতা যদি পরবর্তীতে বেপর্দা অবস্থায় পরপুরুষের সামনে ব্যবহার করেন, তবে তার কোনো গোনাহ বা দায়ভার আপনার ওপর বর্তাবে না।
  • এ ধরনের ব্যবসা আল্লাহ তাআলার কাছে অনুত্তম বা অপছন্দনীয় নয়; বরং নিজের পরিশ্রমে হালাল জীবিকা নির্বাহ করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়।
  • স্বর্ণ ও রুপার সাধারণ গয়না বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও হুবহু একই শরঈ বিধান প্রযোজ্য।

২. প্রশ্নভিত্তিক বিস্তারিত ফিকহী ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য দলীলাদি:

১ম প্রশ্নের উত্তর: ঘরে বসে পর্দা রক্ষা করে গয়না তৈরি ও বিক্রি করা জায়েজ কি না?

  • শরঈ ফয়সালা: হ্যাঁ, এটি সম্পূর্ণ জায়েয ও হালাল ব্যবসা।
  • ফিকহী ব্যাখ্যা: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী, মহিলারা নিজ ঘরে অবস্থান করে পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করে যেকোনো বৈধ হস্তশিল্প বা গয়না তৈরি ও কেনাবেচা করতে পারেন। যেহেতু আপনি আপনার পেজে কোনো বেপর্দা নারীর ছবি/ভিডিও দেন না, হারাম মিউজিক বা নিজের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করেন না—তাই আপনার ব্যবসার পদ্ধতিটি শরীআতের বিচারে শতভাগ পরিচ্ছন্ন ও প্রশংসনীয়।

২য় প্রশ্নের উত্তর: ক্রেতা বেপর্দা অবস্থায় গয়না পরিধান করলে বিক্রেতার ওপর গোনাহ বর্তাবে কি না?

  • শরঈ ফয়সালা: না, বিক্রেতার ওপর ক্রেতার অপরাধের কোনো দায়ভার বা গোনাহ বর্তাবে না।
  • ফিকহী মূলনীতি (إعانة على الإثم - গোনাহের কাজে সহযোগিতা সংক্রান্ত মূলনীতি):
    • ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত নীতি হলো—যেসব বস্তু বা পণ্যের মূল সত্তা নিজ থেকে হারাম নয় (যেমন: গয়না, সাধারণ পোশাক, অলংকার, প্রসাধন ইত্যাদি, যা ঘরে বা মাহরামের সামনে হালালভাবে ব্যবহার করা সম্ভব), সেসব বস্তু তৈরি ও বিক্রি করা সম্পূর্ণ জায়েয।
    • ফুকাহায়ে কেরাম বলেন: "গোনাহ বস্তুর নিজস্ব সত্তার সাথে লেগে থাকে না; বরং তা ব্যবহারকারীর নিয়ত ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে"।
    • আপনি একজন ক্রেতার কাছে সাধারণ একটি সাজসজ্জার বৈধ পণ্য বিক্রি করছেন। এখন সেই ক্রেতা যদি গয়নাটি কিনে ঘরে নিজের স্বামীর সামনে ব্যবহারের পরিবর্তে বেপর্দা হয়ে বাইরে পরিধান করেন, তবে সেই গোনাহের জন্য কেবল ক্রেতাই এককভাবে দায়ী হবেন; কারণ তিনি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় গোনাহটি করছেন। এতে আপনার উপার্জিত আয় সম্পূর্ণ হালাল থাকবে।

৩য় প্রশ্নের উত্তর: এ ধরনের ব্যবসা কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে অপছন্দনীয় বা অনুত্তম?

  • শরঈ ফয়সালা: না, এটি কোনোভাবেই অপছন্দনীয় বা অনুত্তম ব্যবসা নয়।
  • ফিকহী ব্যাখ্যা: ইসলামে অন্যায় বা হারাম উপার্জনের পথ পরিহার করে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে ঘরে বসে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করাকে অত্যন্ত মর্যাদাশীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: "মানুষের জন্য নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম ও পবিত্র আর কোনো খাবার হতে পারে না" (সহীহ বুখারী; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১৬/১২৭)। সুতরাং অহেতুক অপরাধবোধে না ভুগে নিশ্চিন্তে এই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

৪র্থ প্রশ্নের উত্তর: স্বর্ণ ও রুপার গয়না বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও কি একই বিধান প্রযোজ্য?

  • শরঈ ফয়সালা: হ্যাঁ, স্বর্ণ ও রুপার গয়না বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও হুবহু একই শরঈ বিধান প্রযোজ্য।
  • ফিকহী ব্যাখ্যা: স্বর্ণ ও রুপার অলংকার নারীদের জন্য একটি স্বাভাবিক ও শরীআতসম্মত সৌন্দর্যবর্ধক বস্তু। বাজারে যারা স্বর্ণ-রুপা বিক্রি করেন, তারা গয়না বিক্রি করছেন বৈধ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে কোনো ক্রেতা যদি তা গায়েরে মাহরামের সামনে প্রদর্শন করেন, তবে তার দায়ভার স্বর্ণকারের ওপর যেমন যায় না, ঠিক তেমনি আপনার হস্তশিল্পের গয়না বিক্রির ক্ষেত্রেও বিক্রেতা হিসেবে আপনার ওপর কোনো দায়ভার আসবে না।

সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদীয়া (১৬শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ১২৫ (মাহমুদীয়া ১৬/১২৫-১৩১) (অধ্যায়: বাবুল বিয়ূ'ই বাতিল ওয়াল ফাসিদ ওয়াল মাকরূহ — 'إعانة على المعصية (গোনাহে সহযোগিতা) সংক্রান্ত ফিকহী মূলনীতি: যে বস্তু নিজ থেকে হারাম নয়, তা বিক্রি করা সম্পূর্ণ জায়েয হওয়া এবং ক্রেতার অপব্যবহারের জন্য বিক্রেতা গোনাহগার না হওয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত ফতোয়া')।

    • পৃষ্ঠা: ১২৭ (মাহমুদীয়া ১৬/১২৭) (অধ্যায়: 'নিজ হাতের কামাই ও হালাল ব্যবসার মর্যাদা সংক্রান্ত বুখারীর হাদীস')।

  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদীয়া (১৮শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ২২৮ (মাহমুদীয়া ১৮/২২৮) (অধ্যায়: 'পর্দানশীন মহিলার নিজ ঘরে বসে হালাল উপার্জনের ফিকহী অবকাশ ও হুকুম')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদীয়া (২৪শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ৩২৪, ৩৭৫ (মাহমুদীয়া ২৪/৩২৪, ৩৭৫) (অধ্যায়: কিতাবুল আজরিয়া ওয়াল হুলাই — 'মহিলাদের অলংকার ব্যবহার ও সোনা-রুপার কেনাবেচার শরঈ বিধান')।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৩য় খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):

    • পৃষ্ঠা: ৩১৬, ৩১৭ (হিন্দিয়াহ ৩/১৬৮) (অধ্যায়: কিতাবুল বিয়ূ — 'ব্যবসায়িক লেনদেনের হালাল হওয়ার ফিকহী মূলনীতি')।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৫ম খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):

    • পৃষ্ঠা: ২০, ২১, ২২ (হিন্দিয়াহ ৫/২৭৩) (অধ্যায়: বায়ুস সরফ — 'স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলংকার এবং কেনাবেচার ফিকহী আহকাম')।
  • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ১৭৭, ১৭৮ (দরসুল ফিকহ ২/১৭৭, ১৭৮) (অধ্যায়: 'শরীয়ত সম্মত পন্থায় ব্যবসার মাধ্যমে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও ফিকহী মূলনীতি')।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.