স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাগ বলে আর তার কাছে তালাগের অর্থ তালাগ নয় তিনি অন্য শব্দ বুঋাতে চান তাহলে কি তালাক হবে

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 8042
Questioner: Md Shariful Islam
Question Asked: 06 Nov 2026, 07:34 AM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 07:42 AM
Views: 37
Tokens: 5,015
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি বগুরা জেলা থেকে বলছি। আমি কিছু সমস্যা ও বিভ্রান্তির মধ্যে আছি।

আমার স্বামী আমায় মাঝে মাঝেই বলে তুমি এটা না করলে তালাগ। পরবর্তীতে সে বলে যে সে তালাগ শব্দটি তালা শব্দের মতো অর্থাৎ সে বলতে চাই যে তালাগ শব্দের অর্থ তালাক নয়।
আর এ যাবৎ আমি অনেক বার তলাগ বলে শর্ত দিলেও ঐ কাজটি করেছি।

এখন আমাদের সর্ম্পক হালাল আছে কি?
হানাফি মাজহাফ অনুজায়ি উত্তরটি জানতে চাই।

Answer

وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ

সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী — যদি আপনার স্বামী প্রকৃতপক্ষে "তালাগ" বলে তালাক বোঝানোর ইচ্ছা না করে থাকেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে তিনি "তালা" (lock) অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন — তাহলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তালাক পতিত হয়নি; আপনার বিবাহ সম্পর্ক বহাল আছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ও সতর্কতামূলক আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।


১. মূল নীতি: তালাকের ক্ষেত্রে "শব্দ" ও "নিয়ত" উভয়ই বিবেচ্য

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো — তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য হয় সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ ব্যবহার করতে হবে, অথবা কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক) শব্দ ব্যবহার করলে সাথে তালাকের নিয়ত বা পরিস্থিতির قرينة (সূচক) থাকতে হবে।

  • সরীহ শব্দ (যেমন: "তালাক", "তালাক দিলাম") — এতে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়।
  • কিনায়া শব্দ (যেমন: "যাও", "মুক্তি দিলাম", "তালাগ") — এতে নিয়ত বা قرينة ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বক্তব্য: কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত বা حال (পরিস্থিতির সূচক) ব্যতীত তালাক সংঘটিত হয় না।

«وَالْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ» — (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৯৮)


২. "তালাগ" শব্দের বিচার

"তালাগ" শব্দটি আরবি "طلاق" (তালাক)-এর বিকৃত উচ্চারণ। হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো:

«لَا عِبْرَةَ لِلْأَلْفَاظِ الْمُحَرَّفَةِ إِذَا لَمْ تَكُنْ صَرِيحَةً فِي الطَّلَاقِ وَلَا يَقْصِدُ بِهَا الطَّلَاقَ» (মূলভাব: বিকৃত শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হয় না।)

তবে সতর্কতা: যদি "তালাগ" শব্দটি সাধারণত তালাক বোঝাতেই ব্যবহৃত হয় এবং শ্রোতারা তা তালাক হিসেবেই বোঝে, তাহলে তা সরীহ হিসেবে গণ্য হতে পারে — তখন নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হবে। কিন্তু আপনার স্বামী যদি স্পষ্টভাবে বলেন যে তিনি "তালা" (lock) অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন এবং তার অন্তরে তালাকের নিয়ত ছিল না — তাহলে তা কিনায়া হিসেবে গণ্য হবে এবং নিয়ত না থাকায় তালাক পতিত হবে না।

ইমাম তাহতাবি (রহ.) ও ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন: শব্দের অর্থ যদি তালাকের বিপরীত হয় এবং বক্তা তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে তার বক্তব্যই গ্রহণযোগ্য হবে — তবে শর্ত হলো, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে এবং কোনো প্রতারণার উদ্দেশ্য না থাকতে হবে।


৩. শর্তসাপেক্ষ তালাক (তালাক মুআল্লাক) প্রসঙ্গে

আপনি লিখেছেন — স্বামী বলেছেন "তুমি এটা না করলে তালাগ" এবং আপনি সেই কাজটি করেছেন। এখানে দুটি দিক:

(ক) যদি "তালাগ" শব্দটি তালাক হিসেবে গণ্য না হয় (যেমনটি আপনার স্বামী দাবি করছেন), তাহলে শর্ত পূর্ণ হলেও কোনো তালাক পতিত হয়নি।

(খ) যদি তা তালাক হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে শর্ত পূর্ণ হওয়ায় তালাক পতিত হয়ে যেত — কিন্তু আপনার স্বামীর বক্তব্য অনুযায়ী তা নয়।

গুরুত্বপূর্ণ: আপনার স্বামী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে "তালাগ" বলে পরে "তালা" অর্থ বলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন — এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতারণা (তালিব) হিসেবে গণ্য হবে এবং তখন ফকীহগণ বক্তার দাবিকে অগ্রাহ্য করবেন। কিন্তু যদি সত্যিই তার নিয়ত তালাকের ছিল না এবং তিনি "তালা" অর্থই বোঝাতে চেয়েছিলেন — তাহলে তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য।


৪. হানাফি ফুকাহার বক্তব্য

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত: কেউ যদি "তালাগ" বলে এবং বলে "আমি তালা (lock) বোঝাতে চেয়েছি" — যদি তার কথা বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে তালাক পতিত হবে না। (দেখুন: ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৪০-৩৪৫)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে উল্লেখ করেন: তালাকের ক্ষেত্রে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি দেখা দিলে — বিশেষত শব্দের অর্থ নিয়ে — সতর্কতামূলক পথ হলো তাজদীদে নিকাহ (নতুন করে বিবাহ) করা, যাতে কোনো সন্দেহ না থাকে।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ লেখেন: তালাকের শব্দ মুখে উচ্চারণ করলে এবং তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক পতিত হয়; নিয়ত না থাকলে এবং শব্দটি কিনায়া হলে তালাক পতিত হয় না।


৫. আপনার করণীয় (তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক)

১. স্বামীর সাথে স্পষ্ট আলোচনা করুন — তিনি কি সত্যিই "তালা" অর্থ বোঝাতে চেয়েছিলেন, নাকি পরে তা বলছেন? সত্যতা নির্ণয় করুন।

২. সতর্কতামূলক ব্যবস্থা (এহতিয়াত): যেহেতু বহুবার "তালাগ" শব্দ উচ্চারিত হয়েছে এবং বিষয়টি সন্দেহজনক, তাই স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি/দারুল ইফতার সাথে সরাসরি বসে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ফতোয়া নিন। এটি সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

৩. তাজদীদে নিকাহ: যদি সন্দেহ থেকে যায়, তাহলে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুন করে নিকাহ (মোহর নির্ধারণসহ) করে নেওয়া উত্তম — এতে সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে হালাল থাকবে।

৪. ভবিষ্যতে সতর্কতা: তালাকের শব্দ মুখে উচ্চারণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرَّجْعَةُ» "তিনটি বিষয় — এর গুরুত্ব ও ঠাট্টা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ: নিকাহ, তালাক ও রজআত।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৯৪; তিরমিজি, ১১৮৪ — হাসান)

অর্থাৎ তালাক নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করাও মারাত্মক। তাই ভবিষ্যতে "তালাগ" শব্দ ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।


৬. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | "তালাগ" বলে তালাকের নিয়ত না থাকলে | তালাক পতিত হয় না (কিনায়া) | | স্বামী "তালা" অর্থ বললে এবং তা বিশ্বাসযোগ্য হলে | তালাক পতিত হয়নি, সম্পর্ক হালাল | | সন্দেহ থাকলে | স্থানীয় মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ + তাজদীদে নিকাহ | | ভবিষ্যতে | তালাকের শব্দ পরিহার করা ফরজ |

উপসংহার: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী — যদি স্বামীর নিয়ত সত্যিই তালাকের না হয়ে "তালা" অর্থ বোঝানো হয়ে থাকে — তাহলে আপনাদের সম্পর্ক হালাল আছে। তবে সন্দেহ নিরসনের জন্য স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির সাথে সরাসরি বিস্তারিত আলোচনা করে ফতোয়া নেওয়া এবং প্রয়োজনে তাজদীদে নিকাহ করা উত্তম ও নিরাপদ।

وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.