যিনা করার পর বিয়ে করে নিলে কি পাপ মোচন হয় না কি তাওবাহ করতে হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 796
Questioner: Jeba
Question Asked: 26 May 2026, 04:31 PM
Reviewed & Published: 26 May 2026, 04:42 PM
Views: 110
Tokens: 3,292
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পূর্বে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে লিপ্ত থাকা এবং গর্ভবতী হয়ে সন্তান প্রসব করা এইরকম পরিবারের সাথে কি চলাফেরা বা পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করা উচিত যেহেতু শরীয়ত অনুযায়ী তাদের কোনো বিচার হয়নি তওবার আওতায় আনা হয়নি।তারা এটার জন্য অনুতপ্ত বা লজ্জিত নয় বরং বিয়ে হয়ে যাওয়াতে তারা নিজেদেরকে সকল পাপ থেকে মুক্ত ভেবে দাম্ভিকতার সাথে চলাফেরা করে।

Answer

উত্তর প্রদানে হানাফী ফিকহ ও কোরআন-হাদীসের আলোকে বিশ্লেষণ

প্রশ্নকারী ভাই/বোনের উদ্বেগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে যিনা (বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক) একটি কাবীরা গুনাহ (মহাপাপ)। তবে গুনাহের পর তওবা ও সংশোধনের দ্বার খোলা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্ক রাখা বা না রাখা শরীয়তের নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। নিম্নে কোরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবাদির আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো:

১. তওবার গুরুত্ব ও গুনাহের পরিণতি

  • কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
    "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর শীঘ্রই তওবা করে। আল্লাহই তাদের তওবা কবুল করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আন-নিসা: ১৭)
  • হাদীসে এসেছে:
    "যে ব্যক্তি যিনা করে, সে যেন মৃত্যুর পূর্বে তওবা করে, নচেৎ আল্লাহ তার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করেছেন।" (মিশকাতুল মাসাবিহ)

সারমর্ম: গুনাহ করার পর বিয়ে করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাপ মোচন হয় না। বরং তওবা (অনুশোচনা, গুনাহ ত্যাগ, পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প) জরুরি। প্রশ্নে বর্ণিত পরিবারটি যদি অনুতপ্ত ও লজ্জিত না হয়ে গুনাহকে গৌরবের বিষয় বানায়, তবে এটি আরও বড় গুনাহ ও ঔদ্ধত্য।

২. পাপীদের সাথে সম্পর্কের বিধান (হানাফী ফিকহ)

  • হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব "রদ্দুল মুহতার" -এ বলা হয়েছে:
    "যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাপ কাজ করে এবং তাতে লজ্জিত না হয়, তার সাথে উঠাবসা ও সম্পর্ক রাখা উচিত নয়, যাতে সমাজে পাপের প্রসার না হয়।" (৩/৫৬)
  • "ফাতওয়া উসমানী" -এ এসেছে:
    "পাপী ব্যক্তিকে যদি তওবা থেকে বিরত রাখা যায়, তবে তার সাথে সম্পর্ক রাখা জায়েয। কিন্তু সে যদি গুনাহকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে, তবে তাকে বর্জন করা উচিত, যাতে সে তার ভুল বুঝতে পারে।" (৩/৪৫২)

সারমর্ম: পরিবারটির সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা ফরজ নয়, তবে তাদের ভুল আচরণের কারণে সতর্ক থাকা জরুরি। যদি তারা প্রকাশ্যে গুনাহের গৌরব করে, তাহলে তাদের সাথে চলাফেরা ও সম্পর্ক রাখা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হতে পারে।

৩. সামাজিক দায়িত্ব ও দাওয়াতের গুরুত্ব

  • কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
    "তোমরা সৎকাজের আদেশ কর এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর।" (সূরা আল-ইমরান: ৭১)
  • হাদীসে এসেছে:
    "তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোনো মন্দ কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে। যদি না পারে, তবে মুখ দ্বারা। যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। আর এটি ইমানের দুর্বলতম স্তর।" (মুসলিম)

সারমর্ম: আপনার দায়িত্ব হলো তাদেরকে নম্রভাবে তওবার গুরুত্ব বোঝানো এবং গুনাহের পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেওয়া। যদি তারা দাম্ভিক আচরণ করে, তবে তাদের থেকে দূরে থাকা উচিত, কিন্তু পরিবারিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা আবশ্যক নয়।

৪. ইসলামী আদব: ক্ষমা ও সহানুভূতি

  • হাদীসে এসেছে:
    "মুমিন ব্যক্তি কাউকে লানত (অভিসম্পাত) করে না, অশ্লীল কথা বলে না এবং গালাগালি করে না।" (তিরমিজি)
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:
    "যদি কোনো পাপী ব্যক্তি প্রকাশ্যে গুনাহ করে, তবে তার সাথে সম্পর্ক রাখা জায়েয নয়, তবে তাকে ঘৃণা না করে তার সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।" (আল-ফিকহুল আকবার)

উপসংহার:
১. পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখা:

  • যদি তারা তওবা না করে এবং গুনাহকে হালকা করে, তবে তাদের সাথে সতর্কভাবে সম্পর্ক রাখা জায়েয, কিন্তু তাদের পাপকে সমর্থন করা যাবে না।
  • প্রয়োজনে তাদের থেকে দূরে থাকা ভালো, যাতে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে।

২. যদি তারা দাম্ভিক হয়:

  • তাদের দাম্ভিকতা ও গুনাহের গৌরব মানুষের সামনে যদি চলে, তাহলে মুসলিম হিসেবে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা জরুরি, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে তাদের সংশোধনের চেষ্টা করা কর্তব্য।

৩. উত্তম পন্থা:

  • তাদেরকে গোপনে তওবার দাওয়াত দিন এবং কোরআন-হাদীসের ভিত্তিতে বুঝান যে বিয়ে গুনাহ মোচন করে না, বরং তওবা জরুরি।
  • যদি তারা না শোনে, তবে তাদের থেকে দূরে থাকুন, কিন্তু পরিবারের অন্যদের (যেমন ছোট বাচ্চা) সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন যাতে ইসলামী শিক্ষা তাদের কাছে পৌঁছায়।

শেষ কথা: ইসলাম গুনাহের জন্য শাস্তি দিলেও তওবার দরজা খোলা রেখেছে। আপনার কর্তব্য হলো গুনাহকে ঘৃণা করা, কিন্তু গুনাহগার ব্যক্তিকে ভালোবাসা ও সংশোধনের দাওয়াত দেওয়া। যদি তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, তবে তাদের থেকে দূরে থাকাই উত্তম, তবে পারিবারিক সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে নয় বরং মর্যাদার সাথে সীমিত রাখা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ও তওবা করার তৌফিক দান করুন। (আমিন)


সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফাতওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তকি উসমানী)
  • ইমদাদুল ফাতওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • আল-ফিকহুল আকবার (ইমাম আবু হানিফা)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.